ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতি সশ্রদ্ধ ভালোবাসা

মুহাম্মদ মুজাহিদুল ইসলাম

বৈশ্বিক করোনাভাইরাস দুর্যোগে বাংলাদেশে প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল ভৌত অবকাঠামো, জনবল ও সরঞ্জাম নিয়ে আমাদের ডাক্তার, নার্স, প্যারামেডিক্স, টেকনিশিয়ান, ওয়ার্ডবয় ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী নিজেদের জীবন বাজি রেখে রোগীদের চিকিত্সা দিয়ে যাচ্ছেন, তাদের প্রতি আমাদের সশ্রদ্ধ কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা প্রকাশ করছি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি দেশে এক হাজার মানুষের জন্য একজন ডাক্তার প্রয়োজন। ইতালিতে প্রতি এক হাজার মানুষের জন্য প্রায় ৬ জন করে ডাক্তার রয়েছেন। বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্বাস্থ্যব্যবস্থা হলো ইতালির। সে ইতালিও কোভিড-১৯ মোকাবিলায় হিমশিম খেয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশে ২৫০০ মানুষের জন্য মাত্র ১ জন ডাক্তার রয়েছেন। তবে এ অনুপাত আদর্শ ও সর্বজনীন নয়। শহরে ডাক্তার ও রোগীর অনুপাত কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও মফস্সল ও গ্রামে রোগী ও ডাক্তারের অনুপাত প্রয়োজনের তুলনায় রীতিমত ভয়াবহ। বাংলাদেশের ৭০ শতাংশ মানুষের বসবাস গ্রামে। গ্রামের মানুষের স্বাস্থ্যসেবাপ্রাপ্তির জায়গা হলো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশের অধিকাংশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রয়োজনীয় জনবল, ভৌত অবকাঠামো ও সরঞ্জাম নেই। এ সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়েই আমাদের ডাক্তারদের চিকিত্সাসেবা দিতে হয়। বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে উপযুক্ত চিকিত্সা না  পেলে আমরা ডাক্তারদের ওপর হামলে পড়ি। কিন্তু সমস্যার গভীরে যেতে চাই না। সীমাবদ্ধতা, অপ্রতুলতা, অপমান ও লাঞ্ছনা সহ্য করেও আমাদের ডাক্তররা যে চিকিত্সাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন, এজন্য তাঁদের প্রতি আমাদের অবশ্যই সম্মান প্রদর্শন করা উচিত।

আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে কোনো পেশার শতভাগ লোকই দায়িত্বে আন্তরিক নয়। এ তিক্ত বাস্তবতা স্বীকার করতেই হবে। এর মধ্যেও যাঁরা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করছেন, তাঁদেরকে অবশ্যই ইতিবাচকভাবে উত্সাহ দিতে হবে, প্রশংসা করতে হবে ও পুরস্কৃত করতে হবে। জাতি হিসেবে আমরা অন্যের প্রশংসা করার বেলায় খুবই কৃপণ। জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে হীনম্মন্যতার সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। করোনার বিরুদ্ধে কোনো পারমাণবিক বোমা, হাইড্রোজেন বোমা ও মিসাইল কাজ করছে না, কাজ করছে কেবল ডাক্তারদের আন্তরিকতা, ভালোবাসা ও মানুষের প্রতি তাঁদের মমত্ববোধ। আমরা যখন বাসায় বসে গান শুনছি, মুভি দেখছি, বই পড়ছি, ইবাদত করছি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ খেলছি, ঠিক সেই মুহূর্তেই আমাদের ডাক্তার ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী জীবনের সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে আমাকে, আপনাকে অথবা আমাদের বাবা-মা, ভাইবোন ও অন্যান্য পরিজনকে বাঁচানোর জন্য আপ্রাণ  চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সুতরাং আমাদের কোনোভাবেই উচিত হবে না, ডাক্তার ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর সমালোচনা করে তাদের মনোবল ভেঙে জাতীয় বিপর্যয় ঘটানো।

সবকিছুকে স্থবির ও অচল করে দিয়েছে করোনাভাইরাস। এ অচলাবস্থা কত দীর্ঘ হবে ও আমরা আমাদের জাতীয় ক্ষয়ক্ষতি কতটা কমিয়ে আনতে পারব—তা নির্ভর করছে আমাদের সামগ্রিক আচরণের ওপর। তবে এটি নিশ্চয় বলার অবকাশ রাখে না যে, জাতীয় ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা ও দ্রুত অচলাবস্থা থেকে উত্তোরণে বিপুলভাবে নির্ভর করতে হবে আমাদের ডাক্তার ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর। স্বাস্থ্যকর্মী বলতে ডাক্তার,  নার্স, প্যারামেডিক্স, টেকনিশিয়ান, ওয়ার্ডবয়, সুইপার সবাইকেই বোঝাচ্ছি। চিকিত্সাসেবা একটি দলগত বিষয়। যেখানে একজন চিকিত্সক হবেন দলনেতা আর সে দলের সদস্য হবেন নার্স, প্যারামেডিক্স,  টেকনিশিয়ান থেকে শুরু করে ওয়ার্ডবয়, সুইপার সবাই। রোগীর সুচিকিত্সার স্বার্থে সেবা প্রদানকারী এই দলের মধ্যে চমত্কার সমন্বয় গড়ে ওঠা জরুরি।

রংপুর