উত্সবের অর্থনীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে হবে

এম এ মাসুম

অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে চলাচলে কড়াকড়ি কিছুটা শিথিল করেছে সরকার। কিন্তু তাতেও খুব একটা সুবিধা হচ্ছে না। ঈদ ঘিরে প্রতি বছর দেশে লক্ষ কোটি টাকার ব্যবসা হয়ে থাকে। এবার সেই বিশাল অঙ্কে ভাটা পড়বে। গত বছর ব্যবসায়ীরা ঈদে ব্যবসা করতে না পারায় এবার সে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু এবারও ক্ষতির মুখেই পড়তে হচ্ছে। করোনা পরিস্থিতিতে বর্তমান ঈদবাজারের অবস্থা অন্য বারের মতো নয়। সীমিত পরিসরে দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হলেও জমেনি ঈদবাজার। বেচাবিক্রি না থাকায় হতাশ বিক্রেতারা। সাধারণ মানুষের হাতে নগদ অর্থ না থাকলে উত্সবের অর্থনীতি জমে উঠে না। তাই ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে হবে। অনেকেই বলছেন, এবারের ঈদ হবে আমাদের অর্থনীতির জন্য নিরাশার। এ বছর ঈদে লাখ লাখ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শ্রমিক, উদ্যোক্তা, যারা ঈদকেন্দ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত, তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। যদিও সরকার স্বাস্থ্যবিধি মেনে দোকান খোলার অনুমতি দিয়েছে, কিন্তু বিক্রি হচ্ছে খুবই সীমিত পর্যায়ে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদ ঘিরে ইতিমধ্যে যে বিনিয়োগ হয়েছে তাও উঠে আসবে না। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিপণি বিতানগুলো। ঈদকেন্দ্রিক প্রতি বছর গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা হতে দেখা যায়। কিন্তু এবার গ্রামীণ অর্থনীতিতেও হতাশা কাটছে না। এ বছর ঈদকেন্দ্রিক ব্যবসা বা অর্থনীতির ক্ষতি কী পরিমাণ হবে সেটা এ মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। তবে ব্যবসায়ীরা বলেন, তাদের সারা বছরের অর্ধেক ব্যবসাই হয়ে থাকে এই ঈদে। সেটা এ বছর হবে না। অর্থনীতিতে ক্ষতি হলে গ্রাম ও শহর সবখানেই তার প্রভাব পড়ে। শহরের ব্যবসায়ী, শ্রমিকরা আমদানি-রপ্তানির সঙ্গে জড়িত, গ্রামের ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তারা কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প, হস্ত ও কুটির শিল্পের সঙ্গে জড়িত, ফলে ক্ষতিটা সবারই হবে। বাজার ব্যবস্থাপনায় একটি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে পুরো সরবরাহ চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে শুধু দোকানপাট খোলা রাখলেও সরবরাহ ব্যবস্থা বন্ধ থাকায় এর প্রভাব পুরো খাতেই পড়েছে।

তবে আশার দিক হলো করোনা ভাইরাস মহামারির মধ্যেও ঈদ সামনে রেখে প্রবাসীদের টাকা পাঠানোর প্রবণতা বেড়েছে। সদ্যসমাপ্ত এপ্রিল মাসে প্রবাসী বাংলাদেশিরা ২০৬ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ১৭ হাজার ৫৬৯ কোটি টাকা। যা আগের বছরের একই মাসের চেয়ে প্রায় ৯০ শতাংশ বেশি। গ্রামীণ অর্থনীতিতে চাহিদা তৈরি করতে রেমিট্যান্স বড় ভূমিকা রাখে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রেমিট্যান্স ছাড়াও অন্য বছর ঈদ উপলক্ষ্যে অর্থের বড় একটা জোগান আসত চাকরিজীবীদের বোনাস, গতিশীল অভ্যন্তরীণ বাজার, জাকাত ও ফিতরা থেকে। যা চাঙা করত গ্রামীণ অর্থনীতি। বাজার চাহিদা তৈরি করত। তবে করোনার ধাক্কায় বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানে বোনাস দেওয়া নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন। বেতন বকেয়া রেখেছে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান। অনেকের বেতন-বোনাস হলেও অনেকে কেনাকাটা করতে পারেননি। আর নিম্ন মধ্যবিত্ত সাধারণ মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় টাকা না থাকায় নিত্য দরকারি খাদ্যপণ্য জোগাড়েই ব্যতিব্যস্ত দেখা যাচ্ছে। ফলে অর্থের যে চক্রাকার প্রবাহ সেটি ঠিক রাখা যাচ্ছে না। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এখন সাধারণ মানুষের হাতে নগদ অর্থ পৌঁছে দিতে হবে। গত বছর করোনার প্রকোপ শুরুর পর থেকে সারা বিশ্বের দেশগুলো সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ঠিক রাখতে নানা উদ্যোগ নিতে দেখা যায়। মানুষের হাতে নগদ অর্থ দিয়ে সরকার চেষ্টা করেছে অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে। এর ফলও পাওয়া গেছে। অর্থনীতিতে সাময়িক মন্দা দেখা গেলেও খুব দ্রুতই ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করছে তারা। এজন্য ক্রয়ক্ষমতা ঠিক রাখতে পারলে অর্থনীতির চাকা সচল রাখা সম্ভব হবে।