বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি বিশ্বের জন্য এক মহাসংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। লাগামহীন বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী। আর বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির পেছনে প্রধান কারণ হচ্ছে গ্রিন হাউজ গ্যাসের বিরূপ প্রতিক্রিয়া। কার্বন ডাইঅক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইডের সমন্বয়ে গঠিত এই গ্যাসের কারণে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। মূলত ১৭৫০ সালের শিল্পবিপ্লবের পর থেকে বায়ুমণ্ডলে গ্রিন হাউজ গ্যাসের পরিমাণ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৭৫০ সালে বায়ুমণ্ডলে কার্বন-ডাইঅক্সাইডের ঘনত্ব ছিল ২৮০ পিপিএম, ১৯৫৮ সালে ৩১৫ পিপিএম, ২০০৫ সালে ৩৮০ পিপিএম, ২০১০ সালে ৩৯০ পিপিএম, সর্বশেষ ২০২০ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪১৭.১৬ পিপিএম। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর গ্রিনল্যান্ড, অ্যান্টার্কটিকা, সুইজারল্যান্ড, কেনিয়া পর্বতমালা, কিলিমাজ্যারো পর্বতের বরফসহ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের বরফ ক্রমশ গলতে শুরু করেছে। যার ফলস্বরূপ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়ে বিভিন্ন অঞ্চল বা রাষ্ট্রের স্থলভূমি বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে পূর্ব এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, সলোমন দ্বীপপুঞ্জের সাগর তীরবর্তী অঞ্চলের বেশকিছু নিম্নভূমি ও ছোট ছোট দ্বীপ বিলীন হয়ে গেছে। পরিবেশবিদদের আশঙ্কা অদূর ভবিষ্যতে বৈশ্বিক উষ্ণতার আগ্রাসনে দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপের হয়তো কোনো অস্তিত্বই থাকবে না।
বৈশ্বিক জলবায়ু ঝুঁকি সূচক (সিআরআই) এর গবেষণা থেকে জানা যায়, গত ২০ বছরে সারা বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবে ৫ লাখ ২৮ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি হয়েছে এবং আবহাওয়া বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেছে ১১ হাজারের বেশি। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বৈশ্বিক উষ্ণতা এই হারে বৃদ্ধি পেতে থাকলে বাংলাদেশের ভূখণ্ডের সমুদ্র তীরবর্তী এক-তৃতীয়াংশ এলাকা ২১০০ সালের মাঝে তলিয়ে যেতে পারে। তখন উপকূলবর্তী প্রায় ৩ কোটি মানুষের আশ্রয়স্থান নিশ্চিত করা বেশ চ্যালেঞ্জ হবে। ঘূর্ণিঝড়, সাইক্লোন, সুনামি, ভূমিধস, ভূমিকম্প, নদী ভাঙন, জলোচ্ছ্বাসসহ নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে দেশের তাপমাত্রা আগের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতি বছর দেশে নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হানছে। উত্তরাঞ্চলে খরা দেখা দিচ্ছে। সময়মতো বৃষ্টি হচ্ছে না। ফসলের মাঠ প্রচণ্ড রোদে খাঁ খাঁ করছে। নদীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। অতিরিক্ত গরমে জনস্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছে। জ্বর ও ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। কৃষিজমি বিলীন হচ্ছে। নদীভাঙন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব মূলত জলবায়ু পরিবর্তনেরই প্রভাব। আইপিসিসির চতুর্থ সমীক্ষা রিপোর্ট থেকে জানা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ২০৫০ সালের মাঝে বাংলাদেশের মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেয়ে ৮৩ হাজার হেক্টর জমি অনাবাদি হয়ে পড়বে। ধানের উত্পাদন হার শতকরা ৮ শতাংশ কমে যাবে। গমের উত্পাদন কমবে ৩২ শতাংশ, যা বাংলাদেশের জন্য বড় সংকটের বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বৃদ্ধি রোধ করতে গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণ যথাসম্ভব নিয়ন্ত্রণ করার কোনো বিকল্প নেই। বেশ কয়েকবার বিশ্বের বিভিন্ন দেশ একত্রিত হয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ হাতে নিলেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রই শেষ অবধি নিজেদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন সমগ্র পৃথিবীর সমস্যা এবং সংকটের বিষয়। তাই সম্মিলিত উদ্যোগে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন রোধে সব রাষ্ট্রকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। যেসব দেশ অধিক পরিমাণে কার্বন গ্যাস নিঃসরণ করছে, সেসব দেশের এ ব্যাপারে আরো দায়িত্বশীল ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আহ্বানে শুরু হওয়া জলবায়ু সামিট-২০২১-এ ভিডিও বার্তার মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গুরুত্বপূর্ণ চারটি পরামর্শ দিয়েছেন। পরামর্শ গুলো হলো—১. কার্বন নিঃসরণের মাধ্যমে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখতে উন্নত দেশগুলোকে পদক্ষেপ নিতে হবে। ২. বার্ষিক টার্গেট ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার তাহবিল নিশ্চিত করতে হবে। ৩. প্রধান অর্থনৈতিক দেশ, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি খাতগুলোকে আর্থিক সহয়তা ও আবিষ্কারের ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে। ৪. সংশ্লিষ্ট জাতিগুলোর মাঝে সবুজ অর্থনীতি এবং কার্বন নিরপেক্ষ প্রযুক্তি উত্পাদনে নজর দিতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই চারটি পরামর্শ বাস্তবায়ন হলে নিঃসন্দেহে বৈশ্বিক উষ্ণতা অনেকাংশে হ্রাস পাবে।
এই পৃথিবী আমাদের আবাসস্থল। তাই পৃথিবীর সুরক্ষার দায়িত্বও আমাদের। শুধু বর্তমানের ভোগ বিলাসে মগ্ন না থেকে আমাদের সূদুরপ্রসারি চিন্তাভাবনা করতে হবে। পৃথিবীটা যেন বাসযোগ্য হয় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যেন সুন্দর এই বসুন্ধরা হিংস্র রূপ ধারণ না করে, সেই লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। কার্বন নিঃসরণ হয় এমন সব যন্ত্রের ব্যবহার কমাতে হতে হবে। গাড়ি, শিল্প ও কলকারখানার ধোঁয়া নিঃসরণ হ্রাস করতে হবে। বিষাক্ত ক্লোরো-ফ্লোরো-কার্বন গ্যাস নির্গত হয় এমন সব যন্ত্রপাতির ব্যবহার কমাতে হবে। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার যথাসম্ভব সীমিত করতে হবে। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তিসহ নবায়নযোগ্য উত্স হতে প্রাপ্ত শক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বৃক্ষনিধন রোধ করে সবুজ বনায়নের দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তন রোধে এসকল টেকসই পদক্ষেপ বাস্তবায়ন না করা গেলে পৃথিবীবাসীকে অদূর ভবিষ্যতে চরম মূল্য দিতে হতে পারে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
n লেখক :শিক্ষার্থী, তেজগাঁও কলেজ, ঢাকা