রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) চিকিত্সাধীন বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিত্সার জন্য বিদেশে নেওয়ার তোড়জোড় চলছে। নানা প্রস্তুতির পাশাপাশি নতুন পাসপোর্টের জন্যও আবেদন করা হয়েছে। দ্রুততম সময়ে বিদেশে নিতে সরকারের অনুমতি চেয়ে তার ভাই শামীম এস্কান্দারের লিখিত আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক গতকাল বিকালে বলেছেন, ‘শিগিগরই সিদ্ধান্ত জানানো হবে। খালেদা জিয়াকে বিদেশে নেওয়ার আবেদনসংক্রান্ত ফাইলটি আমি পেয়েছি। এখন এ বিষয়ে মতামত দিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেব। তবে সেটা আজ (গতকাল বৃহস্পতিবার) সম্ভব হবে না। সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি আন্তরিকভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।’
এদিকে গতকাল সিসিইউতে চিকিত্সাধীন বেগম জিয়ার অবস্থা অপরিবর্তিত রয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে আবারও তার স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করে চিকিত্সার জন্য গঠিত মেডিক্যাল বোর্ড। বোর্ডের সদস্যরা জানান, বেগম জিয়াকে দ্রুত বিদেশে নেওয়া জরুরি। কারণ এখানে তার আশানুরূপ উন্নতি হচ্ছে না। করোনামুক্ত হলেও করোনা-পরবর্তী অসুস্থতা ব্যাপকভাবে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।
এদিকে পারিবারিক একটি সূত্র জানায়, খালেদা জিয়াকে বিদেশে নেওয়ার বিষয়ে প্রস্তুতি নিতে সরকারের কাছ থেকে মৌখিকভাবে অনুমতি পাওয়া গেছে, যা দ্রুত লিখিত আকারে পাওয়া যাবে। ইতিমধ্যে তাকে বিদেশে নেওয়ার সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। সিঙ্গাপুর হয়ে যুক্তরাজ্যে নিয়ে যাওয়া হতে পারে তাকে। বেগম জিয়াকে নেওয়ার জন্য তার পরিবার চার্টার্ড ফ্লাইট ও এয়ার অ্যাম্বুলেন্স দুটোরই প্রস্তুতি নিয়েছে। স্বরাষ্ট্রসচিব জানিয়েছেন, কোন দেশে চিকিত্সার জন্য যাবেন বেগম জিয়ার পরিবার তা উল্লেখ করেননি আবেদনপত্রে।
দলের দায়িত্বশীল একজন নেতা বলেন, খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিত্সার জন্য উপযুক্ত স্থান হলো লন্ডন। সেখানে তার ছেলেসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা রয়েছেন। তবে করোনা মহামারির দ্বিতীয় ওয়েভের কারণে এই মুহূর্তে লন্ডনের পরিস্থিতি একটু ভিন্ন। চিকিত্সার জন্য সেখানে খালেদা জিয়াকে নিতে হলে দেশটির স্বাস্থ্য বিভাগের অনুমতি নিতে হবে। এছাড়া তার ভ্রমণসংক্রান্ত বিষয়েও কিছু প্রক্রিয়া এখনো বাকি। ফলে সরকারিভাবে অনুমতি পাওয়ার পরই এ কাজগুলো সম্পন্ন হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ফরেন রিলেশন্স কমিটির অন্যতম সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘আমাদের প্রস্তুতিতে ঘাটতি নেই। সরকার অনুমতি দিলে সব কার্যক্রম আমরা শুরু করতে পারব। তবে সবকিছু নির্ভর করছে সরকারের অনুমতির ওপর।
নতুন পাসপোর্টের জন্য আবেদন :খালেদা জিয়ার মেশিন রিডেবল পাসপোর্টের (এমআরপি) জন্য আবেদন করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী পাসপোর্টের জন্য ফিঙ্গার প্রিন্ট ও আবেদনকারীর স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক হলেও খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে সেই শর্ত শিথিল করা হয়েছে। জানা গেছে, দ্রুততম সময়ের মধ্যেই সেটি দেওয়া হবে। ২০১৯ সালে পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে যায় সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, খালেদা জিয়ার পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। তার পক্ষে আবেদন করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী তিনি দ্রুততম সময়ে পাসপোর্ট পাবেন।
খালেদা জিয়ার করোনা নেগেটিভ :বেগম খালেদা জিয়া করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ২৫ দিন পর গতকাল রিপোর্টে নেগেটিভ এসেছে। এর আগে তিন দফা করোনা পরীক্ষার ফল পজিটিভ ছিল। চতুর্থবার করোনা পরীক্ষা করে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে রিপোর্ট নেগেটিভ আসে। খালেদা জিয়ার আইনজীবী ও বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব মাহবুব উদ্দিন খোকন গতকাল বলেন, করোনা নেগেটিভ এলেও তিনি পোস্ট কোভিড সমস্যায় ভুগছেন। তার উন্নত চিকিত্সা দরকার এটাই বড় বিষয়।
মানবিক বিবেচনায় বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দিন :ফখরুল
খালেদা জিয়ার কোভিড-১৯ সংক্রমণ-পরবর্তী নানা জটিলতায় আক্রান্ত বেগম জিয়াকে মানবিক বিবেচনায় উন্নত চিকিত্সার জন্য বিদেশে নেওয়ার অনুমতি দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল বৃহস্পতিবার এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আপনারা জানেন যে, তার পরিবার থেকে বিদেশে উন্নত চিকিত্সার জন্য যে অনুমতি দরকার, সেই অনুমতি চাওয়া হয়েছে। আমরা আশা করি, সরকার মানবিক কারণে তার বিদেশে চিকিত্সার ব্যবস্থা করবেন।
খালেদা জিয়ার বিষয়ে দ্রুত মতামত দেওয়া হবে : আইনমন্ত্রী
গতকাল আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিত্সা নেওয়ার বিষয়ে তিনি আগামী রবিবার মতামত দিতে পারেন। তিনি বলেন, দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত খালেদা জিয়াকে চিকিত্সার জন্য বিদেশে নিতে পরিবারের আবেদন পর্যালোচনার পর দ্রুত সময়ে মতামত দিয়ে ফাইল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার গুলশানে নিজের ব্যক্তিগত কার্যালয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সাংবাদিকদের বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারায় বেগম খালেদা জিয়ার সাজা ও দণ্ডাদেশ স্থগিত করা হয়েছিল। এখানে দুটি নির্দিষ্ট শর্ত দেওয়া ছিল। শর্তগুলো মেনে তারা স্থগিতাদেশ গ্রহণ করেছিলেন এবং খালেদা জিয়াকে মুক্ত করেছিলেন। সেই শর্তে বলা হয়েছিল, মুক্ত থাকার সময়ে খালেদা জিয়াকে ঢাকায় নিজের বাসায় থেকে চিকিত্সা নিতে হবে এবং তিনি বিদেশে যেতে পারবেন না। যেহেতু এখানে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারা সম্পাদন হয়ে গেছে, এরপর এটাকে আবার ওপেন করার স্কোপ আছে কি না; সেটা দেখে আমাদের অভিমত যথা শিগগির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিব।
এদিকে বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে চিকিত্সার জন্য বিদেশে নিতে চাইছে তার পরিবার ও দল। কিন্তু যে আদেশ বলে তিনি জেল থেকে বের হয়েছিলেন সে অনুযায়ী তার বিদেশে যাওয়ার সুযোগই নেই। কিন্তু আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলছেন, সরকার সেই শর্তটি শিথিল করলে খালেদা জিয়ার বিদেশে যেতে আইনগত কোনো বাধা থাকে না। এটা নির্ভর করছে একেবারেই সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়াটি কী হবে :খালেদা জিয়াকে অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি কী হবে?—এ সম্পর্কে আইন সচিব মো. গোলাম সারওয়ার বলেন, আমরা মতামত দিলে সেটা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সামারি হয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাবে। মন্ত্রী মহোদয় (আইনমন্ত্রী) সিদ্ধান্ত দিলে, তখন বাকিটা হবে। ঐ আবেদনে খালেদা জিয়াকে কোন দেশে নিতে চাওয়া হয়েছে জানতে চাইলে সচিব বলেন, না, উনারা কোনো দেশ উল্লেখ করেননি। শুধু চিকিত্সার জন্য বিদেশে যাওয়ার কথা বলেছেন। আর কিছু বলেননি।
এদিকে খালেদা জিয়ার আশু রোগমুক্তি কামনায় আজ শুক্রবার জুমার পর সারা দেশে মসজিদে দোয়া মাহফিলের কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সারা দেশে করোনা ভাইরাসে মারা যাওয়া বিএনপি নেতাকর্মীদের পরিবারকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে ঈদ উপহার দিতে গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে তিনি এ ঘোষণা দেন। বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্সের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানও বক্তব্য দেন।
প্রসঙ্গত, গত ১০ এপ্রিল বেগম খালেদা জিয়ার করোনা শনাক্ত হয়। ২৮ এপ্রিল হাসপাতালে ভর্তির আগ পর্যন্ত তাকে বাড়িতে চিকিত্সা দেওয়া হচ্ছিল। শ্বাসকষ্টের কারণে গত সোমবার তাকে সিসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। হূদরোগ বিশেষজ্ঞ শাহাবুদ্দিন তালুকদারের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন তিনি।