মাধব রায়
কথাসাহিত্যিক, সহকারী অধ্যাপক (পদার্থবিজ্ঞান)
ব্লু বার্ড হাইস্কুল এন্ড কলেজ, সিলেট
এর মধ্যে নীলকান্তবাবু একদিন অফিস থেকে ফিরার পর কমলা বললেন-মনটা খুব খারাপ হয়ে আছে। চিনের উহান প্রদেশে করোনা নামক এক ভাইরাস মহামারী সৃষ্টি করেছে। হাজার হাজার লোক এই ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে এবং অনেক লোক মৃত্যুবরণ করছে। টিভির খবরে বলেছে।
বলো কী! নীলকান্তবাবু চমকে উঠলেন। তাহলে তো সমস্যা। এই রোগের লক্ষণ কী?
লক্ষণ খুবই সাধারণ। জ্বর-সর্দি-কাশি। বেশি আক্রান্ত হলে শ্বাসকষ্ট শুরু হয় এবং আক্রান্ত ব্যক্তি মারা যায়।
এর কোনও ঔষধ নেই?
এখনও এর ঔষধ আবিষ্কার করতে পারেনি। অবস্থা বুঝে ঔষধ দেয়া হয়। সর্দি-জ্বরের ঔষধ প্যারাসিটামল বা হিসটাসিন। কিন্তু এতে করে রোগটিকে থামানো যাচ্ছে না। চিনের অনেক মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। লকডাউন দেয়া হয়েছে সেখানে। এখন চিন থেকে সারাবিশ্বে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশংকা দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশেও যদি আসে?
সেটাই তো চিন্তা।
এত চিন্তা করে লাভ নেই, সতর্ক থাকতে হবে।
হ্যাঁ, সেটাই। বাংলাদেশে এখনও আসেনি। না এলেই ভালো।
ইতোমধ্যে বিন্দু এসে দাঁড়িয়েছে বাবার পাশে। কে না এলেই ভালো বাবা?
একটা ভাইরাস, নোভেল করোনা। বললেন নীলকান্তবাবু।
বিন্দু বুঝতে পারছে না বিষয়টা, চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল। এর মধ্যে আকাশ, রেখা, চন্দ্রা, অণু, সীমা এসে দাঁড়িয়েছে। বাবার সান্নিধ্য এদের কাছে মধুর মতো। শুধু বাবা কেন মামার সান্নিধ্যও চন্দ্রা-আকাশের প্রিয়।
কমলা বললেন-বাচ্চাদের নিয়ে বসবে, আগে ফ্রেশ হয়ে নাও ।
ফ্রেশ হবার পর সবাই গোল হয়ে বসল। কমলা একটা বড় বাটিতে অনেকগুলো কাঁঠাল বীচি ভাজা এনে দিলেন।
কিসের গল্প?
গ্যালিলিওর গল্প শুনব, বলল কণিকা। গতকালের দোলকের গল্প গ্যালিলিওর আবিষ্কার জেনে তাঁর সম্পর্কে জানতে আগ্রহ কণিকার। নীলকান্তবাবু শুরু করলেন- ১৫৬৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি গ্যালিলিওর জন্ম হয় ইতালির উত্তর পশ্চিমে পিসা শহরে। বাবা
ভিনসেনজিও এবং মা গিওলিয়া সন্তানের নাম রাখলেন গ্যালিলিও ডি ভিনসেনজিও বোনাইওতি ডি গ্যালিলি। গ্যালিলিও গ্যালিলি নামে সারা বিশ্ব তাঁকে মনে রেখেছে। গ্যালিলিও সাত ভাইবোনের মধ্যে সবার বড়। ১৫৭৫ সালে জন্ম নেয়া এক ভাই বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী মাইক্যাল অ্যাঞ্জেলা। পিতা ভিনসেনজিও ব্যবসায়ী ছিলেন কিন্তু শিল্প-সাহিত্য-সঙ্গীতের প্রতি অনুরাগ ছিল। এগার বত্সর পর্যন্ত বাবার কাছেই পড়ালেখা শেখেন গ্যালিলিও। একজন গৃহশিক্ষকও ছিল অবশ্য। ছোটবেলা থেকেই গ্যালিলিও কাব্যচর্চা, চিত্রশিল্প এবং বাদ্যযন্ত্রের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দে গ্যালিলিওকে ক্যামাভোলেস নামক এক মঠে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার জন্য পাঠানো হয়। সেটি ছিল ৩৫ কিলোমিটার পূর্বে ভ্যালোমব্রাসো নামক স্থানে। কিন্তু বাবা আশ্চর্য হয়ে দেখলেন, ছেলে পড়াশুনার দিকে খেয়াল না দিয়ে সন্ন্যাসী হবার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।
সন্ন্যাসী! কমলা অবাক হয়ে বললেন।
হ্যাঁ, বাবা তো খুব ভয় পেয়ে গেলেন। মঠ থেকে আনবার বুদ্ধি বের করতে থাকলেন। এর মধ্যে গ্যালিলিওর চোখে সমস্যা দেখা দিলো। ডাক্তার দেখানোর কথা বলে সেই যে নিয়ে এলেন, আর পাঠালেন না।
ভালো করেছেন, বলল সীমা। কোথায় বিজ্ঞানী হবেন, আর কোথায় সন্ন্যাসী!
এরপর পিতা ভিনসেনজিও পুত্রকে পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাক্তারি পড়ানোর জন্য ভর্তি করে দেন ১৫৮১ সালে। পড়াশুনার খরচ কমানোর জন্য মায়ের এক আত্মীয় মুজিও তেদালদির বাসায় থাকার ব্যবস্থা করা হলো। কিন্তু মেডিক্যালের পড়া তো গ্যালিলিওর ভালো লাগে না।
কেন? বলল বিন্দু।
ভালো লাগে না, কারণ ক্লাসে শিক্ষকদের কথাকে অন্যান্য শিক্ষার্থীদের মতো ধ্রুব সত্য বলে মানতে পারেন না তিনি। নানান রকম প্রশ্ন করে করে শিক্ষকদের ব্যতিব্যস্ত করে তুলতেন। শেষ পর্যন্ত নিজের ঘরে ছোট একটি পরীক্ষাগার গড়ে তুললেন তিনি।
১৯ বছর বয়সে এসে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। ১৫৮৩ সালে, তিনি একদিন বাবার বন্ধু অস্তিলিও রিক্কির সাথে দেখা করতে তাঁর বাড়িতে গেলেন। রিক্কি হলেন ফ্লোরেন্সের রাজধানী টাসকানির গ্র্যান্ড ডিউকএর রাজ গণিতজ্ঞ, পণ্ডিত। তিনি ছাত্রদের ইউক্লিড এর জ্যামিতি পড়াচ্ছিলেন। বাইরে থেকে রিক্কির জ্যামিতি বোঝানো এবং দক্ষতা দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলেন গ্যালিলিও। আকৃষ্ট হলেন জ্যামিতির প্রতি। ডাক্তারি বইয়ের মধ্যে লুকিয়ে রেখে ইউক্লিড এর জ্যামিতি পড়তে লাগলেন। আর জ্যামিতির সচিত্র মারপ্যাচ আয়ত্ত করার দক্ষতা দেখে রিক্কিও তো অবাক। গ্যালিলিও সিদ্ধান্ত নিলেন ডাক্তারি পড়া ছেড়ে দিয়ে গণিত পড়বেন। বাবার কাছে গেলেন অনুমতির জন্য।
এদিকে কাঁঠাল বীচি ভাজা খাওয়া চলছে। কমলাও খাচ্ছেন। তিনি বললেন-বাবা মা অনুমতি দিলেন?
না না, তুমি কী বলো! নীলকান্তবাবু আম বললেন। বাবা মা ছেলেকে ডাক্তারি ছেড়ে গণিত পড়তে অনুমতি দেবেন! যেখানে ডাক্তারি পড়া শেষ হলে আয় রোজগারের আর কোনও চিন্তাই নেই। তাঁরা বললেন-পাগলামি পেয়েছিস। পরের অংশ আগামীকাল