বাংলাদেশ ভালোভাবেই করোনার সংক্রমণ মোকাবিলা করছিল। গত বছরের মার্চের ৮ তারিখে বাংলাদেশে শুরু হওয়া কোভিড-১৯-এর সংক্রমণ এবং মৃত্যুর হার জুন-জুলাই, আগস্ট এবং সবশেষে ডিসেম্বরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে গেলেও এ বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ নাগাদ সংক্রমণ ও মৃত্যু দুটোই অনেকটা কমে গিয়েছিল। কিন্তু ভারতে করোনার ভয়াবহ আগ্রাসনের কারণে কিছুদিন ধরে নতুন শঙ্কা আর উত্কণ্ঠায় সময় কাটছে সবার। বাংলাদেশেও দৈনিক সংক্রমণ বাড়তে বাড়তে ৮ হাজারের ওপরে চলে যায়। এখন যদিও অনেকটা কমতির দিকে। হঠাত্ করেই করোনার সংক্রমণ আর মৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়ার কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে প্রথমেই যে বিষয়টি গুরুত্ব পায় তা হলো আমাদের অসতর্ক জীবনযাপন।
শীতের শেষে ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই আমরা ধরে নিয়েছিলাম বাংলাদেশ থেকে করোনার অবসান হতে চলেছে। স্বাস্থ্যবিধি না মেনে অনেকেই স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরে গিয়েছিলেন। হলিডে, মেলা, রাজনৈতিক অনুষ্ঠান, সরকারি আর বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় হাজারো অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল দেশে। তারপর বিদেশ থেকে যারা দেশে ফিরেছিলেন, কোনো আইসোলেশন কিংবা কোয়ারেন্টাইন ছাড়াই তারা মিশে গিয়েছিলেন সবার সঙ্গে। সরকারের করোনা থেকে পরিত্রাণের কার্যক্রমেও অনেকেটা বিজয়ের ভাব পরিলক্ষিত হয়েছিল। দেশের মানুষ অনেকটা ভুলতে বসেছিল করোনা মোকাবিলায় যে দরকার কঠোর সতর্কতা ও স্বাস্থ্যবিধির কথা।
বাংলাদেশ অবশ্য নভেম্বরেই ভারতের সিরাম ইনস্টিউটের সঙ্গে ছয় কিস্তিতে ৩ কোটি ডোজ অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিনের চুক্তি করে। জানুয়ারির শেষে করোনার ভ্যাকসিন দেওয়া শুরু হলে আমাদের স্বস্তিটা আরো একটু বেড়ে যায়। গত ৭ মার্চ গণটিকাদান কার্যক্রমের মাধ্যমে এ পর্যন্ত ৭৭ লাখ ৪৬ হাজার ৬৬১ জন টিকা নিয়েছেন। কিন্তু হতাশার কথা হলো, প্রথম কিস্তির ভ্যাকসিন পাঠানোর পরে সিরাম ইনস্টিটিউট দ্বিতীয় কিস্তির পুরোটা ভ্যাকসিন পাঠাতে পারেনি এবং ভারতের করোনা পরিস্থিতি খুব খারাপ হওয়ায় সেখান থেকে ভ্যাকসিন পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। হঠাত্ করে ভ্যাকসিন প্রাপ্যতার বিপর্যয় জনসাধারণকে যেমন করে হতাশায় ফেলেছে, তেমনি হতবিহ্বল হয়েছে সরকার। কিন্তু এই বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগ কিছুটা হলেও আশার আলো জ্বালিয়েছে। সরকার ইতিমধ্যে রাশিয়ার স্পুিনক-ভি ভ্যাকসিন ক্রয়ের ব্যবস্থা করে ফেলেছে। চীনের সিনোফার্ম ভ্যাকসিনেরও অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ। চীন ও রাশিয়ার ভ্যাকসিন জনগণের কাছে পৌঁছাতে বেশ কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। গ্লোবাল এলায়েন্স ফর ভ্যাক্সিন্স অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন্স (গ্যাভি) বাংলাদেশকে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির মধ্যে ৬ কোটি ৮০ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন দেওয়ার আশ্বাস দিলেও সেটাও কবে নাগাদ বাংলাদেশ পাবে তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। গ্লোব বায়োটেক দেশে সফল ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের কথা জানালেও তারা কতটুকু এগোতে পেরেছে তা সবার অজানা। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সত্যিকারভাবেই ভ্যাকসিনের প্রাপ্যতা নিয়ে বাংলাদেশ অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
ভারতে দ্বিতীয় ঢেউয়ে করোনার সংক্রমণে সারা বিশ্ব আজ আতঙ্কিত। যদিও বলা হচ্ছে, করোনার শক্তিশালী মিউটেড স্ট্রেইনের কারণে দ্বিতীয় ঢেউ ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। কিন্তু এটাও সত্য যে, ভারতে এই প্রলয়ংকরী মহামারির অন্যতম কারণ তাদের অসতর্ক জীবনযাপন এবং স্বাস্থ্যবিধি না মানা। তাছাড়া করোনা মোকাবিলায় বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনাকে জনসাধারণের কাছে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছিল ভারত সরকার। যতটুকু অনুধাবন করা যায়, করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের সঙ্গে সঙ্গে ভ্যাকসিনের প্রাপ্যতা নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে বাংলাদেশে করোনা মোকাবিলায় নতুন কৌশলী পরিকল্পনা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
করোনা মোকাবিলায় বিজ্ঞানভিত্তিক কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াও জরুরি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞানীরাই শুধু দক্ষভাবে করোনা মোকাবিলার প্রমাণভিত্তিক নির্দেশনা দিতে পারবেন। আর সরকারের দায়িত্ব হলো বিশেষজ্ঞদের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা। বাংলাদেশে তিন সপ্তাহ ধরে লকডাউন চলছে। লকডাউনের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেছে—এমন চিন্তা করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু লকডাউন শিথিল কিংবা উঠিয়ে নিলে স্বাস্থ্যবিধিসহ অন্যান্য বিষয়কে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি। বিকল্প ব্যবস্থা ও অপশনগুলোকে সঠিক মূল্যায়ন করে বাস্তবায়নের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াও দরকার। হোম কোয়ারেন্টাইন ও আইসোলেশন পদ্ধতি এক বছরের অধিক করোনাকালে বাংলাদেশে গড়ে ওঠেনি। তাই এর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। দেখা গেছে, যেসব দেশ হোম কোয়ারেন্টাইন আর আইসোলেশনকে গুরুত্বের সঙ্গে বাস্তবয়ন করেছে, তারা অনেকটাই সংক্রমণ কমিয়ে আনতে পেরেছে। সংক্রমণ কোথা থেকে কীভাবে হচ্ছে, তা-ও নির্ণয় করা হয় না বাংলাদেশে। কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং বা করোনা রোগীর সংস্পর্শে যারা এসেছে, তাদের চিহ্নিত করে আইসোলেশনে রেখে পর্যবেক্ষণ করলে সহজেই অনেকাংশে করোনার বিস্তার কমানো যায়। তাছাড়া মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করে অফিস-আদালতে, হোটেল-রেঁস্তোরা, দোকান, বাজার-ঘাটে এবং যেসব জায়গায় জনসমাবেশ হয় সেখানে মানুষের উপস্থিতি, সংখ্যা, সময় ইত্যাদি পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এটা দেশের সব এলাকায় সম্ভব না হলেও বড় শহর, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে সহজেই ব্যবহার করা সম্ভব।
জনগণ যাতে স্বাস্থ্যবিধি মানে, সেজন্য তাদের সেভাবে প্রস্তুত করতে হবে। জনসচেতনতা বাড়ানোর জন্য সায়েন্স কমিউনিকেশন বা বিজ্ঞানভিত্তিক যোগাযোগ বাড়াতে হবে। কেন, কীভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে, তা জানালে স্বাস্থ্যবিধি জনসাধারণকে মানানো অনেক সহজ হবে। এক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টিভি, খবরের কাগজ ইত্যাদি মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। জনসমাবেশ কমিয়ে ভার্চুয়াল জগত্টাকে বেশি বেশি ব্যবহার করাও দরকার রয়েছে। নিশ্চিত করে বলা যায়, লকডাউনে অনেক শ্রেণির মানুষ আর্থিকভাবে বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে। দেখা গেছে, এবারের লকডাউনে হতদরিদ্রদের খাবার সরবরাহের বিষয়টি সরকারি ও সামাজিকভাবে তেমন দৃঢ় নয়। সরকারের সহায়তার সঙ্গে সঙ্গে সমাজে আমাদের সবার দায়িত্ব রয়েছে তাদের পাশে দাঁড়ানো।
করোনা রাজনীতি, ধর্ম, ধনী, গরিব, দুঃখীর কোনো শ্রেণিবিন্যাস বোঝে না। তাই বেঁচে থাকতে চাইলে সবাই মিলে করোনা প্রতিরোধ করতে হবে। বাংলাদেশের দৃঢ়চেতা মানুষ কখনোই হার মেনে নেয়নি। আশা করি আমাদের দক্ষ সরকারপ্রধানের নির্দেশনায় বাংলাদেশের মানুষ সব স্বাস্থ্যবিধি ও কৌশলী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে করোনাকে পরাজিত করবে।
n লেখক :প্রবাসী বিজ্ঞানী