ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য ১৯৯৬ সনে কোচিং করতে যখন প্রথম ঢাকাতে যাই, তখন ঢাকা একটুও ভালো লাগেনি। নিরেট ইট, পাথর আর জনবহুল, গাছপালাহীন কংক্রিটের শহর—আমি যেন ‘জলহীন মীন’। একজন নিখাদ গ্রামের ছেলে আমি। তাই রবীন্দ্রনাথের ভাইপো ‘বলাইয়ের’ মতো ছোটবেলা থেকে গাছপালা ভালোবাসি, গাছের সঙ্গে কথা বলি, তার আনন্দে হাসি, তার কান্নায় কাঁদি। ঢাকায় গিয়ে আমার মানসিক ভারসাম্য যখন অনেকটা বিকল হবার অবস্থা, তখন শখ করে একদিন প্রখর মধ্যাহ্নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যাই। প্রথমেই প্রেমে পড়ে যাই—পলাশী থেকে জগন্নাথ হলের রাস্তার দুই পাশে আকাশছোঁয়া প্রাচীন রেনট্রির সারি দেখে। আনন্দ অশ্রু মনের অজান্তেই চোখ থেকে নেমে এলো। এত দিনের সমস্ত দাবদাহ ধুয়ে যেন আমার হূদয় বেয়ে শতসহস্র শীতল পেলব ধারা নেমে এলো। ক্যাম্পাসে যতই ঘুরতে থাকি, বিস্ময় যেন ততই বাড়তে থাকে! এ কি সত্যিই ঢাকা, নাকি অন্য কোথাও! হাঁটতে-হাঁটতে রমনার কোল ঘেঁষে চলে এলাম ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। এ তো প্রকৃতির আরেক বিস্ময়! এ তো বিভূতিভূষণের প্রকৃতিশোভিত নন্দনলোক।
সুনিবিড় ঝোপের মতো শীতল গাছের ছায়ার একটি বেঞ্চিতে জামা খুলে আসমান পানে তাকিয়ে শুয়ে পড়লাম। বৃক্ষশোভিত এই ঐতিহাসিক উদ্যানের কী অপার শক্তি! যে তরুণ ঢাকাতে এসেই বীতশ্রদ্ধ হয়েছিল; সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, উদ্যানের সকল বৃক্ষ, এর সুশীতল ছায়া, এক মুহূর্তে এর নিবিড় বন্ধুত্ব সেই তরুণের মনের ভাবকে একেবারে ইউটার্ন করে দিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর তাই সোহরাওয়ার্দী উদ্যান হয়ে উঠল আমার আবেগের জায়গা, আত্মার জায়গা। আমার মতো আরো অনেক মানুষের প্রাণের জায়গা এটি। বৃক্ষকে ভালোবেসে যুগে যুগে মুনি-ঋষি থেকে শুরু করে কবি-সাহিত্যিকরা বৃক্ষকে বন্দনা করেছেন। বিখ্যাত মার্কিন কবি রবার্ট ফ্রস্ট বৃক্ষকে ভালোবেসে লিখেছেন তার অমর কবিতা ‘ট্রি অ্যাট মাই উইন্ডো’। কাজী নজরুল ইসলাম বৃক্ষকে বন্ধু, সখা, প্রেমিকা, রাত জাগার সাথি সম্বোধন করে লিখেছেন গা শিউরে ওঠা বিখ্যাত কবিতা ‘গুবাক তরুর সারি’—
‘...চমকিয়া জাগি, ললাটে আমার কাহার নিশ্বাস লাগে?/ কে করে ব্যজন তপ্ত ললাটে,/ কে মোর শিয়রে জাগে?/ জেগে দেখি, মোর বাতায়ন-পাশে জাগিছে স্বপনচারী/ নিশীথ রাতের বন্ধু আমার গুবাক-তরুর সারি।’
১৬১০ সালে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে ঢাকা নগরী প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এই উদ্যান গড়ে ওঠে। প্রায় ২ কোটি মানুষের এই মহানগরের অন্যতম ফুসফুস এ উদ্যানের বৃক্ষরাজি। নগরী থেকে বিলুপ্ত বিভিন্ন গুল্ম, ফার্ন, ছত্রাক, লাইকেন, অণুজীব, পাখি, বেজি, কাঠবিড়ালি, সাপ, বাদুড়, প্রজাপতি, মৌমাছি, কেঁচোসহ নানা প্রাণীর আবাসস্থলও এটি। সেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এবার শতাধিক গাছ কেটে নির্মাণ করা হচ্ছে সাতটি রেস্টুরেন্টসহ জনসাধারণের চলাচলের জন্য ‘ওয়াকওয়ে’। গত কয়েক দিনে উদ্যানের ৩৮টি গাছ কাটা হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় লাল ‘ক্রস’ দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে আরো কমপক্ষে ৪০টি গাছ। কয়েক দিন ধরেই এর প্রতিবাদ জানিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন দেশের পরিবেশবাদী, মুক্তবুদ্ধিজন, শিল্পী-সাহিত্যিক, সংস্কৃতিজন, সোশ্যাল অ্যাকটিভিস্টসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। উদ্যান এলাকাকে বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত না করে আগামী বর্ষায় এখানে আরো ১০ হাজার নতুন বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় বৃক্ষ লাগানোর দাবি জানিয়েছেন তারা। এখানেই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রদান করেন ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ। এখানেই ৯৩ হাজার পরাজিত পাকিস্তানি সৈন্য আত্মসমর্পণ করেছিল—এসেছিল আমাদের পরম কাঙ্ক্ষিত বিজয়। আমাদের বৃক্ষপ্রেমী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ যখন সারা পৃথিবী জীবনদায়ী বৃক্ষরোপণ এবং বৃক্ষরক্ষা আন্দোলনে সোচ্চার তখন অক্সিজেন ব্যাংক আর ফুসফুস বলে খ্যাত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের এই ‘মানববন্ধু’ ঐতিহাসিক বৃক্ষ নিধন করে রেস্তোরাঁ এবং ওয়াকওয়ে তৈরি করা কি প্রকারান্তরে ঢাকার ফুসফুসকে নষ্ট করার শামিল নয়? তাই যথাযথ কর্তৃপক্ষসহ সর্বমহলে সকাতর আবেদন করি, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসহ দেশের সকল বন এবং বনের বৃক্ষ রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে চাই—‘দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর,/ লও যত লৌহ লোষ্ট্র কাষ্ঠ ও প্রস্তর/ হে নবসভ্যতা! হে নিষ্ঠুর সর্বগ্রাসী,/ দাও সেই তপোবন পুণ্যচ্ছায়ারাশি।’
n লেখক :কবি, ব্যাংকার ও সমাজকর্মী