গান যে কখন মজ্জায় প্রবেশ করেছিলো জানি না। আর মান্না দে কখন প্রিয় হয়ে উঠলো তাও মনে করতে পারি না। ছোটবেলায় স্কুল থেকে আমাদের একটা অনুষ্ঠানে নেয়া হয়েছিলো। সেখানে হারিয়ে গিয়েছিলাম আমি। খুব দ্রুতই পুলিশের সহায়তার বাসায় ফিরে আসি। তখন বয়স সাত। আমাকে ফিরে পাবার পর বড়ভাই চেঞ্জারে গান লাগান- ‘সে আমার ছোট বোন, বড় আদরের ছোট বোন’। এই গানের গায়ক কে জানি না কিন্তু গানটা স্মরণীয় স্মৃতি হয়ে যায়। আমাদের ছোটবেলায় গান শোনার জন্য খুব বেশি কোশেশ করতে হতো না। আমরা যখন কাঁঠালবাগান থাকি, তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি। পাশের বাসা থেকে নিয়মিত বাজতো- ‘ললিতা ওকে আজ চলে যেতে বল না’। তীর ‘ভাঙ্গা ঢেউ আর নীড়ভাঙ্গা ঘর’ ‘এই কূলে আমি আর ওই কূলে তুমি’ এমনি সব গান। মান্না দে নাম জানার আগেই তার আর বিধে যায় মরমে।
ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় জেনে যাই মান্না দের নাম। বড়চাচার বাসায় শুনি একটা পুরো ক্যাটেস-‘যদি কাগজে লিখ না কাগজ ছিড়ে যাবে’, ‘ক’ফোটা চোখের জল ফেলেছো যে তুমি ভালবাসবে’, ‘সবাই তো সুখী হতে চায়’সহ আরো কিছু গান। মান্নাদের পাশাপাশি সেসময় শুনে চলছি বাংলা গানের স্বণর্যুগের
অসাধারণ সব গান। জানতে থাকি আরও আরও শিল্পীর নাম। এইসব গান আর শিল্পীদেরও খুব ভালো লাগে। কিন্তু সবকিছুর মধ্যেও মান্নাদের যেন আলাদা একটা স্থান। ক্লাস নাইনে যখন পড়ি তখন প্রায় প্রতিদিনই ক্লাসের ফাঁকে দারুণ দারুণ গান নিয়ে কথা হতো সহপাঠীদের সাথে। নতুন নতুন গানের কলি সংগ্রহ আর গান শোনা যেন নেশার মতো ছিলো। কোনদিন পাই ‘তুমি নিজের মুখে বললে যেদিন’, তুমি অনেক যত্ন করে আমায় দুঃখ দিতে চেয়েছো,‘দ্বীপ ছিলো শিখা ছিলো’ এইসব গান শুনি আর খাতায় লিখে ফেলি পুরো গান। আবার কোনদিন ছোটভাই এসে বলে দুটো গানের কলি- ‘এই তো সেদিন তুমি আমারেই বোঝালে’, ‘দুঃখ আমাকে দুঃখী করেনি করেছে রাজার রাজা’। কোথাও শুনি ‘কতদূরে আর নিয়ে যাবে বলো’।
এরকম প্রায় প্রায়ই নতুন গানের কলি সংগ্রহ করি বিভিন্ন জনের কাছ থেকে চমকে চমকে উঠি। কি গভীর কথা, কি তার সুর। বুকের একবারে মাঝখানে গেঁথে যায়। সে সময়টা যেন ছিলো গানের সাথে একবারে মিশে যাওয়া। অন্য শিল্পীদের গানও শুনি, লিখিও কিন্তু ঐ যে বললাম মান্না দে আমার কাছে বিশেষ একজন। তখন গান শুনছি কিন্তু তাকে দেখিনি। গানের গলার সাথে মিলিয়ে মনে হয় ঝাঁকড়া চুলের এক সুদর্শন তরুণ। যে গেয়ে যাচ্ছে প্রাণের ভেতর গুঞ্জরিত হওয়া আমার নিজের কথাগুলোই। ক্লাস টেনের প্রথমদিকেই ক্যাসেটের গায়ে দেখি মান্নাদের ছবি। টাক মাথা বয়স্ক গুরুগম্ভীর এক পুরুষ। ক্যাসেটের মধ্যে বেজে চলা গলা আর আমার কল্পনার সেই ঝাঁকড়া চুলের যুবকের সাথে কোনোই মিল নেই যেন এই মানুষটার। একটু যেন হোঁচট খাই। কিন্তু ঐ যে মেনের ভেতর তখন কথা আর সুরের গভীর দাগ। আর তার বহু গান আমার কণ্ঠস্থ। আর হৃদয় সেখানে আসন গেড়ে নিয়েছেন মান্না দে স্থায়ীভাবে। সেই মান্নাদের আজ ১০২ তম জন্মবার্ষিকী । শ্রদ্ধার সাথে লিখছি তার জন্য দুকলম।
মান্নাদের আজকের এই মান্না দে হয়ে উঠাটা খুব সহজ ছিলো না। সেই পথ যেমন ছিলো সাধনার তেমনি সংগ্রামের। মান্না দের আসল নাম প্রবোধচন্দ্র দে, জন্ম, কোলকাতায়, ১ মে ১৯১৯। বাড়িতে গানের পরিবেশ ছিলো পুরো দস্তুর। কাকা কৃষ্ণচন্দ্র দে প্রখ্যাত সংগীত শিল্পী, কৃষ্ণচন্দ্র দে’র কাছে গান শিখতে আসতেন দবীর খাঁ, শচীন দেব বর্মণ, পংকজ কুমার মল্লিক-এর মতো বাঘা বাঘা গায়কেরা। কাকা যখন গান গাইতেন আর শেখাতেন তখন মনোযোগ দিয়ে শুনতেন মান্না দে। তখনই তৈরি হয়ে গিয়েছিলো গানের কান আর সুর লয়ের বোধ। গান বাড়িতে এমনভাবে মিশে থাকলেও নিজে গায়ক হবেন এমনটা কখনোই ভাবেননি তিনি বরং সিরিয়াসলি শিখেছিলেন কুস্তি। কখনও হতে চেয়েছিলেন ফুটবলার। পরিবারও চেয়েছিলেন লেখাপড়া শিখে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হবেন। কিন্তু যার মধ্যে লুকিয়ে আছে সুরের খেলা তিনি তো একদিন প্রকাশিত হবেনই। আর তাই তার স্কুটিশচার্চ কলেজের অফ পিরিয়ডগুলোই যেন তাকে নিজের অজান্তেই টেনে নিয়ে গেলো গানের দিকে। অফ পিরিয়ডে কমনরুমে ছেলেরা কাপ পিরিচি চামচ বাজিয়ে গান ধরতো। সাহেবি কলেজে তাই বন্ধু-বান্ধব
গাইতো ইংরেজি গান। কিন্তু তিনি কৃষ্ণদের ভাতিজা, তাই শুনে শুনে শেখা কাকার গান অথবা গেয়ে উঠতেন শচীন দেব বর্মণের গান। ব্যাস বন্ধুদের কাছে নাম ফাটিয়ে রীতিমতো হয়ে গেলেন গায়ক। তারাই ইন্টার –কলেজ মিউজিক কমপিটিশিনে দিয়ে দিলেন তার নাম। তখন তো আর তার কোনো তালিম নেই, শুধু শুনে শুনে যা গাইছেন। এই নাম দেয়া নিয়ে হয়েছিলো বিরাট এক কাহিনী। সে যাই হোক, কাকাই আবার তাকে গড়ে পিটে দিলেন। প্রথম বছরেই সবগুলো বিভাগে প্রথম হলেন। পরের বছরও তাই। পেলেন একটা রুপোর তানপুরা। গান গেয়ে প্রথম পুরষ্কার। সেই তানপুরাই তাকে নিয়ে আসলো গানের জগতে।
তারপর যখন গানের তালিম নিতে শুরু করলেন, প্রথম শিক্ষকই তো কাকা! ব্যাধিতে তিনি হয়েছিলেন অন্ধ, কিন্তু ছিলেন ভারসেটাইল সিঙ্গার। ধ্রুপদ,-খেয়াল –ঠূংরি থেকে কীর্তন বিভিন্ন গানের উপাদান মিশিয়েছিলেন বাংলাগানে। কাকার কাছে তালিম নেবার এই পরম সৌভাগ্যের সাথে গুরুর তালিকায় যোগ হয়েছিল ওস্তাদ দবীর খাঁ, ওস্তাদ আলী খাঁ, আবদুর রহমান খাঁ, গোলাম মোস্তফা’র মতো সংগীত শিক্ষকেরা। যার ফলে সঙ্গীতের ভিতটা যেমন ছিলো উচ্চাঙ্গসংগীতের তেমনি ছিলো মজবুত।
কাকার সাথে ১৯৪২ সালে বোম্বেতে আসলেন। ১৯৪৩ সালে কাকার সংগীত পরিচালনায় ‘তমন্ন ‘ ছবিতে সুরাইয়ার সাথে ‘জাগো আয়ী ঊষা’ এই ডুয়েট গানের মেধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রের গানে অভিষেক হয়েছিলো মান্নাদের। তারপর কাকা কোলকাতা ফিরতে চাইলে কাকাকে কোলকাতা রেখে একাই রওয়ানা দিলেন
বোম্বেতে। একটা জিদ মনের ভেতরে একটা কাজ করছিলো দেখা যাক না কোলকাতার সীমাবদ্ধ গণ্ডি ছেড়ে বোম্বের বিরাট জগতে প্রতিষ্ঠিত হওয়া যায় কি না! উত্তর কোলকাতার ছেলে যাবে বোম্বে! ফিল্ম লাইনে অতি নচ্ছার জায়গা এই বোম্বে! ছেলে নষ্ট হয়ে যাবে। বেশ একটা বাধা এসেছিলো একান্নবর্তী পরিবার থেকে।কিন্তু মা মহামায়া এসে দাঁড়িয়েছিলেন পাশে। বলেছিলেন- বড়ো হয়েছিস, নিজের পথ নিজেই খুঁজে নিতে হবে।
শুরু হলো বোম্বের কঠিন জীবন। কাকার ছাত্র শচীন দেব বর্মণই হয়ে উঠলেন তার অভিভাবক। শচীন দেব বর্মণের সহকারী হিসাবে শুরু করলেন, শুরু হলো নতুন লড়াই। তার পরের ছয় বছর সঙ্গীত পরিচালকদের সহকারী হিসেবেই থাকতে হয়েছে। সাতবছরে একটিও গান গাইবার সুযোগ হয়নি। পঞ্চাশ সালে মশাল ছবিতে শচীনের সুরে মশাল ছবিতে গাইলেন- ওপর গগন বিশাল’ গানটি। এই গানটিই গায়ক হিসেবে স্বীকৃতি এনে দিলো তাকে। শচীন দেব বর্মণের সুরে এই প্রথম গানটি গাইতেই যেমন সময় লেগেছিল সাত বছর। তেমনি ভালো পৃষ্ঠপোষকতায় সুযোগ পেতে সময় লেগেছে অনেক। প্রথমদিকে ক্ল্যাসিকাল বা ভক্তিগীতি গেয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। তখন আসলে চলছে রফি, মুকেশ, তালাত মাহমুদ, কিশোর কুমারদের রাজত্ব। তাদের সবার একটা আলাদা অবস্থান তৈরি হয়ে গেছে। এদের সবার জন্য নায়কও তৈরি হয়েছিল। রাজকাপুর, দেব আনন্দ, শশী কাপুর, ঋষি কাপুর, ধর্মেন্দ্র, অমিতাভ প্রায় সকলের সংগে লিপ সিং-এর জন্য কেমন যেন একটা নির্দিষ্ট শিল্পী তৈরি গিয়েছিল। সেই দেয়াল ভেদ করে একটা বঙ্গসন্তানের জায়গা ওনেয়া তাই খুব সহজ ছিলো না মান্নাদের
পক্ষে। তবে মান্নাদের জন্য জুটেছিল মেহমুদ। ‘রাজ কাপুরের জন্য মুকেশ, দেবানন্দের জন্য কিশোর, দিলীপ কুমার থেকে বাকি নায়কদের জন্য মোহাম্মদ রফি, তালাত মাহমুদ,.... আমার ভাগ্যে তাই বক্তিমূলক–কমিক–ক্লাসিক্যাল কিছু গানের শিকেই ছিড়েছে”- একটা দীর্ঘশ্বাস যেন থেকেই যায় মান্না দের গলায়।
বোম্বের সঙ্গীত জীবন তাই খুব সহজ ছিল না। সঙ্গীত পরিচালকদের প্রতি অভিমানও চলে আসতো। স্বয়ং শচীন দেব বর্মণের প্রতিও ছিলো এই চাপা অভিমান। এমন অনেকদিন হয়েছে শচীন দেব নতুন গানের সুর করেছেন।
রবীন্দ্র সংগীত ভক্ত মান্না দে শচীন কর্তার রবীন্দ্র সংগীতের সুরে হিন্দি গান গাইতে ভীষণ পছন্দ করেছেন। এ তালিকায় সংক্ষেপে উল্লেখ করা যায় ‘হে ক্ষণিকের অতিথি’ থেকে ‘যায়ে তো যায়ে কাহা’, ‘একদা তুমি প্রিয়ে’ থেকে ‘চলতে হ্যাঁয় জীবন’, ‘যদি তারে নাই চিনিনে সে কি’ থেকে ‘তোরে মেরে মিলন কি হয়ে রয় না’। আবার নজরুলের ‘অরুণ-কান্তি’ থেকে ‘পুছনো না ক্যায়সে ম্যায়নে চৈন বিতায়ী’ সবই তো সর্বভারতীয় হিট গান। আসলে শচীনকর্তা আর মান্নাদের সম্পর্ক এর রসায়নটা ছিলো অসাধারণ। রাহুল দেব বর্মণ জন্মাবার পর পরই মান্না দে শচীন দেব বর্মণের বাড়িতে এসেছেন। শিশু রাহুল কাঁদছে চিৎকার করে। মান্না দে বলে উঠলেন ‘দেখেছেন গলায় কি জোর? একেবারে পঞ্চমে পৌঁছেছে।’ শচীন কর্তা তখনই বললেন, ‘তাহলে ওর নাম থাক পঞ্চম।’ রাহুল দেব বর্মণের ডাকনাম হয়ে গেল পঞ্চম।
তারপরও যে সব সঙ্গীত পরিচালকদের সাথে কাজ করেছেন বা সুরকারদের দেখেছেন তার উপর ছিল তার অগাধ শ্রদ্ধা। হরিপ্রসন্ন দাস, খেমচন্দ্র প্রকাশ, অনিল বিশ্বাস, বসন্ত দেশাই, শচীন দেব বর্মণ সবার উপরই তার বিশাল শ্রদ্ধার কথা জানিয়েছেন আজীবন। সহ-শিল্পী মুহাম্মদ রফি, মুকেশ, তালাত মাহমুদ, কিশোর কুমার প্রত্যেকের প্রতি তার শ্রদ্ধা ছিল অপরিসীম।
সলিল চৌধুরীর বিষয়েও মান্না দের রয়েছে ব্যাপক উচ্ছ্বাস- এককথায় বলেছেন- ‘খুবই বড় মাপের সুরকার ছিলো সলিল চৌধুরী দুর্ধর্ষ মেধা। ভারসেটাইল জিনিয়াস’। কাবুলিওয়ালা ছবিতে সলিল চৌধুরীর সুরের ‘আয় মেরে প্যারে ওয়াতান’ মান্না দের গাওয়া হিন্দি গানের তালিকার শ্রেষ্ঠের দিকেই অবস্থান নিয়েছে। সলিল চৌধুরীর সুরে আনন্দ ছবিতে ‘জিন্দেগী ক্যায়সি হ্যায় পহলি’ তো এক বিস্মরণীয় গান।
মান্নাদে সর্বভারতীয় শিল্পী হতে চেয়েছিলেন। সেটা তিনি পেরেছেনও ‘চুনরি মে দাগ লাগা’র মতো চূড়ান্ত ক্ল্যাসিকাল গানও যে ফিল্মে ব্যাপক জনপ্রিয় হতে পারে তা যেমন দেখিয়েছেন তেমনি ‘প্যায়ার হুয়া তো একবার হুয়া’র মত হালকা গানও গেয়েছেন। হিন্দি ছাড়াও গেয়েছেন বাংলা, ভোজপুরি, গুজরাটি, পাঞ্জাবী, অসমিয়া মগধি, মৈথিলী ভাষায় বেশ কিছু জনপ্রিয় গান গেয়েছেন। এই সব গান তাকে সর্বভারতীয় খ্যাতি এনে দিয়েছিল ‘বাংলা গানে মান্নাদের আসা সেও এক মজার কাহিনী গৌরি প্রসন্ন মজুমদারের দাদা নন্দ আর মান্না দে এক ভাড়া ঘরে থাকতেন। বছর দশেক ওখানেই ছিলেন। অনেকেই আসতেন। লতা, রফিও আসতেন গান–বাজনা হতো। তখন লতাই তার জন্য দুটো বাংলা গান লিখে দিতে বললেন।
গৌরি প্রসন্ন সেখানে ছিলেন। আর তিনি লিখেছিলেন ‘কতদূরে আর নিয়ে যাবে বল’ স্ত্রী সুলোচনার কাছে একটা ইংরেজি গান শিখেছিলেন মান্না দে আই ওয়াজ ড্যান্সিং উইথ মাই ডালিং এই গানটার সুরে গৌরি প্রসন্ন লিখলেন-‘হায় হায় গো রাত যায় গো’। সুর করলেন মান্না দে। গান লেখা হলো, সুর হলো, এইচ এম ভি স্টুডিও বুক হলো কিন্তু লতা ডেট দিয়েও আসে না। একটু রাগকরে মান্না দে নিজেই গেয়ে দিলেন। প্রথম রেকর্ডেই হিট। আগ্রহী হলো। ঠিক হলো প্রতিবছর পূজার দুটি করে গান করবেন মান্না দে। অতনু চক্রবর্তী বলেছেন ‘লতার এ না গাওয়া বাঙালী শ্রোতাদের কাছে আশীর্বাদ।’
শুরু হলো বাংলা গানের ৫০ বছরে ইতিহাস। এরপর ‘তীর ভাঙ্গা ঢেউ’ এবং ‘তুমি আর ডেকো না’। সেসময় গৌরিপ্রসন্নের খুব চাহিদা তাকে পাওয়াই যায় না। তখন মান্না দের অনুরোধে শ্যামল গুপ্ত দুটো গান পাঠালেন। মান্না দে সুলোচনার কাছে থেকে শেখা ‘ও মাই বয়, আই লাভ ইউ পশ্চিমা গানটার সুর
ভেঙ্গে, নতুন সুর করে গাইলেন “আমি আজ আকাশের মত একেলা’। ১৯৫৬ সালে তিনি আবার নিজের সুরে আধুনিক গানের রেকর্ড বের করলেন, ‘তুমি আর ডেকো না পিছু ডেকো না’, ‘তীর ভাঙা ঢেউ আর নীড় ভাঙা ঝড়’, গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার।
১৯৫৮ সাল, অনিল বিশ্বাসের কথায় রেকর্ড করলেন ‘চাঁদের আশায় নিভায়ে ছিলাম’, প্রণব রায়ের কথায় ‘এ জীবনে যত ব্যথা পেয়েছি’, বঙ্কিম ঘোষ এর কথায় ‘এই কুলে আমি, আর ওই কুলে তুমি, মাঝখানে নদী ওই বয়ে চলে যায়’, ১৯৫৯ সাল। শ্যামল গুপ্ত এর কথায় রেকর্ড করলেন, ‘ও আমার মন
যমুনার অঙ্গে অঙ্গে’, ‘আমি নিরালায় বসে বেঁধেছি আমার স্মরণ বীণ’, প্রতিটি গানের সুর ও স্রষ্টা মান্না দে স্বয়ং। বাংলা গানের জগতে তিনি প্রতিষ্ঠিত শিল্পীর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠিত সুরকার হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করলেন।
১৯৬০ সাল। পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায় অসাধারণ সুর সৃষ্টি করে গাইলেন, ‘আমার না যদি থাকে সুর’, ‘জানি তোমার প্রেমের যোগ্য আমি তো নই’,
‘কথা দাও আবার আসবে’ ইত্যাদি। এরপর সুরের জগতে একের পর যেন ঢেউ উঠলো। সেই ঢেউ এখন গান প্রেমিক মানুষের মনে লাগলেন সুরকার মান্না
দে, ‘কথা দাও আবার আসবে’, ‘একি অপূর্ব প্রেম দিলে বিধাতা আমায়’, ‘জড়োয়ার ঝুমকো থেকে’, ‘ও কেন এত সুন্দরী হলো’, মান্না দে এবং পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় একে অপরের কাছে অপরিহার্য হয়ে উঠলেন।
গাড়িতে কাকার কাছে শোনা ঠুংরী গুনগুন করছিলেন মান্না দে শ্যাম ঘুংগাট না খোলো। কিছুদূর যেতেই পুলক জোর করে নিয়ে গেলেন এক গানের স্কুলে। তৈরি হলো গান সেই সুরে ‘ললিতা ওকে আজ চলে যেতে বল না’। এরকম রয়েছে অসংখ্য গল্প যেমন জনপ্রিয় গজল ‘ইয়ে দর্দ তুমনে দিয়া…’ এর সুর
ভেঙ্গে ‘যখন কেউ আমাকে পাগল বলে…’ এর মতো জনপ্রিয় গান সৃষ্টি করেছেন পুলক-মান্না। পা মান্না দের সুর, অসাধারণ গায়কী এবং পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনন্য লেখনি মিলে বাংলা গানের জগতে সৃষ্টি হলো নতুন ইতিহাস। আর বাংলা গানের শ্রোতারা যেন স্তম্ভিত হয়ে গেলেন এই নতুন সৃষ্টির জোয়ারে। বাংলা গান যে কত মধুর, কত নতুন সুরের আর ঝংকারের হতে পারে তা যেন নতুন করে অনুধাবন করলেন। ‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা‘ এই অবিস্মরণীয় গানটির গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, সুর দিয়েছিলেন নচিকেতার পুত্র সুপর্ণকান্তি ঘোষ। মান্না দের মতে, গৌরীবাবু লিখেছিলেন দুর্দান্ত। সুরকার সুপর্ণকান্তি অসাধারণ কাজ করেছিলেন।
১৯৮৩ সালে পূজায় গাওয়া এই গানটি কালজয়ী গান হিসেবে স্থান করে নেয় শ্রোতাদের মনে এগুলো যেন গান নয়, এত হৃদয় উৎসারিত আবেগ, কান্না, প্রেম আর গভীর এক ভালোলাগা । ‘সেই তো আবার কাছে এলে’, গানের মতোই মনে হলো সেই তো বাংলা গানে অমর হলে এতোদিন তবে কেন হিন্দির কাছেই ছিলে।
হিন্দী সিনেমায় সেই ৫০ সালে গান গাইলে বাংলা সিনেমায় গান গাইবার জন্য বহু বছর প্রতীক্ষা করতে হল মান্না দেকে। কারণ উত্তম আর হেমন্ত জুটি। উত্তমের লিপে হেমন্ত ছাড়া যেন ভাবাই না। উত্তমের জন্য প্রথম গান ১৯৫৯ সালে “গলি থেকে রাজপথ” ছবিতে। লাগ লাগ ভেলকির খেলা। তবে
সেই দুর্ভেদ্য প্রাচীরর ভাঙলো ১৯৬৬ সালে “শঙ্খবেলা” ছবির সেই বিখ্যাত গানটি “কে প্রথম কাছে এসেছি..” মান্না-লতার ডুয়েট। এরপরই ১৯৬৭ সালে এ্যানটনি ফিরিঙ্গি সিনেমার সেই অসাধারণ দুটি গান ‘আমি যামিনী তুমি শশী হে ‘ ‘আমি যে জলসা ঘরে’ উত্তমের সংগে মান্না’দেকে স্থায়ী করে দিলো।
“শঙ্খবেলা”, “অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি”, “চৌরঙ্গী”, “জীবন মৃত্যু” এসব দিয়ে মান্না হয়ে উঠলেন উত্তম কণ্ঠ।
মান্না দে আগাগোড়াই রবীন্দ্রসংগীত ভক্ত। সেই সূত্রেই যেন সহধর্মীকে পাওয়া। মান্নাদের সহধর্মীনি সুলোচনা দেবী থাকতেন মুম্বাইতে। পছন্দ করতেন রবীন্দ্র সংগীত, পেশায় অধ্যাপিকা।
মান্না দের মতে বোম্বেতে স্থায়ী হয়ে যাবার প্রধান বিষয় ছিল দুটি। প্রথমত, জীবন সাথী খুঁজে পাওয়া। দ্বিতীয়ত, তার দাঁতে দাঁত চেপে বোম্বের সঙ্গীত জগতে ঠাঁই পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
রবীন্দ্র জয়ন্তীর অনুষ্ঠানে মান্না দে আর সুলোচনা দেবী দ্বৈত গেয়েছিলেন, ‘লহো লহো তুলেলহ নীরব বীনাখানি’, ‘আমি তোমারি সংগে বেঁধেছি আমার প্রাণ সুরেরও বাঁধনে।’ এই বন্ধনেই হয়ে গেল চিরজীবনের। এ বিয়ে নিয়েও ঝামেলা হয়েছিল। সুলোচনার পরিবারে না হলেও মান্না দের পরিবারে।
এবারও মা মহামায়া পাশে দাঁড়ালেন। সুতরাং বিয়েটা আটকায়নি। ১৯৫৩ এর ১৮ ডিসেম্বর হয়ে গেল শুভ বিবাহ। জীবনে সফল হয়েছিলেন এই কিংবদন্তীর গায়ক। যাকে ভালোবেসেছিলেন সেই মলোয়ালি কন্যা সুলোচনা তাকেই বিয়ে করে সুখী হয়েছিলেন । মান্নাদের ভাষায়- আমি পার্টির চেয়ে বাড়িতেই বেশি
স্বাচ্ছন্দ্য বোধ কার। সুলোচনা আর দুই কন্যা সুরমা আর সুমিতাকে নিয়ে ভরে থাকে আমার সময়’ সুলোচনা ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী ছিলেন । ভালো গাইতেন। তবে শিক্ষকতাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সারাজীবন মান্না দেকে উৎসাহ দিয়েছেন, পাশে থেকেছেন। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন লড়াইয়ের পর ২০১২ সালে মৃত্যুবরণ করেন মান্না স্ত্রীর স্মরণে নতুন গান রেকর্ড করতে চেয়েছিলেন মান্না দে। চারটি গান নিজেই লেখেন আর দুটি রবীন্দ্র সংগীত। নিজেই গাইতে চেয়েছিলেন এই আ্যলবামের গান। অসুস্থতা বেড়ে যাওয়ায় তা আর সম্ভব হয়নি তাঁর পক্ষে।
প্রাণের মানুষ সুলোচনা চলে যাওয়ার পর সবসময়ই বলতেন, ‘আর বাঁচতে ইচ্ছা করে না৷ সুলোচনা আমার পথ চেয়ে বসে আছে’। চিকিৎসা নিতে যখন হাসপাতালে তখনও বলেছেন আমাকে তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিন আমি আমার স্ত্রীর স্মরণে একটা আ্যলবাম করবো। হাসপাতালের কেবিনেও রেখেছেন স্ত্রীর ছবি। এতোটা প্রেমিক ছিলেন বলেই বোধহয় জীবনে গাইতে পেরেছিলেন প্রেমের সেই হৃদয় মুচড়ে দেয়া গান - হৃদয়ের গান শিখে তো গায় গো সবাই, কজনা হৃদয় দিয়ে গাইতে জানে। হিন্দি, বাংলা, মারাঠি, গুজরাটিসহ প্রায় ২৪টি ভাষায় তিনি ষাট বছরেরও অধিক সময় সংগীত চর্চা করেছিলেন। বৈচিত্র্যের বিচারে তাকেই ভারতীয় গানের ভুবনে সবর্কালের অন্যতম সেরা গায়ক হিসেবে স্বীকার করে থাকেন অনেক বিশেষজ্ঞ সংগীত বোদ্ধা। একসময় যে ভক্তিমূলক গান করতেন সেটাও তার কণ্ঠকে অনেক দরদী করে তুলেছিলো। নিয়েছেন ওয়েস্টার্ণ সঙ্গীত থেকেও নির্যাস। তাই তার গান হয়েছে এতো হৃদয়-স্পর্শী আর এতো বৈচিত্র্যময়। ষাট বছরের সংগীত জীবনে মান্না দে সাড়ে তিন হাজারের বেশি গান গেয়েছেন। সংগীত ভুবনে অসামান্য অবদান রাখার স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৭১ সালে পদ্মশ্রী, ২০০৫ সালে পদ্মবিভূষণ এবং ২০০৯ সালে দাদা সাহেব ফালকে সম্মাননায় ভূষিত হন তিনি।
রবীন্দ্রভারতী ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি. লিট সম্মাননাও দেওয়া হয়েছে তাঁকে। এগুলোর পাশাপাশি আরও অনেক পুরস্কার তাঁর ঝুলিতে রয়েছে।
কলকাতায় ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে এই কিংবদন্তি সংগীত শিল্পী তথা সুরকারের জন্ম শতবর্ষ অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন করা হয়। কলকাতাতেই প্রায় একশো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। উত্তর কলকাতায় তার বাসস্থানের কাছে মর্মর মূর্তি স্থাপন করা হয়। এ সব কিছুই মহাকালের এক বড় গায়কের প্রাপ্তি তবে এই সবকিছুর চেয়েও তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয়ে তার স্থান।
ইত্তেফাক/বিএএফ