দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অবকাঠামো প্রকল্প পদ্মা সেতুর শেষ স্প্যানটি বসেছিল গত ১০ ডিসেম্বর। এর মাধ্যমে দৃশ্যমান হয় স্বপ্নের পদ্মা সেতু। যুক্ত হয় এপার-ওপার। আর এর ১৪৪ দিন পর গতকাল মঙ্গলবার শেষ হয়েছে পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ প্রকল্পের (পিবিআরএলপি) মাওয়ার প্রান্তে ভায়াডাক্ট-২ এর সেগমেন্টাল গার্ডার বসানোর কাজ। পিয়ার এম-১ ও পিএন-১ এর ওপর বক্স গার্ডারের শেষ স্প্যান বসানোর মাধ্যমে এ কাজ শেষ হয়। এরফলে পদ্মা সেতুর মাওয়া প্রান্তে যুক্ত হলো রেলও।
গতকাল মঙ্গলবার মুন্সীগঞ্জের মাওয়ায় রেল স্টেশন ও ভায়াডাক্ট পরির্দশন করেন রেলপথ মন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন। এছাড়াও তিনি জাজিরা প্রান্তের কাজের অগ্রগতি পরির্দশন করেন। এ সময় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, করোনার মধ্যেও দ্রুত গতিতে কাজ এগিয়ে চলছে। মোট কাজের ৪১ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে। অন্যদিকে ভাঙ্গা থেকে মাওয়া অংশের ৬৬ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। এছাড়া ঢাকা-মাওয়া অংশের অগ্রগতি হয়েছে ৩৬ শতাংশ এবং ভাঙা-যশোর সেকশনের ২৫ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে।
রেলপথ মন্ত্রী বলেন, ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত ১৭২ কিলোমিটার রেলপথ হবে। ২০২৪ সালের জুন মাসে নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার কথা। আর আগামী বছর যখন পদ্মাসেতু চালু হবে সেদিনই সেতুর ওপর দিয়ে মাওয়া প্রান্ত থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত ট্রেন চলবে। কাজের যে অগ্রগতি তাতে আমরা সন্তুষ্ট। তিনি বলেন, মাওয়া, ভাঙ্গা, শিবচর ও জাজিরায় স্টেশন নির্মাণের কাজ চলছে। এর মধ্যে ভাঙ্গায় জংশন স্টেশন হবে এবং রেল লাইনের মাধ্যমে ৪টি গন্তব্যকে সংযুক্ত করবে।
প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লিমিটেডের (সিআরইসি) প্রতিনিধি ওয়্যাং কুন বলেন, সিআরইসিকে অনেক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। পাশাপাশি ছিল করোনা মহামারি ও বন্যার ফলে সৃষ্ট প্রতিকূলতা। তবে ২০২০ সালের ৩০ এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে বক্স গার্ডার নির্মাণ কাজের পূর্ণ বাস্তবায়ন পর্যন্ত সম্পূর্ণ ভায়াডাক্ট নির্মাণে সময় লেগেছে মাত্র দেড়বছর। তিনি আরও বলেন, ভায়াডাক্ট-৩ এর শেষ স্প্যানও কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বসবে। জুন মাসে পিবিআরপিএলর মাওয়া-ভাঙ্গা অংশের ট্র্যাক স্থাপনের পূর্ববর্তী কাজ প্রায় সমাপ্ত হবে এবং ট্র্যাক স্থাপনের কাজ শুরু হবে। যদি এ লক্ষ্য অর্জন করা যায়, তবে আড়াই বছরের মধ্যে একটি নতুন রেল লাইন তৈরি হবে এবং চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হবে।
শেষ স্প্যান বসানোর সময় রেলওয়ের মহাপরিচালক প্রকৌশলী ডি এন মজুমদার, অতিরিক্ত সচিব ও পিবিআরএলপির প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী গোলাম ফখরুদ্দিন এ. চৌধুরী, ইন্টারন্যাশনাল কনসালটেন্ট কনসোর্টিয়ামের চিফ কো-অর্ডিনেটর অফিসার (সিওও) মেজর জেনারেল জাহিদ উপস্থিত ছিলেন।
এগিয়ে চলছে রেল সংযোগ প্রকল্পের কাজ : পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের কাজ দিনরাত চলছে। চলছে নির্মাণযজ্ঞ। দক্ষ শ্রমিকদের হাতের ছোঁয়ায় প্রকল্পের বিশাল অংশ এখন দৃশ্যমান। নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রকল্পের কাজ শেষ করতে সব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তাই করোনা বা প্রখর রোদের মধ্যেও থেমে নেই নির্মাণ কাজ। প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায়, প্রকল্পের স্প্যান, এমব্যাংকমেন্ট, মেজর ব্রিজ, কালভার্ট, আন্ডারপাস, প্রিকাস্ট বক্সগার্ডার, সেগমেন্ট, ভায়াডাক্ট, পিয়ারসহ অন্যান্য নির্মাণ যজ্ঞ চলছে। তিনভাগে শিফটি করে কাজ করছেন শ্রমিকরা।
তিন ভাগে বিভক্ত প্রকল্পের কাজ হচ্ছে- ঢাকা-মাওয়া, মাওয়া-ভাঙা ও ভাঙা-যশোর সেকশন। এরমধ্যে ঢাকা-মাওয়া ও ভাঙা-যশোরের বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০২৩ সাল। আর মাওয়া-ভাঙা সেকশনের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২২ সাল। প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কনস্ট্রাকশন সুপারভিশন কনসালটেন্ট (সিএসসি) কাজ করছে।
প্রকল্পের আওতায় ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত মোট ২১৫ দশমিক ২২ কিলোমিটার রেলওয়ে ট্র্যাক নির্মাণ করা হবে। ২৩ দশমিক ৩৭৭ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট; ১ দশমিক ৯৮ কিলোমিটার র্যাম্পস; ৬৬টি মেজর ব্রিজ; ২৪৪টি মাইনর ব্রিজ, কালভার্ট ও আন্ডারপাস; ১টি হাইওয়ে ওভারপাস ও ২৯টি লেভেল ক্রসিং নির্মাণ করা হবে। এছাড়া ১৪টি নতুন স্টেশন নির্মাণ এবং ৬টি বিদ্যমান স্টেশনের উন্নয়ন, ২০টি স্টেশনে টেলিযোগাযোগসহ সিবিআই সিস্টেম সিগন্যালিং ব্যবস্থা স্থাপন, ১০০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ সংগ্রহ এবং দুই হাজার ৪২৬ একর ভূমি অধিগ্রহণ করা হবে।