কলিন্সের বিদায় ও চন্দ্রাভিযানের সংশয়কথা

মানুষের প্রথম চন্দ্রাভিযানে অংশ নেওয়া তিন জনের একজন মাইকেল কলিন্স গত বুধবার পৃথিবী হইতে চিরবিদায় লইয়াছেন। পৃথিবী হইতে বিদায় লইবার পরও পৃথিবীতে যে আবার ফিরিয়া আসা যায়, এই অলঙ্ঘনীয় নিয়মের প্রথম ব্যত্যয় ঘটাইয়াছিলেন নাসার অ্যাপোলো-১১ মিশনের তিন মহাকাশচারী। ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই চন্দ্রে প্রবেশ করা এই তিন নভোচারী ছিলেন নিল আর্মস্ট্রং, অ্যাডউইন (বাজ) অলড্রিন ও মাইকেল কলিন্স। আট দিন তাহারা পৃথিবীর বাহিরে ছিলেন। মাইকেল কলিন্সের মৃত্যু আমাদের সেই সময়কার কথা নূতন করিয়া স্মরণ করাইয়া দেয়—যখন তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ঠান্ডা লড়াই জলে-স্থলে এমনকি মহাকাশেও ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই দুই পরাশক্তির মধ্যকার টক্কর ছিল সেয়ানে সেয়ানে। এই টক্করে ১৯৫৮ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন পৃথিবীর কক্ষপথে প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ স্পুিনক প্রেরণ করে। ইহার পর তাহারা ১৯৬১ সালে ইউরি গ্যাগারিন নামের নভোচারীকে প্রথম মহাশূন্যে পাঠাইয়া বিশ্বকে তাক লাগাইয়া দেয়। এমতাবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় একটি ‘লাফ’ দেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিয়াছিল। তত্কালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি ঘোষণা করেন যে, অচিরেই আমেরিকা চাঁদের মাটিতে পা রাখিবে।

আমরা এখন বলিয়া থাকি যে, চাঁদের মাটিতে মানুষের পা দেওয়ার ‘ছোট্ট পদক্ষেপ’ ছিল নক্ষত্রলোকে পাড়ি দেওয়ার লক্ষ্যে ‘বিরাট লাফ’-এর প্রস্তুতি মাত্র। কিন্তু বাস্তবতা হইল সেই সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো পরাশক্তি ছিল বিধায় তাহাদের চাইতেও বড় কিছু করিয়া দেখাইবার অনিবার্য তাগিদ তৈরি হইয়াছিল যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে। এই জন্য ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজেটের ৪ শতাংশের অধিক বরাদ্দ দেওয়া হয় মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসাকে। ১৯৬৫ সালে সোভিয়েত যখন ‘স্পেস ওয়াক’ সম্পন্ন করেন, তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম অ্যাপোলো-১ অভিযান মুখ থুবড়াইয়া পড়ে। লঞ্চপ্যাডের অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যু ঘটে তিন নভোচারীর। আমরা দেখিতে পাই, মহাকাশে কর্তৃত্ব অর্জন করিতে যুক্তরাষ্ট্র ইহার পর আরো মরিয়া হইয়া উঠে। কেবল তাহাই নহে, ‘আ স্টাডি অব লুনার রিসার্চ ফ্লাইটস’ এবং ‘প্রজেক্ট এ-১১৯’ হইতে দাবি করা যায়, তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়নকে ভয় দেখাইতে যুক্তরাষ্ট্র সেই সময় চাঁদের উপর পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণের কথাও চিন্তা করিয়াছিল। ইহার পর আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ১৯৬৯ সালের ১৬ জুলাই অ্যাপোলো-১১ মিশনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তিন নভোচারী চাঁদে পা রাখেন। যুক্তরাষ্ট্র এই অর্জনকে ঘোষণা করে সমগ্র মানবজাতির অর্জন হিসাবে। চাঁদের মাটিতে প্রথম পা ফেলিবার সময় বলা হয়—মানুষের জন্য ইহা ‘ছোট্ট পদক্ষেপ’ কিন্তু মানবসভ্যতার জন্য ইহা বিরাট লাফ। কিন্তু মানুষ কি সত্যিই চাঁদের মাটিতে পা রাখিয়াছিল? অভিযানের অর্ধযুগ পরপরই ইহা লইয়া প্রশ্ন উঠে। সর্বশেষ ২০০১ ফক্স নিউজে ‘আমরা কি সত্যিই চাঁদে অবতরণ করিয়াছিলাম’ নামক একটি তথ্যচিত্র প্রচার করা হয়, যাহার পরিচালক ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের রহস্যসিরিজ ‘দ্য এক্স ফাইলস’-এর অভিনেতা মিচ পিলেগ্গি। ঐ প্রামাণ্যচিত্রে দাবি করা হয়, চাঁদে যাইবার ব্যাপারটি ছিল স্রেফ একটি ধাপ্পাবাজি। প্রশ্ন হইল, কেবল অ্যাপোলো নহে, মার্স, জেমিনি, অ্যাটলাসের মিশনও কি মিথ্যা? কুকুর লাইকা অথবা ইউরি গ্যাগারিনও কি সত্যিই মহাশূন্যে ভ্রমণ করিয়াছিলেন? আসলে সর্বযুগে সকল দেশেই কিছু মানুষ থাকেন, যাহারা সংশয়বাদী। সংশয়বাদী হওয়াটা দোষণীয় নহে। তবে তাহার শক্ত ভিত্তি থাকা চাই। অ্যাপোলো-১১ অভিযানের তিন জন ছাড়াও পরবর্তীকালে আরো বেশ কয়েকটি অভিযানে এখন অবধি এক ডজন মানুষ চাঁদে গিয়াছেন। চাঁদে যাওয়া লইয়া বেশকিছু অসাধারণ প্রমাণও রহিয়াছে—যেমন ৩৮২ কেজি চাঁদের পাথর, যাহা প্রায় ছয়টা মিশন হইতে সংগৃহীত হইয়াছে।

প্রথম চন্দ্রাভিযানের মাইকেল কলিন্সের মৃত্যু আমাদের স্মরণ করাইয়া দেয় সেই সময়কার পরাশক্তিদের মরিয়া প্রচেষ্টা এবং বিশ্বের পরিবর্তনশীলতার অসাধারণ কিছু আলামত। মাইকেল কলিন্সের মৃত্যুতে আমরা ব্যথিত। তাহার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করিতেছি।