‘এমন নির্মোহ শিল্পী আমরা আর পাবো না’

রফিকুল আলম

সুবীর নন্দীর সঙ্গে আমার পরিচয় হয় স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ বেতারে। আমার ‘বৈশাখী মেঘের কাছে জল চেয়ে’ গানের গীতিকার আবুল হায়াত্ মোহাম্মাদ কামাল একদিন আমাকে বললেন, সুবীর নন্দী নামে সিলেটে একজন খুব ভালো গায়ক আছে আপনাদের বয়সের। তার সম্পর্কে এটাই আমার প্রথম ধারণা। এরপর বেতারে ১৯৭৩ সালে একটি ফোক ফেস্ট হয়। সেখানে তিনিও গাইতে এসেছিলেন। পরবর্তীতে একদিন আমি বেতারে একটি গান রেকর্ড করছিলাম।  হটাত্ একজন আমাকে বললেন, আপনার কাছ থেকে আরো ভালো গান আমরা প্রত্যাশা করি।  তখন আমি তাকে জিজ্ঞেস করি আপনি কে? উনি তখন বলেন, আমি সুবীর নন্দী। এটাই ছিল আমাদের প্রথম পরিচয়। এরপর সুবীর যখন ঢাকা চলে এলো তখন বাংলা একাডেমির একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমাদের ঘনিষ্ঠতা বাড়তে শুরু করলো। আরো বেশি আমরা কাছে চলে এলাম মাহমুদুন্নবী ভাইয়ের মাধ্যমে। তিনি নতুন শিল্পীদের নিয়ে বাড়িতে আসর বসাতেন। সেখানে সুবীর আসতো। ধীরে ধীরে আমরা অনেক আপন হয়ে যাই। আর একটা কথা আমার মনে পড়ে, একদিন আমি ছবির একটি গানের রেকর্ডিংয়ে গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখি সুবীর আমার আগেই গিয়ে বসে আছে। তখন অনেক কথা আর আড্ডা হলো দু’জনের। ও বললো আমার কাছে একটি গান আছে যেটা আপনার কণ্ঠে ভালো লাগবে। শুনে আমি অবাক হয়ে গেলাম! যদিও সেই গানটি কখনো রেকর্ড করা হয়নি, তবে অনেক অনুষ্ঠানে গেয়েছি। ও এত বেশি গান শুনতো যে, কোনো শিল্পীকে আমি তার মতো করে গান নিয়ে ভাবতে বা শুনতে দেখিনি। পরবর্তীকালে একসঙ্গে অনেক ছবির গান, অনুষ্ঠান ও দেশ-বিদেশের কনসার্টে অংশ নিয়েছি। প্রথম সুবীরের সঙ্গে দেশের বাইরে কনসার্ট করেছি আবুধাবিতে। সেখানের বিভিন্ন শহরে আমরা দীর্ঘ ১৫ দিন কনসার্ট করেছি। এখন খুব বেশি মনে পড়ে—সুবীর, সামিনা, আবিদা, শাম্মী ও আমি একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে লন্ডন গিয়েছিলাম। গিয়ে তো সুবীরের পরিচিতি আর যোগাযোগ দেখে আমি হতবাক! সিলেটি ছেলে হিসেবে সেখানে ওর অনেক যোগাযোগ ছিল। সুবীর ওর পরিচিতদের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেয়। তাছাড়া কোথায় কী রয়েছে সেটা সুবীরের নখদর্পণে ছিল বলা যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লন্ড গিয়ে অনেকদিন যেখানে ছিলেন সেখানে নিয়ে গেল। এছাড়াও অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিরা কোথায় বসতেন, আড্ডা দিতেন সেই জায়গাগুলো ঘুরে দেখালো। আমি অবাক হয়ে তার সঙ্গে ঘুরলাম।

সুবীর শুধু আমার সহকর্মী বা বন্ধু ছিল না, আমার অনেক বড় সমালোচক ছিল। আমার গানের সুন্দর সমালোচনা করতো। ও গান নিয়ে আমার কাছে অনেক বেশি কিছু প্রত্যাশা করতো। আমাকে নিয়ে সুবীর অনেক গর্ব করতো। অনেক অনুষ্ঠানে সুবীর আমার প্রশংসা করতো। পেশাগত কারণে মানুষের সঙ্গে হয়তো এত বন্ধুত্ব হয় না, যা আমার আর সুবীরের হয়েছিল। সুবীর যখন অসুস্থ হলো তখন আমরা একটি অনুষ্ঠান করেছিলাম তার সাহায্যার্থে। যদিও তখন ডা. বলেছিলেন তার অবস্থা ভালো না। তারপরও লন্ডন গিয়ে চিকিত্সা করিয়ে ভালো হয়ে গিয়েছিল। এটা আমার জন্য অনেক ভালোলাগার। মৃত্যুর কিছুদিন আগেও সুবীর আমাকে দিয়ে বেশ কয়েকটি গান করালো। একজন শিল্পী হয়ে অন্য একজন শিল্পীকে দিয়ে গান করানোর চর্চা কিন্তু এদেশে খুব কম রয়েছে। যেখানে সুবীর ছিল ব্যতিক্রমী উদাহরণ। এমন নির্মোহ শিল্পী আমরা আর পাবো না। সুবীরের মৃত্যুতে আমার সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। আমি ভাই, বন্ধু ও একজন সমালোচক হারিয়েছি।