আমরা কি কেবল ‘বাজার’ হয়েই থাকব?

অন্ধের হস্তীদর্শন নামে প্রতীকী একটা গল্প চালু আছে। গল্পটি আমাদের সবার কমবেশি জানা। সেই যে পাঁচ জন অন্ধের সামনে হাতি এনে বলা হয়েছিল, হাতি কেমন দেখতে সেটা বর্ণনা করতে। যেই অন্ধজন হাতির কান ধরেছে সে বলেছে হাতি কুলোর মতো দেখতে। এভাবে যে যে শুঁড়, লেজ, শরীর প্রভৃতি ধরেছে তাদের প্রত্যেকের কাছে হাতি ভিন্ন ভিন্ন রকম বলে মনে হয়েছে। করোনা ভাইরাসও আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত অন্ধের হাতি দর্শনের মতো। এটা ঠিক যে, বিজ্ঞানের জয় দেখে আমরা বিস্মিত হই। কিন্তু এটাও ভুলে গেলে চলবে না, বিজ্ঞানের সব শাখার মধ্যে সবচাইতে পিছিয়ে রয়েছে চিকিত্সাবিজ্ঞান। মানবশরীর ও জীবাণুজগত্ এতটাই রহস্যময় যে মানুষ আক্ষরিক অর্থেই মানবশরীরের জ্ঞানসমুদ্রে বসে কেবল কয়েকটি নুড়ি কুড়িয়েছে। করোনার একাধিক ভ্যাকসিন অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে আবিষ্কার করা সম্ভব হলেও এটার সুদূরপ্রসারী ভালো-মন্দ দিকগুলো এখনো আমাদের অজানা। তার পরও শেষ বেলায় আমাদের বিজ্ঞানের ওপরই ভরসা রাখা ছাড়া বিকল্প আর তো কিছু নেই। ভ্যাকসিনই ভরসা। কিন্তু সেই ভ্যাকসিন নিয়েও কত ধরনের খেলা চলছে!

গত বছর করোনা যখন চীন থেকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ল, তখন ইতালি ও আমেরিকার অবস্থা দেখে আমরা চমকে উঠেছিলাম। চীন তার নিজস্ব রাষ্ট্রীয় কঠোর শক্তি দিয়ে করোনা ভাইরাসকে দেশের মধ্যে বেশি দূর ছড়াতে দেয়নি। চীন থেকে ভাইরাসটা ছড়ালেও সর্বশেষ ওয়ার্ল্ডোমিটারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী করোনায় আক্রান্তের সংখ্যার তালিকায় যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও ব্রাজিল যথাক্রমে এক, দুই ও তিন নম্বরে। কিন্তু চীনের অবস্থান কোথায়? ওয়ার্ল্ডোমিটার বলছে, চীন সংক্রমণের তালিকায় ৯৬ নম্বরে। মাত্র ৯০ হাজার ৭১৪ জন চীনে আক্রান্ত হয়েছে। আর যুক্তরাষ্ট্রে আক্রান্তের সংখ্যা ৩ কোটি ৩২ লাখের বেশি। আর ভারতে আক্রান্তের সংখ্যা ২ কোটির ওপরে। গত বছর এপ্রিলে আমরা প্রবল আতঙ্কে দেখেছি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে করোনায় প্রতিদিন এত মানুষ মারা যাচ্ছিল যে, তাদের ঠিকমতো কবর দেওয়া যাচ্ছিল না। ইউরোপের অবস্থাও খুব খারাপ ছিল। আমরা অপেক্ষায় ছিলাম, কবে করোনার প্রতিষেধক আসবে। আর এবার করোনার দ্বিতীয় ঢেউ সুনামির মতো করে ছড়িয়ে পড়েছে ভারত জুড়ে। ছোট্ট একটি পরিসংখ্যান দেওয়া যাক। ভারতে এ বছর ৮ ফেব্রুয়ারি করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ছিল মাত্র ৯ হাজারের কাছাকাছি। এপ্রিলের ৪ তারিখে দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ছাড়াল, আর ৩০ এপ্রিল সেই আক্রান্তের সংখ্যা ৪ লাখ টপকে গেল! সেখানে শ্মশানে লাশ পোড়ানোর জায়গা হচ্ছে না। হাসপাতালে মানুষ শুধু অক্সিজেনের অভাবে মারা যাচ্ছে। এই ট্র্যাজেডি ঘটছে দিল্লির মতো শহরে। গ্রামাঞ্চলে মানুষের পরিণতি তাহলে কী হচ্ছে, সেটা অনুমান করলে যে কারো গা শিউরে উঠবে।

বাংলাদেশেও সংক্রমণের ঢেউ উঁচু হচ্ছিল। তবে ভারতের মতো সুনামির আকারে নয়। মার্চের শুরুতে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৫০০-এর কাছাকাছি, এরপর বাড়তে বাড়তে এপ্রিলের শুরুতে ৭ হাজার ছাড়িয়ে যায়। ভারতে যেখানে বেড়েছে প্রায় ৫০ গুণ মাত্রায়, সেখানে বাংলাদেশে বেড়েছে প্রায় ২০ গুণ মাত্রায়। তবে এটাকে আপাতভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। এখনো ঢিলেঢালা লকডাউন চলছে। কিন্তু ভারতে কেন এমন সুনামি সৃষ্টি হলো? এর দুটো কারণ সাদা চোখে দেখা যাচ্ছে। একটি হলো, করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট যেটা প্রচণ্ড সংক্রামক, অন্যটি ভারতের পাঁচটি রাজ্যে বিধানসভার নির্বাচন। এসব নির্বাচনের প্রচারণা শুরু হয় মার্চের শুরুতে, বিভিন্ন দফার নির্বাচন শেষে ভোট গণনা হয় ২ মে। আমরা দেখেছি, সংক্রমণ যখন বাড়ছে তখনো নির্বাচনি জনসংযোগে দূরত্ববিধি শিকেয় তুলে লাখ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছে। এরপর করোনার আগুনে ঘি ছড়ায় ধর্মীয় উত্সব কুম্ভমেলা। ১৫ এপ্রিল আনন্দবাজারের রিপোর্টে বলছে, সে সময় ভারতে করোনায় আক্রান্তের দৈনিক সংখ্যা যখন ২ লাখ ছাড়িয়েছে, তখন কুম্ভমেলায় কয়েক দিনে অংশ নিয়েছেন ২৩ লাখের বেশি পুণ্যার্থী, যাদের মধ্যে ১৭ শতাধিক করোনায় আক্রান্ত! ভারতের গণমাধ্যমই বলতে শুরু করল, কুম্ভমেলা হয়ে উঠছে করোনার ‘সুপারস্প্রেডার’। এ প্রসঙ্গে আমাদের মনে পড়ে যেতে পারে, গত বছর এপ্রিলে দিল্লির নিজামুদ্দিন মসজিদে তাবলিগ জামাতের কথা। সেই আয়োজনে যে ধর্মীয় সমাবেশ হয়েছিল তা থেকেই বিপুল মানুষের শরীরে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছিল বলে ভারত জুড়ে সমালোচনা উঠেছিল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে যারা ঐ তাবলিগে অংশ নিয়েছিলেন, তারা ভারত সরকারের রোষানলে পড়েছিলেন। তাদের আটক রাখা হয় এবং এ বছর মার্চ পর্যন্ত তাদের অনেককেই দেশে ফিরতে দেওয়া হয়নি, কালো তালিকাভুক্তও করা হয়। কেন? তারা তো নিয়ম মেনে ভিসা করেই সেখানে গিয়েছিলেন।

মহামারি সব সময়ই নতুন নতুন রহস্য তৈরি করে। মহামারির ইতিহাস তো মানবসভ্যতার মতোই প্রাচীন। শতকের পর শতক ধরে বিভিন্ন সময় সংক্রামক ব্যাধি ছড়িয়ে পড়েছে কোনো নির্দিষ্ট এলাকায়, কখনো আবার বিশ্বব্যাপী। কিন্তু গত ৭০-৮০ বছরে করোনা মহামারির মতো ভয়াবহ কোনো মহামারি প্রত্যক্ষের অভিজ্ঞতা আমাদের বয়স্ক জনগোষ্ঠীরও কারো নেই। যে কারণে একুশ শতকের আধুনিক সময়ে এসেও মধ্যযুগে প্লেগে ইউরোপের ব্ল্যাক ডেথের স্মৃতি কিংবা ভারতে গুটিবসন্ত, যক্ষ্মা, কলেরা মহামারির মতো আরেক ধরনের মহামারি যে আমাদের এভাবে গৃহবন্দি করে মৃত্যুভয়ে সন্ত্রস্ত করে তুলতে পারে—সেটা আমাদের সবার জন্য ছিল কল্পনাতীত ব্যাপার। সর্বশেষ ১৯১৮ ও ১৯১৯ সালের মধ্যে স্প্যানিশ ফ্লুতে আনুমানিক ৫ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। করোনা ভাইরাস কত কোটি মানুষ মারবে এবং কত কোটি মানুষের পেটের ভাত কাড়বে, পৃথিবীর অর্থনীতিকে কত বছরের জন্য পেছনে নিয়ে যাবে—এখনো স্পষ্ট নয়।

কোভিড যখন গত বছর মার্চে বাংলাদেশে এলো, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষের অনুষ্ঠানও সরকার পুরোপুরি সীমিত করে দিল। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিন্তু প্রথম থেকেই সতর্ক ছিলেন। সেই তুলনায় বিশ্বের সবচাইতে শক্তিশালী দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনো কিছু না মেনেই নির্বাচনি প্রচারণায় মেতে ছিলেন। ট্রাম্প নিজে ডুবেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রকেও করানোয় জর্জরিত করেছিলেন। আমরা অবাক হয়ে দেখলাম, এক বছর পর ট্রাম্পকে ফলো করে ভারতের প্রধানমন্ত্রীও একই কাজ করলেন।

এর মধ্যে চিকিত্সাবিজ্ঞানের ইতিহাসে রেকর্ড ভেঙে সবচাইতে স্বল্প সময়ের মধ্যে বেশ কার্যকর কয়েকটি ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হয়। আমাদের দূরদৃষ্টিসম্পন্ন প্রধানমন্ত্রী গত নভেম্বরেই ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট থেকে আগাম মূল্য পরিশোধ করে বেক্সিমকোর মাধমে ৩ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন আনার ত্রিপক্ষীয় চুক্তি করেন। তারপর ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে ভ্যাকসিন বিনা মূল্যে দেওয়াও শুরু করে বাংলাদেশ। তবে হঠাত্ করেই ভারতে করোনার সুনামি সৃষ্টি হওয়ায় এখন এই ভ্যাকসিন ৭০ লাখ ডোজ আসার পর আটকে গেছে। এ বিষয়ে অনেকেই অনেক কিছু লিখেছেন। আমরা এখন বুঝতে পারছি, যার দোষেই তা হোক না কেন, ভারতে কোভিডের এই মহামারি বাকি বিশ্বের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। বিশ্বের ৬০ শতাংশ ভ্যাকসিন কেবল ভারতেই তৈরি হয়। সে কারণে কেবল বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের ৯২টি দেশ অপেক্ষায় ছিল যে তাদের ভ্যাকসিনের চালান আসবে ভারত থেকে। বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর জন্য সস্তায় বা বিনা মূল্যে কোভিড ভ্যাকসিন সরবরাহের জন্য ‘কোভ্যাক্স’ নামে আন্তর্জাতিক যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, ভারত থেকে সেখানে ২০ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন সরবরাহের কথা। সেটাও আপাতত হিমঘরে চলে গেছে। এদিকে ভ্যাকসিন ছাড়া এই মহামারি থেকে রক্ষা পাওয়ার আপাতত আর কোনো শর্টকাট পথ নেই। ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের যেসব দেশ বিপুলসংখ্যক মানুষকে ভ্যাকসিন দিয়েছে, তারা বহুলাংশে করোনা সংক্রমণের রাশ টানতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু ভারতের করোনা-সুনামিতে বিশ্বের অসংখ্য দেশেও বড় মাপের মানবিক বিপর্যয় দেখা দিচ্ছে।

আমরা আগের মহামারির কথা ভুলে গেছি। আর বিভিন্ন গ্যাজেট নিয়ে নতুন প্রজন্ম এতটাই ব্যস্ত যে, তারা কিছুই জানে না। আগামী দিনে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আরো কত ধরনের বিপত্তি আর মহামারি আসতে পারে, সেটা আমরা কল্পনাও করতে পারছি না। অনেকেই বলছেন, করোনা সহজে যাবে না, এটাকে মানিয়ে নিয়েই আমাদের চলতে হবে। আমাদের লাইফস্টাইল ও চিন্তাধারায় পরিবর্তন আনতেই হবে।

সুতরাং আমাদের নিজের ওপর ভরসা করতে শিখতে হবে। আমরাও কিন্তু ভ্যাকসিন তৈরির তালিকায় ছিলাম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তালিকায় বাংলাদেশের গ্লে­াব বায়োটেকের নাম আছে। যে ১৫৬টি টিকা পরীক্ষামূলক প্রয়োগের পূর্বাবস্থায় আছে, তার মধ্যে গ্লে­াবের তিনটি টিকা আছে। কিন্তু আমাদের এখানে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার তুলনা হয় না। স্বাস্থ্য খাতে গবেষণা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ওষুধ তৈরিতে আমাদের যেসব প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছিলাম, গত কয়েক দশকে সেগুলো নষ্ট করেছি। অনেকে মনে করেন, আমরা পরনির্ভরশীল থাকতে পছন্দ করি, আমদানির মাধ্যমে কাউকে কাউকে কিছু টুপাইস আয় করার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য। অথচ টিকার ক্ষেত্রে আমাদের সাফল্য অসামান্য। এই সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সদর দপ্তরে গ্লে­াবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশনের (গ্যাভি) থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘ভ্যাকসিন হিরো’ হিসেবে পুরস্কৃত করা হয়। সুতরাং সময় এসেছে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ করে আবার টিকা উত্পাদনে যাওয়ার। রাশিয়ার সঙ্গে ভ্যাকসিন উত্পাদনে যে কথা চলছে, সেটার অপার সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী দিনে বাংলাদেশ হয়ে উঠতে পারে অন্যতম টিকা উত্পাদনকারী দেশ। শুধু নিজেদের জন্য নয়, বিশ্ববাজারের জন্যও। টিকার প্রয়োজন বহাল থাকবে দীর্ঘদিন, হয়তো-বা চিরদিন।

আসলে, আমরাও অনেক কিছু পারি। কিন্তু বিশ্বায়নের পাল্লায় পড়ে আমরা এখন কেবল স্রেফ ‘বাজার’ হয়ে যাচ্ছি। আমরা দেখতে পাচ্ছি, সাধারণ মানুষ কীভাবে পলিসির কাছে মার খাচ্ছে। রাজনীতি এখন সম্পূর্ণ ব্যবসায়ে পরিণত হয়েছে। নেতৃত্ব বলে আর কি কোনো জিনিস আছে? অথচ আমাদের শীর্ষ নেতৃত্ব তৃতীয় বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের চেয়ে অনেক বেশি ভালো। কিন্তু আমরা নিজেরা নাগরিক হিসেবে যে দায়িত্ব পালন করছি না, আমরা দায়িত্ববান হলে আমাদের লিডারও অনেক চ্যালেঞ্জ অনেক সহজে মোকাবিলা করতে পারেন, এটা আমাদের বুঝতে হবে। আমাদের নেতৃত্বের যদি কিছু ভুল হয়ে থাকে, সেটা সবার দোষে হচ্ছে, শীর্ষ নেতৃত্বের নিজস্ব ভুলে নয়। সুতরাং আমাদের নিজ নিজ জায়গা থেকে যার যার কর্তব্য পালন করতে হবে। কেবল রাজনৈতিক কারণে বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করার মানসিকতা থেকে সরে আসতে না পারলে আমরা মহামারি থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারব না। আমরা বরং নিজেরাই এক-একটা মহামারিতে পরিণত হব। নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস করে ফেলব। এভাবেই মানবতা ধ্বংস হবে, পৃথিবী ধ্বংস হবে।

n লেখক :সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেফাক ও পাক্ষিক অনন্যা