শান্তির অনুপম বার্তাবাহী ঈদুল ফিতর

ঈদ আরবি শব্দ। অর্থ—ফিরে আসা, প্রত্যাবর্তন করা, বারবার আসা। চান্দ্র বত্সরের নির্দিষ্ট তারিখে প্রতি বছরই দুটি উত্সবের দিন ফিরে আসে। ফিতর শব্দের অর্থ—ভেঙে ফেলা, বিদীর্ণ করা। রমজানের চাঁদ দেখে রোজা শুরু এবং শাওয়ালের চাঁদ দেখেই রোজা রাখা ছেড়ে দেওয়া হয়। সে কারণে এটিকে ঈদুল ফিতর তথা রোজা ভাঙার আনন্দ বলা হয়। প্রকৃতপক্ষে এ ঈদ হলো এক মাস সিয়াম সাধনার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্সের সমাপ্তি অনুষ্ঠান। পরবর্তী ১১ মাস সেই প্রশিক্ষণ অনুযায়ী জীবনের বাঁকে বাঁকে চলার এক সফল প্রতিশ্রুতি।

রসুল (স) নিজে ঈদ পালন করেছেন এবং সাহাবিদের ঈদ উদ্যাপন করার জন্য তাগিদ দিয়েছেন। মদিনায় যাওয়ার পর রসুল (স) দেখলেন, লোকজন দুটি দিনকে উদ্যাপন করে খেলাধুলা করছেন। তাদের এ খেলাধুলা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তারা বলে আমরা জাহেলি যুগ থেকে এ দুই দিন খেলাধুলা করতাম। তখন রসুল (স) বলেন, আল্লাহতায়ালা এ দুই দিনের পরিবর্তে তোমাদের এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ দুটি দিন দিয়েছেন। তা হলো ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতর। (আবু দাউদ : ১১৩৪)।

ঈদের আগের রাতটিকে লাইলাতুল জায়জা বা পুরস্কার রজনী বলা হয়। যা  চলতি ভাষায় ‘চাঁদ রাত’ হিসেবে পরিচিত। ঈদের রাত গুরুত্বপূর্ণ।  এই রাত দোয়া কবুলের রাত। ইবাদত বন্দেগির মাধ্যমে প্রভুর সান্নিধ্য পাওয়ার রাত। রোজাদারদের পুরস্কার পাওয়ার রাত। অন্তরাত্মা পবিত্রকরণের রাত। এই রাতে ইবাদতকারীর অন্তর কিয়ামতের দিন মরবে না। হজরত আবু উমামা বাহেলি (রা) বর্ণনা করেন, নবি (স) বলেন, যে ব্যক্তি দুই ঈদের রাতে আল্লাহর কাছে সওয়াব প্রাপ্তির নিয়তে ইবাদত করবে তার হূদয় সেদিনও জীবিত থাকবে যেদিন সব হূদয়ের মৃত্যু ঘটবে। (সুনানে ইবনে মাজাহ)

বিখ্যাত সুফি হজরত খাজা মুঈনুদ্দিন চিশতি (রহ) বলেছেন, ফিতর বা ইফতার মানে ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ করা। ঈদুল ফিতর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, রমজান মাসের রোজার মাধ্যমে কুপ্রবৃত্তিগুলোকে ভেঙে চুরমার করে, নিজের কলবকে আল্লাহর আসন হিসেবে গড়ে তোলার আনন্দ উপভোগ ও উদ্যাপন করা। আমাদের উচিত ঈদের পূর্ণাঙ্গ আনন্দ-খুশি ও কল্যাণ অর্জন করা। ঈদ আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে সহমর্মিতা ও সুসম্পর্ক স্থাপন করাসহ পরিবার-পরিজনের সঙ্গে হূদ্যতা ও ভালোবাসার সম্পর্ক বাড়িয়ে দিতে সহায়তা করে। সবাইকে নিয়ে এক কাতারে চলাই মুমিনের লক্ষ্য। ঈদুল ফিতরের দিন একদল ফেরেশতা দাঁড়িয়ে যান এবং বলতে থাকেন, ‘হে মুসলিম সম্প্রদায়! তোমরা দয়াময় প্রভুর দিকে ছুটে চল। তিনি তোমাদের কল্যাণ দান করবেন। তিনি তোমাদের পুরস্কার দেবেন।  ঈদের দিন রসুল (স) বেশ কয়েকটি কাজ করতেন। যা আমাদের করা উচিত। তা হলো—অন্যদিনের তুলনায় সকালে ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়া, মিসওয়াক ও উত্তমভাবে গোসল করা, শরিয়তসম্মত সাজসজ্জা করা, সামর্থ্য অনুপাতে উত্তম পোশাক পরিধান ও সুগন্ধি ব্যবহার করা, ঈদুল ফিতরে ঈদগাহে যাওয়ার আগে মিষ্টি জাতীয় যেমন খেজুর ইত্যাদি খাওয়া, সকাল সকাল ঈদগাহে যাওয়া, ঈদুল ফিতরে ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে সদকায়ে ফিতর আদায় করা, ঈদের নামাজ ঈদগাহে আদায় করা, বিনা অপারগতায় মসজিদে আদায় না করা, যে রাস্তায় ঈদগাহে যাবে, সম্ভব হলে ফেরার সময় অন্য রাস্তা দিয়ে ফেরা, হেঁটে যাওয়া, ঈদুল ফিতরে ঈদগাহে যাবার সময় আস্তে আস্তে তাকবির আল্লাহু আকবর আল্লাহু আকবর, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবর, ওয়ালিল্লাহিল হামদ পড়তে থাকা।

বর্তমান সময়ে ঈদের নামাজে স্বাস্থ্যবিধি মেনে আদায় করা জরুরি। নিজ জীবনকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া যাবে না। এজন্য মাস্ক পরিধান করে, জায়নামাজ নিয়ে দূরত্ব বজায় রেখে সরকারি নিয়ম মেনে ঈদগাহের পরিবর্তে মসজিদে ঈদের নামাজ পড়তে হবে। আবু দাউদ শরিফে উল্লেখ রয়েছে, হজরত আবু হুরায়রাহ (রা) থেকে বর্ণিত, একবার ঈদের দিনে বৃষ্টি হলো, তখন রসুল (স) তাদের নিয়ে মসজিদে ঈদের নামাজ পড়লেন।  উপরোক্ত হাদিস থেকে বুঝা যায়, বৃষ্টি বা অন্য কোনো যুক্তিসংগত কারণে  ঈদের নামাজ মসজিদে পড়া যায়।

lলেখক :চেয়ারম্যান, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়