অগ্নিযুগের অগ্নিপুরুষ রবি নিয়োগী

গতকাল ছিল বিপ্লবী রবি নিয়োগীর ১১১তম জন্মবার্ষিকী। ১৯১০ সালের ৩০ এপ্রিল তত্কালীন বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার অন্তর্গত শেরপুর থানা, বর্তমান শেরপুর জেলার এক জমিদার পরিবারে রবি নিয়োগী জন্মগ্রহণ করেন। ২০০২ সালের ১০ মে ৯২ বত্সর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও তিনি প্রথম সামন্তবাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন—নানকার, ভাওয়ালি, টংক ও তেভাগা আন্দোলনের মাধ্যমে। স্বদেশ প্রেম ও জাতীয়তাবাদের আদর্শে দীক্ষিত হয়ে সমাজ পরিবর্তনের চেষ্টায় তত্পর থাকার অপরাধে ব্রিটিশ, পাকিস্তান, বাংলাদেশ সরকারের শাসনামলে জীবনের ৩৪টি মূল্যবান বছর রবি নিয়োগীকে কারান্তরালে কাটাতে হয়েছে। এর বাইরে গৃহ-অন্তরিন ও আত্মগোপনে থেকেছেন দীর্ঘ সময়।

আনন্দমোহন কলেজে পাঠরত অবস্থায় রবি নিয়োগী সশস্ত্র বিপ্লবী যুগান্তর দলে যোগদান করেন এবং ইংরেজ হঠানোর আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। ১৯৩০ সালে সত্যাগ্রহ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার জন্য রবি নিয়োগীকে প্রথম কারাবরণ করতে হয়। তার কর্মকাণ্ডে ভীত ইংরেজ সরকার তাকে নির্বাসন দেয় কালাপানি খ্যাত আন্দামান সেলুলার জেলে। ১৯৩১ থেকে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত রবি নিয়োগী আন্দামান সেলুলার জেলে বন্দি ছিলেন। বঙ্গদেশ থেকে দ্বিতীয় ব্যাচে ২৫ জন বিপ্লবীকে সঙ্গে রবি নিয়োগীকেও আন্দামান সেলুলার জেলে পাঠানো হয়। ‘মহারাজা’ নামক জাহাজে ওঠার সময় রবি নিয়োগী সঙ্গে করে নিয়েছিলেন কার্ল মার্কসের কিছু বই। ১৯৩৩ সালে আন্দামান জেলে বন্দি ৩২ জন বিপ্লবী কার্ল মার্কসের বই অধ্যায়ন করেন এবং নিজেদের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা শেষে তারা মানব মুক্তির পথ হিসেবে মার্কসবাদে দীক্ষা নেন এবং গঠিত হয় কমিউনিস্ট কনসলিডেশন। আন্দামান জেলে গঠিত কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যরা পরবর্তী সময় সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদকে জীবনের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেন। আন্দামান থেকে ফেরার পর তারাই ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করার কাজে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেন। ১৯৩৯ সালে কমরেড মুজাফফর আহমেদের নেতৃত্বে এক গোপন বৈঠকে রবি নিয়োগীসহ ছয় জন সদস্য নিয়ে গঠিত হয় ময়মনসিংহ জেলা কমিউনিস্ট পার্টি। দেশপ্রেমিক এই পার্টির সদস্যরা ১৯৪৬ সাল থেকে ৪৮ সাল পর্যন্ত ময়মনসিংহ জেলায় টংক ও তেভাগা আন্দোলন সংগঠিত করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। জামালপুর-শেরপুর অঞ্চলের কৃষক আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব ছিলেন রবি নিয়োগী। ’৫২ সালে রবি নিয়োগী কারাগারে ছিলেন,  ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। তবে তিনি তার সুযোগ্য পত্নী প্রয়াত জ্যোত্স্না নিয়োগীর সহায়তায় ’৫৩ সালে শত বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে শেরপুরে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার গড়ে তুলেছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ছিলেন রবি নিয়োগী। ১১ নম্বর সেক্টরের বিভিন্ন শরণার্থী ক্যাম্পে অন্ন, বস্ত্র, ওষুধ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অস্ত্র, রসদ সংগ্রহ করেছেন পশ্চিমবঙ্গের ‘মুক্তিযুদ্ধ সহায়ক সমিতি’ ও অন্যান্য প্রগতিশীল সংগঠনের সাহায্যের মাধ্যমে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে কাজের স্বীকৃতি তাকে দেওয়া হয়নি।

’৯০ সালে বৃদ্ধ বয়সে স্বৈরাচার পতনের আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন।

রবি নিয়োগী ঐতিহ্যবাহী সংবাদ পত্রিকার শেরপুর জেলার স্টাফ রিপোর্টার ছিলেন। শেরপুর সাংবাদিক সমিতির কমিটি গঠন করেন, শেরপুর প্রেসক্লাবকে সমাজ সংস্কার, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিচর্চার ক্ষেত্র রূপে গড়ে তোলার কাজে সচেষ্ট ছিলেন।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর রবি নিয়োগীর অনেক সহযোদ্ধা, আত্মীয়-পরিজন ভারতে চলে গেলেও রবি নিয়োগী তার প্রিয় জন্মভূমি মাটি ও মানুষকে ছেড়ে যাননি। জন্মভূমির প্রতি তার এই টান বজায় ছিল আজীবন। ভারত সরকার স্বদেশি আন্দোলনের অগ্রদূতদের জন্য যে দুর্লভ সম্মাননা, সুযোগ-সুবিধা বরাদ্দ করেন তার ভাগীদার রবি নিয়োগীও ছিলেন। তবে খ্যাতি, সম্মান ও সচ্ছলতার প্রলোভনে কখনো সাড়া দেননি তিনি। অতি সাধারণ আটপৌরে জীবন কাটিয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি প্রিয় জন্মস্থান শেরপুরের মাটিতে।

অগ্নিযুগের বিপ্লবী রবি, আজ তোমার জন্মদিনে তোমাকে স্মরি। তোমাকে জানাই সংগ্রামী রক্তিম অভিবাদন।

n লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা, বিপ্লবী রবি

নিয়োগীর কন্যা