অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী
পৃথিবীতে মানুষ সব সময় সুখ খুঁজেছে। অধিকাংশ মানুষ এই সুখ খুঁজতে গিয়ে বারবার আঘাত পেয়েছে। আপনজনের প্রিয় মুখগুলোর কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। সেই আঘাত মানুষের বাহিরটাকে একটা মেকআপ পরিয়ে মেকি দুনিয়ার মানুষ বানালেও ভেতরটাকে কুরে কুরে খেয়েছে। কারণ স্বপ্ন আর বাস্তবতা কখনো এক হয় না। ঠিক তেমনি যেভাবে মানুষকে আমরা দেখি, তাদের সুখী মনে করি, সেই দেখাটা আর যে মানুষটাকে দেখছি তার নিজেকে দেখাটা কখনো এক না-ও হতে পারে। জীবন এক সমান্তরাল রেললাইনের মতো, যার ওপর দিয়ে অনেক ওজনের রেলগাড়ি আঘাত করতে করতে তার গন্তব্যে পৌঁছে যায়, কিন্তু রেললাইন দুটোকে কখনো এক বিন্দুতে মিলতে দেয় না। জীবন এক দুঃসহ সুখের খেলা, যে খেলায় বাস্তবতার চেয়ে অভিনয়ের প্রভাব বেশি থাকে। মোগল সাম্রাজ্য ভারতবর্ষে তিন শতাধিক বছর ধরে রাজত্ব করেছিল। সুখকে উপজীব্য করে মোগল পরিবারের জীবনের ভিত্তি গড়ে উঠেছিল। সেই সুখটা জীবনবোধের আনন্দজাগানিয়া সুখ ছিল কি না, সেটা যাচাই করাটা খুব কঠিন। কিন্তু অর্থবিত্ত, প্রভাব-প্রতিপত্তি দিয়ে যদি সুখকে পরিমাপ করা হয়, তবে সেটার অস্তিত্ব ছিল। সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর থেকে ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়া এই বিশাল সাম্রাজ্য শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের পতনের সঙ্গে সঙ্গে নিঃশেষ হয়ে যায়। সব সুখ, সুখের অভিনয়ের সমাপ্তি ঘটে। বিখ্যাত সুফী দার্শনিক ও কবি খাজা হাসান নিজামী ‘বেগমাত কে আঁসু’ বইটিতে মোগল সাম্রাজ্যের পতনের পর সেই পরিবারে একসময়ের সুখী মানুষদের করুণ পরিণতির বিষয়টি উল্লেখ করেন। একসময় যারা সুরম্য অট্টালিকায় চাকরবাকর, খানাপিনা আর ঐশ্বর্যের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছিল। সুখের পাখিটা তাদের হাতছাড়া হতেই সব যেন বদলে যায়। এই পরিবারের কাউকে ঠেলাগাড়ি চালিয়ে জীবন নির্বাহ করতে হয়েছে। কাউকে গবাদিপশুর জন্য ঘাস কেটে নিজের পেটের খাদ্যের সংস্থান করতে হয়েছে। কাউকে দিল্লির রাস্তায় ভিক্ষার থলি হাতে নিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়েছে। এই বংশের শাহাজাদী আর রাজমাতাদের সেবায় যে অসংখ্য ভৃত্য নিয়োজিত ছিল, এই কঠিন দুঃসময়ে তাদের অনেকেই রাজবংশের এই নারীদের অসহায় অবস্থায় ফেলে চলে যায়। ভৃত্যরা পালিয়ে যাওয়ার সময় ঘরের মূল্যবান সম্পদ তাদের সঙ্গে নিয়ে যায়। সুখ এমনই, কখন কাচের স্বর্গ ভেঙে শরীরের কঙ্কালটা বের করে এনে সত্যকে নির্মমভাবে আঘাত করবে, কেউ জানে না। আসলে আমরা যেটাকে সুখ ভাবি, সেটা হয়তো সুখ নয়; যেটাকে সুখ ভাবি না, সেটাই হয়তো সুখ। সুখের একটা অসুখ থাকে, সেটা চোখ দিয়ে দেখা যায় না, অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করতে হয়। তাই এটাও ঠিক সুখ আসলে বাস করে অন্তরে।
বাংলার অন্যতম সেরা অভিনেত্রী ঢাকার সিনেমার ‘মিষ্টি মেয়ে’ কবরী করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তাকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল, এই দীর্ঘ জীবনটা কি আপনি উপভোগ করেছেন? আনন্দ পেয়েছেন? খুব নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে এর উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার একটা দুঃখ রয়ে গেল, জীবনে আমি একজন ভালো বন্ধু পেলাম না, ভালো স্বামী পেলাম না। সন্তানেরা অনেকটা যার যার মতো করে আছে। কিন্তু সঙ্গ দেওয়ার মতো একজন ভালো মানুষ আমি পাইনি, যাকে বলতে পারি, এসো, এক কাপ চা খাই, একটু গল্প করি। এটাই হয়তো মানুষের জীবন। তবে মানুষের চাওয়ার তো শেষ নেই। মনে হয়, যদি আমার একজন বন্ধু থাকত, তাহলে যখন-তখন তার সঙ্গ পেতাম। এই আনন্দটুকু আমি পাইনি। এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আফসোস। আমি দিতে পারি। সারা জীবন অনেক দিয়েছি। কিন্তু নিতে আমার খুবই কষ্ট। কারণ মনে হয় যে নিজে নিতে গেলে আমি ছোট হয়ে যাব। নিতে গেলে মনে হবে, আমি একজন দুর্বল মানুষ হয়ে উঠছি। যে ভালোবাসে, সব সময় সে মনে করে, ভালোবাসাটাই বড় কাজ। সব সময় মানুষকে তো দিয়েই গেলাম। কারো কাছ থেকে কিছু পাইনি।’
এই তো জীবন। যে জীবনে মানুষ ভাবে সে সুখে আছে, কিন্তু সুখ তাকে কখনো ধরা দেয় না। যে মানুষটা সারা জীবন মানুষকে দিয়েই যায়, বিনিময়ে কিছুই পায় না। মানুষটার হাসিমুখটা সবাই দেখে, লোক দেখানো আবেগে আপ্লুত হয়, কিন্তু তার পেছনের একাকিত্ব, কষ্ট আর বোবা কান্নাগুলো কেউ দেখতে পায় না। কারণ মানুষ যে খুব স্বার্থপর হয়। লোভী হয়। আত্মমগ্ন হয়। এত কিছু হয়েও তারা তো নিজেরাও সুখী হতে পারে না। সুখ মরীচিকাই থেকে যায়।
এ ঘটনাটা মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ১১ তলার ১১০৬ নম্বর কেবিনের। হাসপাতালের কেবিনের বাইরের রেলিং থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন একজন করোনা রোগী। তদন্ত করতে এসে পুলিশ একটা সুইসাইড নোট উদ্ধার করল। সেখানে পঞ্চাশোর্ধ্ব একটা লোক তার স্বেচ্ছায় আত্মহননের কথা উল্লেখ করেছেন। হয়তো সংসারের বোঝা টানতে গিয়ে বিয়ে করা হয়ে ওঠেনি তার। অর্থ-বিত্ত-বৈভবের অভাব ছিল না লোকটার। অভাব ছিল আপনজন, বন্ধুবান্ধব ও কাছের মানুষদের নৈকট্যের। তার আত্মীয়স্বজন সবাই যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ছিল। দুই সপ্তাহ আগে তার আপন ভাই করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। দেশে তার খোঁজ নেওয়ার মতো তেমন কেউ ছিল না। সুইসাইড নোটে তিনি নিজের একাকিত্বের যন্ত্রণার কথা উল্লেখ করেছেন। সে কারণেই তিনি আত্মহত্যা করেছেন বলে লিখেছেন। কতটা অসহায় হয়ে লিখেছেন—কোনো স্বজন না এলেও কেউ যেন তার লাশ ঠিকভাবে দাফন করে।
কী অদ্ভুত সুখের পরিহাস। মানুষের ওড়ানো রঙিন ফানুসের মতো। যেখানে মনে হবে সব আছে, কিন্তু কিছুই সঙ্গে নেই। লোকটার মোবাইলে হয়তো আপনজনের মুখ ছিল, তাদের সঙ্গে আবেগ-অনুভূতির অনেক গল্প ছিল, দিনের পর দিন ভালোবাসার ভান ধরা কথোপকথন ছিল। আসলে লোকটার কেউ ছিল না, লোকটা একা ছিল।
ঘটনাটা উত্তরায় রাজউকের অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পে দোলনচাঁপা-১ ভবনের একটি ফ্ল্যাটে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমান ফ্ল্যাটে একাই ছিলেন। অনেক বেলা পর্যন্ত ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ থাকায় বিষয়টি পুলিশকে অবহিত করা হয়। পরে পুলিশ গিয়ে দরজা ভেঙে তারেক শামসুর রেহমানকে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে। বছর দুই আগে অবসরে যান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক। রাজধানীর উত্তরার নিজ ফ্ল্যাটে একাই বসবাস করতেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন পরিবারের অন্য সদস্যরা। অসুস্থতা ও মৃত্যুর সময় তার নিকটজনেরা কেউ তার কাছে ছিল না, ছিলেন তিনি একা। আর হয়তো তার সঙ্গে চলা তার ছায়া।
সাধারণ মানুষ ভাবে, তারা কত সুখী। নাম, যশ, অর্থ, বিত্ত সব আছে তাদের। বস্তুবাদী পৃথিবীর সব আছে তাদের। সেটাতে সুখ নেই। সুখ আছে যেখানে, সেখানটায় তারা খুব অসহায়। জীবনটা বুঝি এমন এক রহস্যের নাম। রবীন্দ্রনাথের ‘মরীচিকা’ প্রেমের কবিতা নয়, এ যেন পাওয়া-না পাওয়ার বিড়ম্বিত জীবনের উপাখ্যান। যেমন কবি বলেছেন, ‘বক্ষ হইতে বাহির হইয়া আপন বাসনা মম ফিরে মরীচিকা সম। বাহু মেলি তারে বক্ষে লইতে বক্ষে ফিরিয়া পাই না। যাহা চাই তাহা ভুল করে চাই, যাহা পাই তাহা চাই না।’
যুক্তরাষ্ট্রের টেকসাসের অ্যালেন শহরে উন্নত জীবনের সন্ধানে পাড়ি জমিয়েছিল বাংলাদেশের একটি পরিবার। পুলিশ বলছে, পরিবারটির দুজন সদস্য, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত দুই ভাই। তারা তাদের বাবা, মা, বোন ও নানিকে হত্যার পর নিজেরা আত্মহত্যা করেছে। এ দুই ভাই বিষণ্নতায় আক্রান্ত ছিল বলে ঘটনার আগে লেখা ফেসবুক নোটে উল্লেখ করেছে। এ ঘটনা প্রমাণ করছে মানুষ নিজে সুখী না হতে পারলে পৃথিবীর কোথাও গিয়ে সুখী হতে পারে না। উন্নত দেশের উন্নত জীবনব্যবস্থায় মানুষের সুখ থাকে না। সেখানে যেটাকে আমরা সুখ বলি, সেটা হয় যান্ত্রিকতা, নয়তো ভোগবাদিতা কিংবা কৃত্রিম মানসিকতা, যার সঙ্গে সুখের কোনো সম্পর্ক নেই।
মানুষকে নিয়ে মানুষের সুখের ভাবনাটা এমনই। সবাই সুখের ক্ষেত্রে সূর্যের আলোর দিকটা দেখে, পেছনের অন্ধকারটা দেখে না। যেমন মানুষ সামনে থেকে জ্বলন্ত প্রদীপের আলো দেখে, পাদপ্রদীপের নিচে অদেখা ছায়াটা দেখে না। সেটা দেখাটা এখন খুব দরকার।
n লেখক :শিক্ষাবিদ, ঢাকা প্রকৌশল ও
প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর