ভেজাল খাদ্যে কঠিন শাস্তি চাই

 ‘ভেজাল ভেজাল, ভেজালরে ভাই/ ভেজাল সারাদেশটায়/ ভেজাল ছাড়া খাঁটি জিনিস মিলবে না কি চেষ্টায়/ খাঁটি জিনিস এ কথাটা রেখো না আর চিত্তে/ ভেজাল নামটা খাঁটি কেবল আর সকলেই মিথ্যে’। সাম্যবাদী কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতার সঙ্গে বর্তমান বাংলাদেশের মিল এভাবেই খুঁজে পাওয়া যায়। 

এখন নাগরিক জীবনে অন্যতম উদ্বেগের নাম ভেজাল। মুনাফাখোর, মজুতদার ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফার প্রত্যাশায় পণ্যসামগ্রীতে অত্যন্ত সুকৌশলে ভেজালের কাজ করে থাকেন। বর্তমানে মাছ, মাংস, ফলমূল, শাকসবজি খাদ্য গ্রহণে মারাত্মক ঝুঁকি বেড়েছে। এখন ভেজালমুক্ত দ্রব্যসামগ্রী মেলানো খুবই কষ্টকর। মুড়ির আসল স্বাদ নেই, মুড়ির রং সাদা করতে ব্যবহার করা হয় ইউরিয়া, পচন থেকে রক্ষা পেতে মাছে ফরমালিন, দুধে মেশানো হয় মেলামিন, দীর্ঘক্ষণ সজীব ও আকর্ষণীয় ৃরাখতে মিষ্টিতে ব্যবহার করা হয় রং সৃষ্টিকারী কেমিক্যাল। আম, কলাসহ অন্যান্য ফল দ্রুত পাকানো ও আকর্ষণীয় রঙের জন্য কার্বাইড এবং পচন রোধে ফরমালিন ব্যবহার করা হয়। দীর্ঘদিন মচমচে রাখার জন্য জিলাপি ও চানাচুর তৈরিতে ব্যবহূত হচ্ছে পোড়া মোবিল। আকর্ষণীয় করার জন্য কাপড় ও চামড়ায় দেওয়া রং ব্যবহূত হচ্ছে আইসক্রিম, বিস্কুট, সেমাই, নুডলস, ফলের জুস, এমনকি মিষ্টি তৈরিতে। আজকাল লবণে বালু, মসলায় কাঠ ও ইটের গুঁড়া পাওয়া যাচ্ছে। ভেজালের কারণে কমলা ও মালটায় সেই স্বাদ নেই। সরিষার তেলে ঝাঁজ বাড়ানোর জন্য একধরনের কেমিক্যাল মেশানো হচ্ছে। মুরগির খামারে ট্যানারির বর্জ্য ও চামড়ার ভয়ংকর ভুষি খাদ্য হিসেবে দেওয়া হচ্ছে। হোটেলে খেতে গেলে সন্দেহ হয় মরা মুরগি রান্না হল কি না। কারণ লেবুর রস মিশিয়ে মরা মুরগি রান্না করা হলে নাকি দুর্গন্ধমুক্ত হয়! শরবত ও লাচ্ছিতে ব্যবহূত হচ্ছে মাছে ব্যবহারের বরফ। এই কায়দাগুলো বহু আগেই রপ্ত করেছে। খেজুরের গুড়ে মেশানো হয় চিনি। ওষুধেও ভেজাল এবং মেয়াদোত্তীর্ণ পাওয়া যাচ্ছে। মানুষ তাহলে বাঁচবে কী করে?

মানবদেহে ক্ষতির কারণ হলো ভেজাল। বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য মিশ্রিত খাবারে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। ফরমালিন ও কারবাইড মিশ্রিত খাদ্য গ্রহণে ক্যানসার, শাসকষ্ট ও চর্মরোগ হয়। শিশু ও গর্ভবতী মায়ের জন্য আরো মারাত্মক ক্ষতিকর। ফরমালিন ব্যবহারের কারণে মানুষের মৃত্যুও হতে পারে। লিভার ও কিডনির ব্যাপক ক্ষতি হয়, লিভার সিরোসিসও হয়। ভোক্তা অধিকার সংগঠন বাংলাদেশ কনজ্যুমার রাইটস সোসাইটির তথ্যমতে, ভেজাল খাদ্য খেয়ে প্রতি বছর ৩ লাখের বেশি ক্যানসারে আক্তান্ত হচ্ছে, দেড় লাখ ডায়াবেটিস ও ২ লাখ কিডনিতে আক্তান্ত হচ্ছে। কার্বাইডের কারণে তীব্র মাথাব্যথা ঘূর্ণিরোগ এবং প্রলাপ বকা—এ ধরনের সমস্যাও হতে পারে। এ সমস্যা দীর্ঘমেয়াদে মেজাজ রুক্ষ এবং স্মরণশক্তি লোপের মতো সমস্যা হতে পারে। সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে ২০১৩ সালে নিরাপদ খাদ্য আইন তৈরি করে সরকার। ২০১৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর এ আইনের আওতায় ২ ফেব্রুয়ারি গঠন করা হয় বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। ২০১৩ সালে আইনের ধারায় বলা আছে, পণ্যসামগ্রীতে ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য মেশানোর শাস্তি হিসেবে ৭ থেকে ১৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এতে প্রথমবার অভিযুক্ত হলে সাত বছর, দ্বিতীয়বার হলে ১৪ বছরের কারাদণ্ডের কথা বলা হয়েছে। আইনে জরিমানারও বিধান রাখা হয়েছে—প্রথম বার অপরাধে ১০ লাখ টাকা, দ্বিতীয় বারের ক্ষেত্রে ২০ লাখ টাকা।

মানুষ বাঁচার জন্য খাদ্য গ্রহণ করে, আবার ভেজাল খাদ্য গ্রহণে মৃত্যুর কারণও হয়। উন্নত দেশগুলোতে খাদ্যে ভেজাল নেই বললেই চলে। ভারতেও ভোক্তা অধিকার আইন খুবই কর্যকর, কোনো খাদ্যে ভেজাল প্রমাণিত হলে সেই পণ্য সঙ্গে সঙ্গে বাজার থেকে উঠিয়ে নেওয়া হয় এবং কঠোর শাস্তিও হয়। বাংলাদেশেও আইন আছে। নিয়মকানুন, বিধিবিধান সবই আছে, আচমকা অভিযান চলে। অন্যদিকে রমজান মাস এলে ভেজালবিরোধী অভিযান তোড়জোড় হয়, ধরা পড়ে আবার বেরিয়ে যায়, কিন্তু কিছুই মানা হয় না আবার সেই পূর্বের অবস্থা। তাই কঠিন শাস্তি দরকার। সংস্থাগুলো ঠিকভাবে ফলোআপ করে না। সবার সচেতনতার প্রয়োজন আছে। প্রধানমন্ত্রীর মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে ঘোষণা ১০০টি খাদ্যশিল্পে ‘সেফ ফুড প্ল্যান’—এটি সারা দেশে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। আর সরকার দেশে কেন্দ্রীয়ভাবে ফুড টেস্টিং ল্যাব প্রতিষ্ঠার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা জেলা পর্যায়েও করতে হবে। তাছাড়া সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে খাদ্যে নিরাপদ বলয় তৈরি করা সম্ভব। আমাদের প্রধানমন্ত্রী ভেজাল রোধে সাম্প্রতিক যে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন, আমরা আশা রাখতে পারি, তা যথাযথ পালন করা হবে এবং নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ নিশ্চিত হবে।

n লেখক : ব্যাংকার, কলামিস্ট