অর্থনীতি সচল রাখতে গ্রামবান্ধব উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে

রেজাউল করিম খোকন

করোনা ভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ে ফের অর্থনীতিতে দুশ্চিন্তা শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছেন। সাধারণ পরিবারগুলোতে ঋণ বেড়ে যাচ্ছে। গত বছরের সাধারণ ছুটির সময়ে গ্রামীণ কুটির, অতিক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র শিল্পগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পণ্য উত্পাদন প্রক্রিয়া যেমন বাধাগ্রস্ত হয়েছে, তেমনি উত্পাদিত পণ্য বিক্রিও করা যায়নি। ফলে টাকার প্রবাহ কমে গেছে। করোনার প্রভাব মোকাবিলায় প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হলেও গ্রামীণ অপ্রাতিষ্ঠানিক কুটির ও ক্ষুদ্র শিল্পগুলো চলতি মূলধনের জোগান পায়নি। কিছু প্রতিষ্ঠান পেলেও তা পর্যাপ্ত নয়। এছাড়া গ্রামীণ হাটবাজারের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও চাহিদা অনুযায়ী ঋণের জোগান পায়নি। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের কৃষি খাত। প্রণোদনার অর্থও ঠিকমতো বিতরণ করা হচ্ছে না কৃষি খাতে। করোনা ভাইরাসের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষি খাতে সহায়তার জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। শতভাগ ঋণ বিতরণের সময়সীমা কয়েক দফা বাড়িয়ে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের পর তিন মাস অতিবাহিত হলেও কৃষি খাতে ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি ব্যাংকগুলো। সর্বশেষ হিসাব মতে, গত ১৫ মার্চ পর্যন্ত কৃষকদের মধ্যে প্রণোদনার ঋণ বিতরণ করা হয়েছে মোট লক্ষ্যমাত্রার ৭২ শতাংশ। এমনি পরিস্থিতিতে ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য আরো তিন মাস সময় বৃদ্ধি করে ৩০ জুন পর্যন্ত পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। এদিকে, ২০২০ সাল থেকে বিশ্বের অন্য দেশের মতো বাংলাদেশেও করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় দেশের স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিঘ্নিত হচ্ছে। এর ফলে অন্য খাতের মতো কৃষি খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে, কৃষি খাতে স্বল্প সুদে ঋণ সরবরাহ নিশ্চিত করে কৃষকদের স্বাভাবিক উত্পাদনশীল কার্যক্রম ফিরিয়ে আনাসহ কৃষি উত্পাদন বৃদ্ধির জন্য আলোচ্য খাতে ঋণের সুদহার কমানো প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, গ্রামের অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে গত অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে ঋণ প্রবাহ বেড়েছিল ৮ দশমিক ১০ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে বাড়েনি বরং কমেছে ২ দশমিক ১৬ শতাংশ। করোনার প্রকোপে ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তারা ঋণ নিতে পারছেন না বলে এ খাতে বিতরণ বাড়েনি। গত অর্থবছরের একই সময়ে ঋণ আদায় বেড়েছিল ৬ দশমিক ২১ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে বেড়েছে ১ দশমিক ৯১ শতাংশ।

করোনার ধাক্কা সামলাতে শহুরে অনেক পরিবার গ্রামে গিয়ে স্থায়ী হওয়ার চেষ্টা করছেন। কাজ হারানো মানুষদের অনেকেই কৃষি কাজের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে হোটেল, রেস্তোরাঁ, পর্যটনসহ নানা সেবা খাত দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় এই খাতের বেকাররা গ্রামে গিয়ে সকর্মসংস্থান তৈরির চেষ্টা করছেন। বিভিন্ন গবেষণায়ও দেখা গেছে, কৃষিকাজে শ্রমিকের চাপ বাড়ছে। ফলে শ্রমের মজুরিতে এর একটি বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে। তাছাড়া কর্মহীন মানুষ গ্রামে স্থায়ী হলে গ্রামীণ আর্থ-সামাজিক অবস্থার ওপরও এর প্রভাব পড়বে। এজন্য গ্রামকেন্দ্রিক অর্থনীতি সাজাতে হবে। বিশেষ করে শহুরে সুবিধা যেমন—ব্যাংক, বিমা, পরিবহন, উন্নত স্কুল, দ্রুতগতির ইন্টারনেট ইত্যাদি সেবা যদি পৌঁছে দেওয়া যায় তাহলে কর্মসংস্থানে নতুন গতি পাবে। শহরে কর্মহীনদের চাপও কমবে।

প্রায়শই গণমাধ্যমে দেখা যায়, উচ্চশিক্ষিত অনেকেই নতুন নতুন বিদেশি ফল বা শস্য চাষ করে সফলতা পেয়েছেন। তরুণ উদ্যোক্তাদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে আধুনিক চাষাবাদে উত্সাহিত করতে হবে। গবাদি পশু পালনেও উদ্বুদ্ধ করতে হবে। নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। উত্পাদিত পণ্য বাজারজাত করতে আধুনিক উপায়, অনলাইন মার্কেটিং এসব প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছে দিতে হবে। এভাবে সার্বিক অর্থনীতিতে চাহিদা তৈরি হবে এবং অর্থনীতির চাকা ঘুরবে।