বিদায় মাহে রমজান

আজ ১৪৪২ হিজরির ২২ রমজানুল মোবারক অতিবাহিত হচ্ছে। ইসলামের আদেশ-নিষেধ পালন করলে ইহকাল ও পরকালে কল্যাণ হয়—এ কথা আমাদের সবারই জানা। আল্লাহপাক রব্বুল আলামিনের প্রতিটি আদেশ-নিষেধ পালনের মধ্যে ব্যক্তিজীবন, সমাজজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিহিত রয়েছে কল্যাণ ও উপকারিতা। রোজা তেমনি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি বিধান। স্বাস্থ্য রক্ষার ক্ষেত্রে রোজা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

মানবদেহের নির্মাতা স্বয়ং আল্লাহপাক রব্বুল আলামিন ভালো করে জানেন শরীরকে সুস্থ, সবল ও কর্মক্ষম রাখার জন্য এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য কী ব্যবস্থা নিতে হবে। উক্ত ব্যবস্থার অংশ                হিসেবে তিনি বছরে এক মাস রোজা রাখা ফরজ করেছেন। বিভিন্ন প্রকারের রোগ নিরাময়ের জন্য রোজার যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। এ সম্পর্কে চিকিত্সাবিজ্ঞানী ডা. আলেক্স হেইগ বলেন, রোজা শরীরের রক্তপ্রবাহকে পরিশোধন করে থাকে এবং সমগ্র প্রবাহনালিকে নবরূপ দান করে থাকে।

রোজা উচ্চরক্তচাপ এবং অন্যান্য মারাত্মক ব্যাধি কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া বিভিন্ন গবেষণা থেকে দেখা গেছে, রোজা রাখার ফলে ডায়াবেটিস রোগীদের অবস্থার উন্নতি হয়েছে, তাদের সুগার নিয়ন্ত্রণ হয়েছে। হূদেরাগীদের অস্থিরতা ও স্বাস স্ফীত হ্রাস পেয়েছে। রোজার মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয় পাকস্থলীর রোগীরা। রোজা গ্যাস্ট্রিক ও আলসার এবং তজ্জনিত পাকস্থলীর দাহ্যতা ও এর প্রদাহ তাড়াতাড়ি উপশম করে। পাকস্থলী একটি বৃহদাকার পেশিবিশেষ। শরীরের অন্যান্য পেশির মতো এরও বিশ্রামের প্রয়োজন হয়। এক মাস রোজা রাখার ফলে পাকস্থলী ও অন্ত্র বিশ্রাম নেওয়ার সময় পায়, তখনই তা ক্ষতস্থান বা আলসার নিরাময়ে লেগে যায় এবং পূর্বাবস্থা পুনরুদ্ধারে নিয়োজিত হয়।

যারা মনে করেন রোজা রাখলে পেটের শূল-বেদনা বৃদ্ধি পায়, তাদের এ ধারণা সঠিক নয়। কয়েক জন রোজাদারের পেটের রস পরীক্ষা করে দেখা গেছে, যাদের পাকস্থলীতে অ্যাসিড খুব বেশি বা কম, রোজা রাখার ফলে তাদের উভয় দোষই সেরে গেছে। উচ্চরক্তচাপ, ফুসফুসে ক্যানসার ও হূদেরাগ থেকে বাঁচার জন্য ধূমপান ত্যাগ করা একান্ত অপরিহার্য। রোজা ধূমপান থেকে বিরত থাকার একটি সূবর্ণ সুযোগ এনে দেয়। তাছাড়া পূর্ণ এক মাস রোজা রাখার ফলে লিভার, কিডনি, মূত্রথলি প্রভৃতি অঙ্গ বিশ্রাম পায়। এতে অঙ্গগুলো বেশ উপকারিতা লাভ করে। কিডনি ও মূত্রথলির নানা উপসর্গ রোজার ফলে নিরাময় হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

চিকিত্সাবিজ্ঞানী ডা. আলেক্স হেইগ বলেছেন, রোজা থেকে মানুষের মানসিক শক্তিসহ বিশেষ অনুভূতিগুলো উপকৃত হয়। স্মরণশক্তি বৃদ্ধি পায়, মনঃসংযোগ ও যুক্তিশক্তি বর্ধিত হয়। প্রীতি, ভালোবাসা, সহানুভূতি ও আধ্যাত্মিক শক্তির উন্মেষ ঘটে। ঘ্রাণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি প্রভৃতি বেড়ে যায় এবং খাবারে অরুচি দূর হয়।

শারীরিক কতগুলো ব্যাধির উত্স হচ্ছে মানসিক অশান্তি। এই রোগসমূহকে বলা হয় সাইকোসোমেটিক ব্যাধি। মানুষ যদি রোজা রাখে, তবে এসব ব্যাধি উপসর্গ কম হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। জৈবিক চাহিদাকে সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে রোজার প্রতিক্রিয়া অত্যধিক। একবার জনৈক অতিদরিদ্র সাহাবি নবি করিম (স.)-এর কাছে বিবাহ করার জন্য আরজি পেশ করেছিলেন। নবি করিম (স.) তাকে রোজা রাখার জন্য বলেছিলেন। যদি বিবাহ করার সামর্থ্য না থাকে, তাহলে তোমরা রোজা রাখো। জীবন, সমাজজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিহিত রয়েছে কল্যাণ ও উপকারিতা। রোজা তেমনি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি বিধান। স্বাস্থ্য রক্ষার ক্ষেত্রে রোজা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

করোনা ভাইরাস চলাকালীন এবারের রমজান মাসে খাবারের প্রতিটি আইটেমে কালোজিরা ও মধু রাখা চাই। ঝালমুড়ি, ছোলা, পিঁয়াজু, বিরিয়ানি, হালিম এমনকি সেহরির জন্য রান্না করা তরকারিতে কালোজিরা ব্যবহার করা অপরিহার্য। মহাপবিত্র আল কোরআনে পেঁয়াজ, রসুন ও ডালের কথাও বলা হয়েছে, অবশ্যই সেটাও আমরা সব সময় সব রান্নায় ব্যবহার করি। কালোজিরা সম্পর্কে রসুলে পাক (স.) বলেন, মৃত্যু ছাড়া সব রোগের মহৌষধ হলো হাব্বাতুছ ছাওদা, অর্থাত্ কালোজিরা।

লেখক :অতিথি অনুবাদক, মক্কা আল মুকাররামাহ ও সাবেক খতিব, জাতীয় সংসদ জামে মসজিদ