ইরান-সৌদি বৈরিতার চিত্র

আঞ্চলিক কর্তৃত্ব বজায় রাখার লক্ষ্যে বিগত কয়েক দশক যাবত শিয়া অধ্যুষিত ইরান এবং সুন্নি অধ্যুষিত সৌদি আরবের মধ্যে বৈরী সম্পর্ক বিরাজ করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতি গুঞ্জন ছড়িয়েছে যে ইরান ও সৌদি আরব সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য এই দুই দেশের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা পার্শ্ববর্তী দেশ ইরাকে একটি গোপন বৈঠক করেছেন। কিন্তু এই গোপন বৈঠকের কথা অস্বীকার করেছে সৌদি প্রশাসন এবং ইরান এ বিষয়ে কোনো বিবৃতি না দিলেও তারা সৌদি আরবের সঙ্গে সংলাপে আগ্রহী বলে জানিয়েছে। এরই মধ্যে আল আরাবিয়া টিভির সাক্ষাত্কারে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান ইরানের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপনের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তবে বিন সালমান ইরানের সঙ্গে তাদের কিছু সমস্যার কথা মনে করিয়ে দেন। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, মিসাইল পরীক্ষা এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত অস্ত্রধারীদের সাহায্য করা। তবে এসব সমস্যা সমাধানে সৌদি আরব এবং তার মিত্ররা একসঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী বলে তিনি জানান। তবে কি ইরান-সৌদি আরব দ্বন্দ্বের সমাপ্তি ঘটতে চলেছে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে জানতে হবে এই দুই দেশের দ্বন্দ্বের ইতিহাস সম্পর্কে।

ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যকার দ্বন্দ্ব মূলত বহু পুরাতন। এই দুই দেশের মধ্যকার দ্বন্দ্বের জন্য উভয় দেশের আঞ্চলিক আধিপত্য লাভের আশা, মুসলিম বিশ্ব শাসনের প্রবল আকাঙ্ক্ষা, শিয়া-সুন্নি মতভেদ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি একে অন্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নীতিই দায়ী। ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে পরস্পরবিরোধী মনোভাব থাকলেও তারা কখনো সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়নি। তাদের মধ্যকার এই বৈরী অবস্থাকে স্নায়ুযুদ্ধ বা শীতলযুদ্ধ বলা যেতে পারে। ১৯২৯ সালে এই দুই দেশের মধ্যে প্রথম কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন হওয়ার পরেও তাদের মধ্যে শত্রুভাবাপন্ন মনোভাব থেকে যায়। ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লব সংগঠিত হওয়ার পর থেকে এ দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কের অবনতি হতে শুরু করে। ইরান এই বিপ্লবের পর থেকেই সৌদি আরবের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সমালোচনা করতে থাকে। তখন থেকে ইরান ও সৌদি আরব একে অন্যের বিরুদ্ধে লাগাতার কটূক্তি করতে থাকে এবং একে অপরকে সন্দেহের চোখে দেখা শুরু করে যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও চলে আসছে। সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যে তাদের কর্তৃত্ব বৃদ্ধির পথে ইরানকে বড় একটি হুমকি ভাবতে শুরু করে। ২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর আক্রমণে সাদ্দাম হোসেনের পতন হলে ইরানে স্বস্তি আসে। সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর থেকে আজ অবধি ইরাকে ইরানের প্রভাব বেড়েই চলেছে। প্রতিবেশী এই দুই দেশের শত্রুতা বন্ধুত্বে রূপান্তরিত হওয়ায় আরব বিশ্বে নিজেদের প্রভাব নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে সৌদি আরব।

সিরিয়া ইস্যু নিয়েও এই দুই দেশের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। সিরিয়ায় ইরান বাশার আল আসাদ প্রশাসনকে সমর্থন দিয়ে থাকলেও সৌদি আরব সব সময় আসাদবিরোধীদের পক্ষে। ২০১১ সালে আরব বসন্তের সময় ইয়েমেনে সরকার ক্ষমতায় হস্তান্তর নিয়ে এক গৃহযুদ্ধের সূচনা হয়। ইয়েমেনের তত্কালীন প্রেসিডেন্ট সালেহ সৌদিসমর্থিত হাদির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। এসময়ে ইয়েমেনের অভ্যন্তরে কিছু গোষ্ঠী হাদি এবং তার প্রশাসনের বিরোধিতা করতে শুরু করে। এই বিরোধিতায় সালেহর অনুগত কিছু সেনা সদস্যও যোগ দেয়। এতে হাদি তার ক্ষমতা ধরে রাখতে হিমশিম খেতে শুরু করে। এই সুযোগ কাজে লাগায় ইয়েমেনের সংখ্যালঘু শিয়া মিলিশিয়া বাহিনী যারা হুতি নামে পরিচিত। সৌদি আরব বারবার ইরানের বিরুদ্ধে হুতিদের সমর্থন করার অভিযোগ আনলেও ইরান তা অস্বীকার করেছে। এ বিষয়টি নিয়েও ইরান-সৌদি আরব বিরোধ রয়েছে। ইয়েমেন সংকটের ইস্যু নিয়েই মূলত ইরান-সৌদি আরব দ্বন্দ্ব চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। এছাড়াও বিগত কয়েক মাসে সৌদি আরবের কয়েকটি মিত্র দেশ ইহুদিবাদী রাষ্ট্র ইসরাইলের সঙ্গে মিত্রতা গঠন করেছে এবং সৌদি আরব ইসরাইলের সঙ্গে গোপনে মিত্রতা করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইসরাইলের সঙ্গে ধর্মীয় কারণে ইরানের শত্রুতা রয়েছে। ইসরাইলের সঙ্গে সৌদি আরব এবং তার সমর্থক রাষ্ট্রগুলোর মিত্রতা সৃষ্টির ফলে সৌদি আরব এবং তার মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের শত্রুতা বেড়ে যায়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা বৃদ্ধিকে সৌদি আরব নিজেদের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে। তারা বরাবরই ইরানের পরমাণু কর্মসূচির কঠোর সমালোচনা ও বিরোধিতা করে আসছে। মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের কর্তৃত্ব অক্ষুণ্ন রাখতে সৌদি আরব বিগত কয়েক বছরে তাদের সামরিক ব্যয় কয়েক গুণ বৃদ্ধি করেছে। কিন্তু এই বৈরিতার মধ্যেও আশার আলো দেখাচ্ছে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন বিষয়ে প্রিন্স বিন সালমানের সাম্প্রতিক উক্তিটি। তবে আপাতদৃষ্টিতে যতটুকু বোঝা যায় ইরান এবং সৌদি আরব উভয় দেশই নিজেদের সামরিক সক্ষমতা অর্জন অব্যাহত রাখতে চাইবে। এছাড়া ইরান তার পরমাণু কার্যক্রম বন্ধ করতে সম্মত হবে না এবং উভয় দেশই আরব বিশ্বে নিজেদের শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে চাইবে। এর ফলে সৌদি আরবের সঙ্গে ইরানের মতবিরোধ থেকেই যাবে বলে ধারণা করা যায়। এখন সময়ই বলে দেবে ইরান-সৌদি আরব সম্পর্ক উন্নয়নে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের এই আগ্রহ কতটুকু সফল হবে।

n লেখক : শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।