প্রতি বছর ৮ মে সারা বিশ্বে পালিত হয় বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘বিশ্ব জুড়ে থ্যালাসেমিয়া সম্প্রদায়ের স্বাস্থ্যগত অসাম্য চিহ্নিতকরণ। স্বাস্থ্যসেবায় উন্নত দেশের তুলনায় বাংলাদেশে, এমনকি দেশের অভ্যন্তরেই যে ভয়াবহ অসাম্য রয়েছে তা বর্তমান মহামারিতে বেশ প্রকটভাবেই পরিলক্ষিত হয়েছে। প্রতিপাদ্যটি খুবই সময়োপযোগী। কারণ, থ্যালাসেমিয়ার ক্ষেত্রেও এই অসাম্য ব্যতিক্রম নয়। গত এক বছরে করোনা মহামারিতে স্বাভাবিকভাবেই সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে পড়েছে স্বাস্থ্য খাত।
থ্যালাসেমিয়া রোগীরা করোনাকালে বিভিন্ন ধরনের অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছেন। বাংলাদেশে রয়েছে ৬০ হাজারেরও বেশি থ্যালাসেমিয়া রোগী, যাদের প্রতি মাসে রক্তগ্রহণের প্রয়োজন হয়। সেই হিসেবে বিশ্বের ৮ শতাংশ রক্তনির্ভর থ্যালাসেমিয়া রোগীর বসবাস কেবল বাংলাদেশে। অথচ বিশ্বের ৫০ শতাংশ রক্তদানই ঘটে উচ্চ-আয়ের দেশগুলোতে, যেখানে জনসংখ্যা গোটা বিশ্বের ১৯ শতাংশ এবং যেখানে থ্যালাসেমিয়া রোগী রয়েছে গোটা বিশ্বের মাত্র ৬-৭ শতাংশ। শুধু থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য প্রতি বছর বাংলাদেশে অন্তত ১৪ লাখ ইউনিট রক্ত প্রয়োজন। নিয়মিত রক্ত জোগাড় করতে অনেক সময়ই বেশ হিমশিম খেতে হয় রোগী ও তার স্বজনদের। করোনাকালে এই অসুবিধা যেন বেড়ে গেছে আরো বহু গুণ। থ্যালাসেমিয়ার অন্যতম চিকিত্সাকেন্দ্র ঢাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া সমিতিতে রয়েছে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার নিবন্ধিত রোগী। বাংলাদেশে প্রায় প্রতি ১০ জনে একজন থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক। প্রতি বছর দেশে অন্তত ৭ হাজার শিশু জন্ম নিচ্ছে থ্যালাসেমিয়া রোগ নিয়ে। ঢাকায় উল্লেখযোগ্য থ্যালাসেমিয়া চিকিত্সাকেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া সমিতি হাসপাতাল, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল থ্যালাসেমিয়া সেন্টার, বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ও ক্যানসার হাসপাতাল, ল্যাব ওয়ান ফাউন্ডেশন অব থ্যালাসেমিয়া এবং থ্যালাসেমিয়া সেন্টার—বিএসএমএমইউ। চিকিত্সাকেন্দ্রগুলোতে সদস্য রোগীদের জন্য রয়েছে দিবাকালীন রক্তসঞ্চালন সেবা, কম মূল্যে ওষুধ ও টেস্ট। তবে প্রয়োজনের তুলনায় এসব সুযোগ খুব সীমিত এবং রাজধানীর বাইরে এসব সুযোগ নেই বললেই চলে। থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য প্রয়োজন প্যাকড ব্লাড সেল কিন্তু তা ঢাকায় গুটিকয়েক জায়গা ছাড়া কোথাও সহজলভ্য নয়, প্যাকড ব্লাড সেলের পরিবর্তে বারবার হোল ব্লাড গ্রহণের কারণে সৃষ্টি হয় নানা শারীরিক সমস্যা ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি। থ্যালাসেমিয়া ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশনের (টিআইএফ) মতে, করোনা দুর্যোগে থ্যালাসেমিয়া রোগীদেরকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে এবং তাদের জন্য ভ্যাকসিন নিশ্চিত করতে হবে। টিআইএফের পরামর্শ মোতাবেক থ্যালাসেমিয়া রোগীদের রোগপ্রতিরোধক্ষমতা কম, করোনা ভাইরাস থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বিশ্বব্যাপী সব থ্যালাসেমিয়া রোগীকে যত দ্রুত সম্ভব অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যে কোনো অনুমোদিত ভ্যাকসিন নিতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত থ্যালাসেমিয়া বা অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার রোগীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভ্যাকসিন দেওয়ার কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি।
একজন থ্যালাসেমিয়া বাহকের সঙ্গে অপর একজন বাহকের বিয়ে হলে প্রত্যেক গর্ভাবস্থায় সন্তান থ্যালাসেমিয়া রোগী হয়ে জন্ম নেওয়ার আশঙ্কা ২৫ শতাংশ। কিন্তু বাহকেরা নীরবে বহন করে থ্যালাসেমিয়া রোগের বীজ, বাহকের কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। বিয়ের আগে তাই বাহক কি না, জানতে হলে হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফরেসিস টেস্ট করে নিশ্চিত হতে হবে। বর্তমানে গর্ভস্থ ভ্রূণ থেকেও সন্তান গর্ভে থাকা অবস্থায় থ্যালাসেমিয়া নির্ণয় করা যায়, এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে। কাজেই থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধের একমাত্র উপায় হচ্ছে বাহকের সঙ্গে বাহকের বিয়ে বন্ধ করা অথবা তাদের সন্তান নেওয়ার সময় সতর্ক থাকা। প্রতি বছর বাংলাদেশেও থ্যালাসেমিয়া দিবসে বেশ কিছু আলোচনা-অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়ে থাকে, তবে এই আলোচনাগুলো বেশির ভাগ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাতেই সীমাবদ্ধ থাকে। চিকিত্সাব্যবস্থার অগ্রগতির ফলে এর সুফল থ্যালাসেমিয়া রোগীরাও পাচ্ছে, যার ফলে তাদের মৃত্যুর হার কমেছে এবং জীবনমান বেড়েছে। আগে পর্যাপ্ত চিকিত্সার অভাবে অনেক কম বয়সেই থ্যালাসেমিয়া রোগীরা মৃত্যুবরণ করত। সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন রোগীরা নিয়মিত চিকিত্সা নিয়ে অনেকটাই স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে, তবে তাদের এই যুদ্ধ চালিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজন আরো পৃষ্ঠপোষকতা।
এখনো অনেকের ধারণা থ্যালাসেমিয়া শিশুদের রোগ। রোগীদের গড় আয়ু বাড়ার ফলে প্রাপ্তবয়স্ক অনেক রোগী রয়েছেন এখন, তাদের কথা ভুললে চলবে না, সমাজের সব ক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণ ও তাদের স্বাভাবিক জীবন নিশ্চিত করতে হবে। উন্নত দেশগুলো যেখানে প্রতিকারের উন্নত উপায়গুলোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সেখানে আমরা এখনো বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষাটুকুও নিশ্চিত করতে পারছি না। জাতীয় পর্যায়ে সব থ্যালাসেমিয়া রোগীর নিবন্ধন প্রয়োজন, এতে করে সব ক্ষেত্রে থ্যালাসেমিয়া রোগীর অংশগ্রহণ ও তাদের জন্য চাকরিসহ সব ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা রাখা সহজতর হবে। জেলা পর্যায়ে থ্যালাসেমিয়া চিকিত্সাকেন্দ্রের ব্যবস্থা করতে হবে এবং সেসব কেন্দ্রে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডাক্তার, স্বাস্থ্যসেবাপ্রদানকারী, নিরাপদ রক্ত ও সাশ্রয়ী মূল্যে পর্যাপ্ত ওষুধ নিশ্চিত করতে হবে। চিকিত্সকদের জন্য সরকার ২০১৯ সালে থ্যালাসেমিয়া-বিষয়ক জাতীয় গাইডলাইন প্রকাশ করে, এটি প্রশংসার দাবিদার। এই গাইডলাইন দেশের সব প্রান্তে যেসব চিকিত্সক থ্যালাসেমিয়া রোগীদের চিকিত্সা দিয়ে থাকেন তাদের হাতে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে এবং তাদের জন্য ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
সরকার ২০২৮ সাল নাগাদ থ্যালাসেমিয়া রোগী জন্মের হার শূন্যের কোঠায় আনতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ বিষয়ে সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, যেমন—শিগিগরই দেশব্যাপী আটটি চিকিত্সাকেন্দ্র স্থাপন করা হবে, ঢাকা ও চট্টগ্রামে দুটি ডিএনএ টেস্ট ল্যাব স্থাপন করা হবে এবং বিনা মূল্যে রক্ত, সঞ্চালন সরঞ্জাম ও আয়রন-নিষ্কাশন ওষুধ দেওয়া হবে। এই ঘোষণাগুলো দ্রুতই যেন কার্যকর করা হয়, সেটিই আজকের এই থ্যালাসেমিয়া দিবসে রোগীদের একমাত্র চাওয়া।
n লেখক : গবেষণা সহকারী, সানেম