নারী কোমলমতি, নারী যোদ্ধা, নারী বীরাঙ্গনা। সে রাঁধতে জানে, চুল বাঁধতে জানে। নারী পরিবার, সমাজ, দেশ রাষ্ট্র পরিচালনা করতে জানে। অথচ ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক প্রত্যেকটা ক্ষেত্রেই নারীরা নিরাপত্তাহীনতাই ভুগছেন। পারিবারিক নির্যাতনের পাশাপাশি নারীরা যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৩ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত গণপরিবহনে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২৯ জন নারী। যাদের মধ্যে ১৩ শতাংশ নারীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। কর্মস্থলেও নারীদের নিরাপত্তা অনিশ্চিত, বিশেষ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ৯৬ শতাংশ নারীরা জীবনে একবার হলেও যৌন হয়রানির শিকার হন।
২০০৯ সালে হাইকোর্ট কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি রোধে নির্দেশনা দেয়। তাতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কমিটি গঠনের কথা বলা হয়। অভিযোগ দেওয়ার ব্যবস্থা এবং তার নিষ্পত্তির ব্যবস্থার জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনাও দেওয়া হয়। কিন্তু তা অনুসরণ করছে না প্রতিষ্ঠানগুলো। অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের গবেষণায় দেখা গেছে, ৮৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠান যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটির ব্যাপারে জানে না। নারীদের নিরাপত্তার বিষয়ে এত উদাসীনতা থাকলে কখনোই আমাদের সমাজের নারীরা নিরাপদভাবে চলাফেরা করতে পারবে না, নিরাপদভাবে তাদের কর্মস্থলেও থাকতে পারবে না।
একজন নারীকে বিভিন্নভাবে নির্যাতন বা বৈষম্যের শিকার হতে হয়। এরমধ্যে রয়েছে যৌন হয়রানি, শারীরিক নির্যাতন, মানসিক নির্যাতন, মজুরি বৈষম্য, পদ বৈষম্য ইত্যাদি। জাতীয় শ্রমশক্তি জরিপ প্রতিবেদন অনুসারে, পুরুষের সমান কাজ করলেও নারী শ্রমিকরা মজুরি পান কম। কাজ করার স্বাধীনতা থাকলেও নেই নিরাপত্তা, নেই ন্যায্য মজুরি। বিশেষ করে গার্মেন্টসের নারী কর্মীরা তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বেশি বঞ্চিত হয়। নানাভাবে যৌন হয়রানিরসহ বিভিন্ন সমস্যায় পড়তে হয় তাদের।
পরিবারেও নিরাপদ নয় নারীরা। অথচ পরিবারকে বলা হয় নারীদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ স্থান। প্রতি বছর ২৫শে নভেম্বর ‘আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস’ পালন করা হয়। ঘরে-বাইরে বা ব্যক্তিগত জীবনে নারীদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্যই এ দিনটিকে বেছে নেয় জাতিসংঘ। অথচ আজও ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সহিংসতার শিকার হয় নারীরা। পারিবারিক অঙ্গনেই নারী নির্যাতন ও নিপীড়নের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে। ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট অনুযায়ী নারী নির্যাতনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ২৮তম। নির্যাতিতদের মধ্যে ৬০ শতাংশ বিবাহিত যারা পারিবারিকভাবে নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়।
একবিংশ শতাব্দীতেও নারী নির্যাতন, নারীর নিরাপত্তাহীনতা বাস্তব সত্য। অথচ এই নারীর কারণেই একটি সন্তান পৃথিবীর আলো দেখতে পায়, শুভ সূচনা হয় একটি সুন্দর জীবনের। তবুও নারীকে সেই সম্মানটুকু দিতেও আমরা কার্পণ্য করি। আমাদের সমাজে নারী-পুরুষ উভয়েই সমান অধিকারের অধিকারী। কিন্তু এই অধিকারের কতটুকু ভোগ করতে পারেন নারীরা? নারীর সব জায়গায় যাওয়ার স্বাধীনতা থাকলেও সব জায়গায় তাদের নিরাপত্তা নেই। আছে অনেক বাধা-বিপত্তি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে প্রতিটি জায়গায় তারা যৌন হয়রানিসহ নানারকম ভোগান্তির শিকার হয়।
বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে, পরিবর্তিত হচ্ছে সমাজ কাঠামো, বিকশিত হচ্ছে সভ্যতা। পরিবর্তনের হাওয়াও লাগছে মানুষের জীবনযাত্রায়। আশ্চর্য হলেও সত্য যে, এরপরও বন্ধ হয়নি নারীর ওপর নির্যাতন, নারী পায়নি নিরাপত্তা, নারী স্বাধীনতা বলতে যা বিদ্যমান তাও নামমাত্র। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী এবং সমাজের উন্নয়নে তাদের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু আজও তারা শান্তি, নিরাপত্তা ও অধিকারের দিক দিয়ে এখনো পুরুষের সমকক্ষ নন। এই বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি সবকিছুতেই রয়েছে নারীর অবদান অথচ কিন্তু সেই নারীদেরই নেই নিরাপত্তা। নারীর নিরাপত্তার ব্যাপারে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের প্রত্যেককে সোচ্চার হতে হবে, না হয় নারীরা লাঞ্ছনা এবং বঞ্চনার শিকার হতেই থাকবে। নারীদেরও তাদের নিরাপত্তার ব্যাপারে অনেক সচেতন হতে হবে, আত্মরক্ষার কৌশল শিখতে হবে। সমাজের প্রতিটি নারীই নিরাপদ থাকুক এটিই প্রত্যাশা।
n লেখক :শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।