আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ঘোষণা দিয়েছেন, ২০২১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে সব মার্কিন সেনা ফেরত যাবে। জো বাইডেনের আগে ডোনাল্ড ট্রাম্পেরও ঘোষণা ছিল, ২০২১ সালের মে মাসের মধ্যে সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করা হবে। তাতে বোঝা যায়, আফগানিস্তান সম্পর্কে মার্কিন প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি ক্ষমতার পালাবদলে খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। শুরু থেকেই মার্কিন জেনারেল যারা আফগানিস্তানে কাজ করেছেন এবং সাবেক কয়েক জন নিরাপত্তা উপদেষ্টাসহ বেশ কয়েক জন সেনেটর বলেছেন, এই সময়ে আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করা হবে আমেরিকার জন্য আরেকটি ঐতিহাসিক ভুল। জো বাইডেনের ঘোষণার পর পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের সাবেক প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হামিদ গুলের দুটি উক্তির কথা মনে পড়ছে। ২০১৪ সালে পাকিস্তানের এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে হামিদ গুল বলেন, ভবিষ্যতে যখন ইতিহাস রচিত হবে, তখন তাতে লেখা থাকবে আমেরিকার সহায়তা নিয়ে আইএসআই আফগানিস্তানে সোভিয়েত বাহিনীকে পরাস্ত করে এবং তাতে আরো লেখা হবে আমেরিকার সহায়তা নিয়ে আইএসআই আমেরিকাকেই পরাজিত করতে সক্ষম হয়েছে। (সূত্র: নিউ ইয়র্ক টাইমস, ১৬ এপ্রিল ২০২১)
আমার বিশ্লেষণ মতে, আগামী ১১ সেপ্টেম্বরের পর জেনারেল হামিদ গুলের কথাই সত্যে পরিণত হতে যাচ্ছে। এই সূত্রে তালেবানরা ক্ষমতায় ফিরে আসবে এবং ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে যেরকম পরিস্থিতি আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে ছিল সেটি যেমন ফিরে আসবে, তেমনি বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ে জিহাদি জঙ্গি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী যেভাবে উত্সাহিত এবং অনুপ্রাণিত হয়েছিল, ঠিক সেরকম একটা পরিস্থিতি আবার ফিরে আসতে যাচ্ছে। সংগত কারণেই প্রশ্ন ওঠে, এরকম একটা আশঙ্কার মধ্যে আমেরিকার সব সেনা কেন প্রত্যাহার করে নেওয়া হচ্ছে? গত ২০ বছরে আমেরিকাকে কম মূল্য দিতে হয়নি। সবকিছু মিলে আফগানিস্তানকে ঘিরে আমেরিকার ২ ট্রিলিয়ন ডলারের ঊর্ধ্বে ব্যয় হয়েছে। আড়াই হাজার সেনা আফগানিস্তানের মাটি থেকে আর ফেরত যেতে পারেননি, নিহত হয়েছেন। কয়েক হাজার আহত হয়ে বিকলাঙ্গ এবং আরো কয়েক হাজার মার্কিন সেনা মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন। তাহলে আমেরিকার লাভ কী হলো, সবকিছুই কি ব্যর্থ হয়ে গেল? কেউ কেউ বলছেন, এর মাধ্যমে একমাত্র সুপার পাওয়ারের শক্তিমত্তা আমেরিকা বিশ্বকে দেখাতে সক্ষম হয়েছে, প্রমাণ করেছে, ইচ্ছা করলে যে কোনো অবাধ্য দেশে এভাবেই সবকিছু গুঁড়িয়ে দেওয়ার সক্ষমতা আমেরিকা রাখে। অন্যরা বলছেন, ওসামা বিন লাদেনকে হত্যার মধ্য দিয়ে প্রতিশোধ ও প্রতিহিসংসার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে মাত্র, দীর্ঘমেয়াদি কোনো লাভ আমেরিকার হয়নি। চীনের উত্থান, রাশিয়ার বেপরোয়া ভাব এবং বৈশ্বিক সব ইস্যুতে চীন-রাশিয়ার একই অক্ষে অবস্থানের ফলে বর্তমানে এমন সমীকরণের সৃষ্টি হয়েছে, যাতে ২০০১ সালের মতো পরিস্থিতি আর নেই। যেখানে এককভাবে আমেরিকা অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে আফগানিস্তানের মতো একতরফা সামরিক অভিযান চালাতে পারবে। তবে আফগানিস্তান থেকে পরিপূর্ণ সেনা প্রত্যাহার ইস্যুতে আমেরিকান প্রশাসনের সিদ্ধান্তের পক্ষে কী কারণ থাকতে পারে, সে সম্পর্কেও বিশ্লেষকগণ মন্তব্য করেছেন। প্রথমত, আর্থিকভাবে এবং হতাহতের দৃষ্টিকোণ থেকে ও রাজনৈতিকভাবে এই বোঝা অনির্দিষ্টকালের জন্য টেনে চলা আমেরিকার জন্য এখন আর লাভজনক হচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্য এবং পূর্ব ইউরোপে রাশিয়ার অপ্রতিরোধ্য প্রভাব বিস্তারের চাপ, তার সঙ্গে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনকে সফলভাবে মোকাবিলা করতে না পারলে এক সুপার পাওয়ারের মর্যাদা আমেরিকাকে অচিরেই হারাতে হতে পারে। তৃতীয়ত, আমেরিকার প্রশাসন মনে করছে, আফগানিস্তানে তালেবানি শাসন ও কর্তৃত্ব যদি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সেখানে আবার আল-কায়েদা ঘাঁটি শক্তিশালী হয়ও; তবু অদূর ভবিষ্যতে আগের মতো আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে ৯/১১-এর মতো ঘটনা কোনো জঙ্গি জিহাদি সংগঠনই আর ঘটাতে পারবে না। কারণ, আমেরিকার প্রশাসন মনে করে, ইতিমধ্যেই হোমল্যান্ড নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তারা অত্যন্ত সুদৃঢ় করতে সক্ষম হয়েছে। বিশ্বব্যাপী আমেরিকার গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক ঢেলে সাজানো হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সাইবার স্পেসের ওপর পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তারা প্রতিষ্ঠা করেছে। অর্থাত্ আমেরিকান প্রশাসন মনে করছে, তাদের নিরাপত্তাব্যবস্থায় আর কোনো ছিদ্র নেই। কিন্তু বাংলাদেশের একজন ক্ষুদ্র বিশ্লেষক হিসেবে আমার মনে হয়, বাংলা সাহিত্যের বেহুলা-লক্ষ্মীন্দরের কাহিনি বোধ হয় আমেরিকান প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের জানা নেই। সাপের দেবী মনসা জানেন, কীভাবে পাকা দেওয়ালে ছিদ্র তৈরি করতে হয়। যাহোক, ভবিষ্যতই বলবে আমেরিকার জন্য এই সিদ্ধান্ত কতখানি সঠিক হয়েছে। কিন্তু মূল কথা হলো আফগানিস্তানের কী হবে। বেশির ভাগ বিশ্লেষকের ধারণা, আমেরিকান সৈন্য প্রত্যাহারের স্বল্প সময়ের মধ্যেই গৃহযুদ্ধের তীব্রতা প্রচণ্ড হবে তার পথ ধরে পরিপূর্ণভাবে আগের মতো আফগানিস্তানে তালেবানি শাসন ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে। আশরাফ ঘানির সরকার টিকতে পারবে না। শুধু সমর্থন নয়, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সৈন্যরা ছদ্মবেশে তালেবানদের সঙ্গে যুদ্ধে যোগ দেবে এবং আশরাফ ঘানির সরকারকে হটিয়ে তালেবান সরকারকে ক্ষমতায় বসাবে। আফগানিস্তানে তালেবান সরকার মানেই সেটা পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের সরকার।
সুতরাং জেনারেল হামিদ গুলের ভাষ্যই সঠিক। চূড়ান্ত বিচারে আফগানিস্তানে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এরই জয় হচ্ছে। ২০০১ সালে প্রচণ্ড চাপে পড়ে আমেরিকার সঙ্গী হতে বাধ্য হয়েছিল পাকিস্তান। কিন্তু গত ২০ বছর যাবত্ পাকিস্তান ডাবল গেম প্লে করেছে। পাকিস্তান ইচ্ছা করে নিজ গোলপোস্টের দিকে শট করেছে, আমেরিকা সেটা দেখেও না দেখার ভান করেছে। আরেকটি তিক্ত সত্য আবার প্রতিষ্ঠিত হলো, স্বার্থ উদ্ধার শেষ হলেই বা প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে একসময়ের বন্ধুকে ফেলে দিয়ে চলে যেতে আমেরিকা কখনো দ্বিতীয় চিন্তা করে না। নিউ ইয়র্ক টাইমসের খবরে দেখলাম, ১ হাজার ৭০০ জন আফগান নাগরিক, যার শতকরা ৮০ ভাগই নারী, আমেরিকায় অভিবাসনের জন্য দরখাস্ত করেছে। এই সংখ্যা ভবিষ্যতে আরো বহু গুণ বৃদ্ধি পাবে। কারণ এই ২০ বছরে যেসব নারী আধুনিক জীবন যাপন করছে তারা মনে করছে ভবিষ্যতে আফগানিস্তানে তাদের জীবন-জীবিকা আর চলবে না। তালেবানরা সব নারীকে আবার ঘরে বন্দি করবে। ২০ বছরে কয়েক লাখ বেসামরিক আফগান নিরীহ মানুষ আমেরিকা ভার্সেস তালেবান যুদ্ধের বলি হয়েছে। এই ত্যাগের কোনো মূল্য রইল না। প্রায় সম্পূর্ণ দেশ যুদ্ধবিধ্বস্ত। যার স্বল্প কিছুই এতদিনে মেরামত হয়েছে। অর্থাত্ ২০ বছরের যুদ্ধে আফগানিস্তানের বৃহত্তর মানুষের স্থায়ী কিছু লাভ হয়নি, বরং লোকসান হয়েছে বেশি। সবকিছু আবার ব্যাক টু স্কয়ার ওয়ান। ২০ বছরের যুদ্ধের নেট রেজাল্ট শুধু জিরো নয়, বহু গুণ নেগেটিভ। তালেবান পক্ষ আমেরিকার কাছে অস্বীকার করেছে, আল-কায়েদার সঙ্গে তারা সম্পর্ক রাখবে না এবং আগের মতো আশ্রয়-প্রশ্রয়ও দেবে না। সবাই জানেন, এটা একটা ডাহা ভাওতাবাজি ছাড়া অন্য কিছু নয়। তালেবান ও আল-কায়েদার মধ্যের হরিহর আত্মার সম্পর্ক, বিচ্ছেদ অসম্ভব ব্যাপার। মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং আফগানিস্তানের শাসন ও কর্তৃত্বে তালেবানরা ফিরে এলে তার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার প্রভাবে ভারত-বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় কী রকম পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে, সে বিষয়ে একটু আলোকপাত করেই আজকের লেখাটি শেষ করব। তালেবান মানেই হলো পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই, যে কথা আগেই উল্লেখ করেছি।
আফগানিস্তান হবে আইএসআইয়ের ব্যাকইয়ার্ড এবং জিহাদি জিহাদি-মুজাহিদদের প্রশিক্ষণকন্দ্র। এই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জিহাদিরা আগের মতো কাশ্মীর ও ভারতের মূল ভূখণ্ডের ভেতরে নাশকাতামূলক তত্পরতা চালাবার চেষ্টা করবে। তাতে ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব-সংঘাত বৃদ্ধি পাবে। আফগানিস্তানে ভারতের প্রভাব হ্রাস পাবে এবং তার সূত্রেই স্ট্র্যাটেজিক্যালি পাকিস্তানের জন্য অধিকতর সুবিধা সৃষ্টি হবে। এটাই এতদিন ধরে পাকিস্তান চেয়ে আসছে। সেজন্যই জেনারেল হামিদ গুল বলেছেন, এটা হবে পাকিস্তানের বিজয়। নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জামায়াত-হেফাজতসহ ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠী উত্ফুল্ল হবে। আগের মতো আফগানিস্তান হবে এদের হিজরতের জায়গা। ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে তালেবান শাসনের সময় বাংলাদেশের বহু জিহাদি সেখানে গিয়েছে, প্রশিক্ষণ নিয়েছে এবং কথিত ধর্মীয় নেতারা সেদেশ সফর শেষে বাংলাদেশের পত্রিকায় লিখেছে, আফগানিস্তানে বেহশত দেখে এলাম। শুধু উপমহাদেশ নয়, উত্তর আফ্রিকা থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সব উগ্রবাদী গোষ্ঠীর প্রশিক্ষণ ও বিশ্রামের জায়গা হবে আফগানিস্তান। সুতরাং মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর আফগানিস্তানের অবস্থা হবে ব্যাক টু স্কয়ার ওয়ান এবং উপমহাদেশে অস্থিরতাসহ বিশ্বব্যাপী জঙ্গি উগ্রবাদী তত্পরতা বৃদ্ধি পাবে।
n লেখক :গবেষক এবং রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক