করোনা ভাইরাসের বিশ্বভ্রমণ এবং আমাদের করণীয়

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী করোনা ভাইরাস পরিবারের পূর্বসূরিরা নিজেদের চিনিয়েছিল ২০০২-২০০৩ সালে (SARS করোনা ভাইরাস) এবং ২০১৫ সালে (MERS করোনা ভাইরাস), যাদের সংক্রমণে সে সময়ে যথাক্রমে ৭৭৮ এবং ৮৬৬-সংখ্যক মানুষকে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করতে হয়েছিল। পরিবারের ছোট সন্তানেরা যেমন খুব চঞ্চল হয়, অনেক সময় বাবা-মার অবাধ্য হয়ে যায়, ঠিক তেমনি পরিবারের অন্যান্য সদস্যের চেয়ে অনেক কনিষ্ঠ এবং নবীন করোনা ভাইরাস তার প্রাকৃতিক আবাস্থল ছেড়ে পৃথিবী ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ল। করোনার অবাধ্যতায় পৃথিবীর ৩২ লাখের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে গত মাত্র ১৫ মাসে। করোনা যখন চীন দেশ ভ্রমণে ব্যস্ত, বিশ্ববাসী তখন ব্যস্ত ছিল নিজেদেরকে নিয়েই। সেখান থেকে করোনা ইউরোপ ভ্রমণে গেল। ইতালি নামক দেশটি মানবসভ্যতার শুরু থেকেই কেন জানি অনেক মহামারির মুখোমুখি হয়েছে। এবারও এর ব্যতিক্রম ঘটল না। দর্শনীয় স্থানসংবলিত, মানবসভ্যতার অনেক ইতিহাসের সাক্ষী ইতালিতে ২০২০ সালের এপ্রিল মাসে যখন করোনার ধ্বংসযজ্ঞ চলছিল তখন পার্শ্ববর্তী দেশগুলো ব্যস্ত ছিল নিজেদের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড নিয়ে। কোনো দিন ভাবতেও পারেনি প্রতিবেশীর কাছে আরেক প্রতিবেশী যে কোনো সময় বেড়াতে যেতে পারে। একবার সেনজেন ভিসা পেলে যেমন ইউরোপের ২৬টি দেশ ভ্রমণ করা যায় ঠিক তেমনি করোনা ভাইরাসটি ইউরোপ প্রদক্ষিণ শুরু করে। স্পেন, ফ্রান্স, জার্মানি, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডসহ শিক্ষা ও গবেষণাক্ষেত্রে, অর্থনৈতিকভাবে, রাজনৈতিকভাবে, সাংস্কৃতিকভাবে উন্নত দেশগুলোতে ভ্রমণ করতে থাকে এবং তার জীবনধারণের জন্য মানুষকে ধারক এবং বাহক হিসেবে নিয়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে থাকে। এরই মধ্যে পৃথিবীর অন্যতম নির্বোধ রাজনৈতিক ব্যক্তি ডোনাল্ড ট্রাম্প ভাইরাসটিকে ‘চাইনিজ ভাইরাস’ আখ্যা দিয়ে বললেন ইউরোপ ভ্রমণে থাকা ভাইরাসটি আমেরিকাবাসীদের কিছুই করতে পারবে না। এই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে যাওয়া ইংল্যান্ডের মানুষও ব্যস্ত ছিল পার্টি, খেলা, কনসার্ট, ঘোরাঘুরি নিয়ে। প্রতিবেশীদের দিকে তাকানোর সময়ই ছিল না। এমন সময় আমেরিকা ভ্রমণ শুরু হয় করোনা ভাইরাসের। নিউ ইয়র্কে যখন ধ্বংসযজ্ঞ চলছিল, অন্যান্য অঙ্গরাজ্যের মানুষগুলো মনে করেছিল এত বড় শহরে ঘুরতে থাকা ভাইরাসটি ক্লান্ত হয়ে অন্য রাজ্য বা শহর ভ্রমণ করার ইচ্ছা হারিয়ে ফেলবে। কিন্তু কে জানত এক শহর থেকে আরেক শহরে ভ্রমণের ফলে ভাইরাসটির প্রাণচাঞ্চল্য আরো বৃদ্ধি পাবে। ফলে নতুন উদ্যমে অনেক রাজ্য প্রদক্ষিণ শেষে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার রেকর্ডটিও আমেরিকাকে উপহার দিয়েছে। এমন সময় যুক্তরাজ্যেও ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে থাকে। কোনো দেশে বা শহরে ভ্রমণে গেলে সাধারণত বয়স্ক মানুষদের বেশি দেখা যায় অলস সময় কাটাতে। এই সুযোগে আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে ভ্রমণরত করোনা ভাইরাসটিও প্রথম দফায় বয়স্কদের সঙ্গে সাক্ষাত্ করতে থাকে। কিন্তু তখনো আমেরিকার পার্শ্ববর্তী দেশ মেক্সিকো ও ব্রাজিলের সমুদ্রসৈকত ছিল মানুষের পদচারণায় মুখর। ভ্রমণে ব্যস্ত মানুষের এই দেশগুলোতে ভাইরাসটি দ্রুত ছড়াতে থাকে এবং তার পোশাক পরিবর্তন করে নতুন রূপ ধারণ করে (মিউটেশন)। ইউকে ভ্যারিয়েন্ট, ব্রাজিলিয়ান ভ্যারিয়েন্ট, সাউথ আফ্রিকান ভ্যারিয়েন্টসহ নতুন ছদ্মনাম গ্রহণ করেছে। তবে আমরা তাকে যেই নামেই ডাকি না কেন, তার ধ্বংসযজ্ঞ বেড়েছে বই কমেনি এতটুকুও। কিন্তু তার পরও পৃথিবীর মানুষের বোধোদয় হয়নি। আমরা সবাই মনে করেছি করোনা আমাদের কিছুই করতে পারবে না। এই অঞ্চলের অনেক অনেক মানুষের ধারণা, করোনা ভাইরাস ধনীদের আক্রমণ করে। ২০২০ সালের শেষ দিক থেকে আমরা আত্মতুষ্টিতে ভুগতে শুরু করলাম, বলতে শুরু করলাম করোনা জয়ের কথা।

বলা হয়, ভারত উপমহাদেশ প্রদক্ষিণ করলে নাকি পৃথিবীর অর্ধেক ভ্রমণ করা হয়ে যায়। এই কথাটি মাথায় রেখেই করোনা ভাইরাস দ্বিতীয় দফার সুযোগে ভালোমতোই ভারতবর্ষের রাজধানী দিল্লি থেকে শুরু করে অনেক রাজ্য আর শহরে খুব দ্রুত গতিতে ভ্রমণ করে বেড়াচ্ছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী পশ্চিমবঙ্গ ভ্রমণেও ব্যস্ত করোনা ভাইরাস। এই দফায় পোশাক পরিবর্তন করে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট নামে দ্রুতগতিতে নিজেকে বিস্তৃত করে চলেছে। সিমেট্রি, শ্মশান থেকে শুরু করে কবরস্থান পর্যন্ত স্থান সংকুলান দিন দিন সীমিত হয়ে আসছে। মুসলিম বা অমুসলিম, ধনী বা গরিব, শিক্ষিত বা অশিক্ষিত যে-ই হোক না কেন, এটা যাত্রাপথে সবার সঙ্গেই দেখা করছে। আসলে আমরাই এই সুযোগটা করে দিচ্ছি বারবার। আমাদের দেশেও করোনা ভাইরাসের ভালোমতো ঘুরে দেখা শেষ হয়নি। আসলেই অনেক কঠিন সময় অপেক্ষা করছে সামনের দিনগুলো। সত্যি যদি এটা বায়ুবাহিত হয়, তাহলে বর্তমান শুষ্ক এবং পরে বর্ষা মৌসুমের পরে আরো বোঝা যাবে এই ভাইরাস বিস্তারের গতিবিধি। বিগত এক বছরের অভিজ্ঞতা এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে করোনার ভ্রমণের ধারা দেখে মনে হচ্ছে, তৃতীয় দফায় করোনা আমাদের মাঝে আসার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। তবে নির্ভর করছে আমাদের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের ওপর। আর যদি এই অনুমান সত্যি হয়, তাহলে তৃতীয় দফায় তার ভ্রমণের ফলে আমরা তছনছ হয়ে যাব। রূপ পরিবর্তনের অনেক বেশি সম্ভাবনা থাকবে। কারণ যত বেশি ঘুরতে থাকবে অর্থাত্ সংক্রমণ ঘটবে, তত বেশি নতুন নতুন ভাইরাস তৈরি হবে। যত বেশি নতুন ভাইরাস তৈরি হবে, তত বেশি তার পোশাক বা রূপ পরিবর্তনের অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। তখন সারা দেশে লকডাউন অথবা ১৪৪ ধারা জারি করেও লাভ হবে না। আসুন নিচের বিষয়গুলো একটু গভীরভাবে অনুধাবন করি এবং নিজে চর্চা করার চেষ্টা করি। ক) যারা ভাবছেন মাস্ক পরলে নিঃশ্বাস নিতে পারছেন না, বিশ্বাস করুন মাস্ক না পরলেই আপনার এবং আপনার পরিবারের অনেকের নিঃশ্বাস চিরতরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাই মাস্ক ব্যবহার করুন এবং একান্ত প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির বাইরে বের হবেন না। খ) কয়েকবার লকডাউনের অভিজ্ঞতায় বলা যায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশে এই প্রক্রিয়া কাজ করবে না। লকডাউন সাময়িকভাবে সংক্রমণ কমাতে অবশ্যই সাহায্য করবে। কিন্তু যেহেতু সংক্রমণকে শূন্যের কোঠায় আনা সম্ভব হচ্ছে না, সঙ্গে আকাশপথে, স্থলপথে, জলপথে প্রবাসী বা বিদেশিদের আসা বন্ধ করা যাবে না; সুতরাং যত দ্রুত সম্ভব আমাদের ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা করতে হবে। সমস্ত দেশে লকডাউনের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে লাভ হবে না। সংক্রমণপ্রবণ জেলাভিত্তিক বা এলাকাভিত্তিক লকডাউন কৌশল নির্ধারণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের মতো জনসংখ্যা বহুল দেশে এটাই সবচেয়ে বেশি কার্যকর হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। এর ফলে একটি বা কয়েকটি এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য অনেক সহজ হবে। গ) শুধু এক প্রকার ভ্যাকসিনের ওপর নির্ভর করে থাকলে হবে না। এই মুহূর্তে পৃথিবীতে মানবশরীরে প্রয়োগরত সব ভ্যাকসিনের সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে। স্পুিনক-ভি নিয়ে সরকারের এবং রাশিয়ার চুক্তিটিকে অবশ্যই সাধুবাদ জানাই। চায়নার ভ্যাকসিনেরও প্রয়োগ শুরু হবে আশা করি। কিন্তু করোনাকালে অনেক প্রতিশ্রুতির মতো এটাও যেন কোনো লাল ফিতায় বাঁধা না থাকে। যত দ্রুত সম্ভব স্পুিনক-ভি ভ্যাকসিনের দেশীয় উত্পাদনব্যবস্থা করার পাশাপাশি অন্যান্য সম্ভাব্য ভ্যাকসিন-এর বিকল্প উেসর ব্যাপারে সক্রিয় যোগাযোগ চালিয়ে যেতে হবে। এখনো খুব বেশি দেরি হয়ে যায় নাই। ঘ) ভারত সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে হবে, যেন আমাদের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট ভ্যাকসিনের বাকি ডোজগুলো দ্রুত এদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে। কারণ, ভ্যাকসিনই পারবে মানুষকে সুরক্ষা দিতে করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে এবং একটা সুরক্ষা বলয় তৈরিতে। এটাও প্রমাণিত যে, ভ্যাকসিন গ্রহণকারী ব্যক্তিকে যদি ভাইরাসটি সংক্রমিত করেও ফেলে, তাহলে সেই ব্যক্তির মধ্যে রোগের তীব্রতা অনেক কম হয় এবং হাসপাতালমুখী হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। এই কূটনীতিতে আমাদের জয়ী হতেই হবে খুব দ্রুতই। ঙ) পার্শ্ববর্তী দেশের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, আমাদের এখন থেকেই প্রস্তুত থাকতে হবে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহের জন্য। অন্তত অক্সিজেনের অভাবে এদেশে যেন কোনো মৃত্যু না ঘটে। সব জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেনের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ মোতাবেক অক্সিজেন প্ল্যান্ট স্থাপনের কাজ অতি দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। চ) হাসপাতালের আইসিইউর সক্ষমতা কার্যকরভাবে বৃদ্ধি করতে হবে। এ পর্যায়ে দেশে করোনা সংক্রমণের লাগামে কিছুটা টান ধরেছে। কিন্তু এতে আত্মতুষ্টিতে ভুগলে চলবে না। আমাদেরকে আরো সাবধান হতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে, না হলে এর চেয়ে বড় বিপর্যয় অনিবার্য। পরিবারের প্রবীণ ব্যক্তিটিই বুদ্ধিমান, জ্ঞানী এবং অভিজ্ঞ হয়ে থাকেন। তিনি হতে পারেন আমার বাবা, মা, বড় ভাই, শিক্ষা গুরু, অফিস প্রধান। সত্য হলো এই মানুষগুলোকে কেড়ে নিয়ে করোনা দিনে দিনে আমাদের মেধাশূন্য করে দিচ্ছে। সর্বোপরি আমাদের এবং আমাদের পরিবারের ভালোটা আমাদের নিজেদেরই বুঝতে হবে। সুতরাং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী জীবনযাপন করলেই আমি ও আপনি, আমার ও আপনার পরিবারসহ আমাদের সকলের সুরক্ষা নিশ্চিত হবে।

n লেখক : অধ্যাপক, প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়