করোনার আঘাত সব খাতেই

সম্প্রতি ‘দি উইকেস্ট লিঙ্ক ইন গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন ঃ হাউ দ্য প্যান্ডেমিক ইজ অ্যাফেক্টিং বাংলাদেশ গার্মেন্টস’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত এক বছরে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে দেশের ৩৫ শতাংশ পোশাকশ্রমিকের বেতন কমেছে। অথচ করোনার সংক্রমণ যখন ঊর্ধ্বমুখী দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে স্বাস্থ্যঝুঁকি উপেক্ষা করে কাজ করে যাচ্ছে পোশাক খাতের শ্রমিকরা, বিনিময়ে পাচ্ছে না যথাযথ পারিশ্রমিক। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ দেশে আঘাত হানার পর চলমান লকডাউনেও পোশাক খাতের শ্রমিকরা কার্যত ফ্রন্টলাইনারের ভূমিকাতে অবতীর্ণ হয়েছে। তাছাড়া করোনার প্রকোপ বাড়ার পর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাওয়া পোশাক খাতসহ বিভিন্ন খাতের শ্রমিকদের প্রচেষ্টার ফলে পণ্য রপ্তানিতে নতুন মাইলফলকে পৌঁছাল বাংলাদেশ। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবির) হালনাগাদ হিসাব অনুযায়ী গত এপ্রিল মাসে ৩১৩ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে যা গেল বছরের এপ্রিলের চেয়ে ৫০২ দশমিক ৭৫ শতাংশ বেশি।

চলমান করোনা মহামারির মধ্যে পোশাক খাতের শ্রমিকদের বেতনাদি পরিশোধের লক্ষ্যে গতবছর সরকারের কাছ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ পায় কারখানার মালিকরা। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) ও দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের এক যৌথ জরিপে দেখা যায়, সরকার প্রদত্ত মোট প্রণোদনার ৫৮ শতাংশ পেয়েছে তৈরি পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো। তবুও করোনা ভাইরাস দেশে আঘাত হানার পর থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় ৩ লক্ষাধিক শ্রমিক ছাঁটাই বা কর্মচ্যুতির শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটি (বিসিডাব্লিউএস)। উল্লেখ্য, যারা ছাঁটাই হয়েছেন তাদের মধ্যে অনেকেই বকেয়া বেতন বা কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণের টাকা পাননি।

করোনা ভাইরাসের প্রকোপ অনেকাংশেই নাজুক করে ফেলেছে পোশাকশ্রমিকদের জীবনধারা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্ট্যারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, করোনা ভাইরাসের চলমান সংকটকালে প্রায় ৭৭ শতাংশ শ্রমিক তাদের পরিবারের খাদ্যচাহিদাও পূরণ করতে পারছে না। দৈনন্দিন তৈজসপত্র-খাদ্যসামগ্রীর দাম করোনা ভাইরাস চলাকালীন সময়ে বৃদ্ধি পাওয়ায় নিজেরসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের খাদ্যঘাটতি পূরণ সম্ভব হচ্ছে না। স্বাভাবিকভাবেই খাদ্যচাহিদার ঘাটতি থাকার ফলে তারা বিভিন্নরকম দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে আছেন। ইউনাইটেড ন্যাশন ডেভলপমেন্ট প্রোগ্রাম (ইউএনডিপি) ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির চৌধুরী সেন্টার ফর বাংলাদেশ স্টাডিজ এবং ইনস্টিটিউট ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড বিজনেস পরিচালিত গবেষণায় করোনাকালীন সময়ে গার্মেন্টসকর্মী, বিশেষ করে নারীকর্মীদের বিভিন্ন ঝুঁকির চিত্র উঠে এসেছে। করোনায় সৃষ্ট সংকটে বাজারে চাহিদা কমা, শিপমেন্ট বন্ধ, প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময় লাগা, সময়মতো মূল্য না পাওয়া ইত্যাদির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে পোশাক খাতের শ্রমিকদের ওপর। তাছাড়া চাকরি ছাঁটাই-মজুরি কর্তনের ফলে, আর্থিকভাবে দেনাগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন কেউ কেউ।

চলমান করোনা মহামারির উদ্বেগজনক পরিস্থিতি একটি সত্যকে সামনে এনেছে যে শ্রমিকরাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশের উত্পাদন, রপ্তানি তথা দেশের অর্থনীতির চালিকা শক্তি অব্যাহত রাখে। অথচ সেই পোশাকশ্রমিকের কপালে জোটে অবহেলা, বিনা চিকিত্সা, অপুষ্টি আর হয়রানি। দেশের অর্থনীতির গতি সচল রাখার লক্ষ্যে পোশাকশ্রমিকদের ভূমিকা অনন্য। তাই শ্রমিকদের কল্যাণে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

n  লেখক- শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়