আমাদের সমাজ সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে মেধাশূন্য হয়ে পড়ছে

সংগীতের সোনালি যুগ থেকে নিজেকে রবীন্দ্রসংগীতের সঙ্গে নিবিড় করে রেখেছেন গুণী রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী অদিতি মহসিন। পাশাপাশি করোনাকালীন চালু করেছেন রবীন্দ্রসংগীত শিক্ষার অনলাইন স্কুল। রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীতে নিজের ব্যস্ততাসহ সংগীতের বিভিন্ন বিষয়ে তিনি কথা বললেন বিনোদন প্রতিদিনের সঙ্গে। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন এ এম রুবেল

রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীর ব্যস্ততা প্রসঙ্গে জানতে চাই—

প্রতিবছর দুই বাংলাতে যেভাবে ২৫ বৈশাখ রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী পালন করা হয় এবার করোনার কারণে সেভাবে পালন করা হচ্ছে না। তবে আগামীকাল (আজ) দ্য বেঙ্গল নামে ওপার বাংলা একটি অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি অংশ নিয়ে গান গাইবো। এছাড়া বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানের জন্য রেকর্ড করে গান পাঠিয়েছি। পাশাপাশি করোনাকালে ‘আনন্দধারা’ নামে একটি অনলাইন স্কুল এবং একটি ইউটিউব চ্যানেল চালু করেছি। সেগুলো নিয়েই ব্যস্ততা চলছে।

করোনার কারণে অনেক শিল্পীই মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এতে রবীন্দ্রসংগীত চর্চার প্রতি আগ্রহ কমে যাবে বলে মনে করছেন না?

হ্যাঁ, অবশ্যই চর্চা কমে যাবে। অন্যান্য মাধ্যম কমবেশি চালু আছে, কিন্তু গানের মাধ্যমটি পুরোই বন্ধ। একটি জাতি কিন্তু শুধু অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন দিয়ে বিশ্বে মাথা তুলে দাঁড়ায় না। এক্ষেত্রে সংস্কৃতিও কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মানুষ সাংস্কৃতিক চর্চা থেকে দূরে সরে যাওয়া কিন্তু জাতির জন্য মঙ্গল নয়।

নিজেস্ব ঘরানার বাইরে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে একটি ভিন্নধর্মী গান গেয়েছেন। গানটি করতে গিয়ে আপনার অভিজ্ঞতা ও চ্যালেঞ্জের গল্প শুনতে চাই—

চিরকুট থেকে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এই গানটি গাওয়ার জন্য আমাকে প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিছু না ভেবেই গানটি করতে রাজি হই। তবে গানটির জন্য আমাকে খুব বেশি কষ্ট করতে হয়নি। কারণ তারা নিজেদের মতো করেই আমাকে দিয়ে গানটি করে নিয়েছে। ভালো লেগেছে গানটি গেয়ে।

বিশেষ দিবস ছাড়া রবীন্দ্র বা নজরুলসংগীতের অনুষ্ঠান আয়োজিত হতে কমই দেখা যায়। এতে নতুন শিল্পীদের এই গানে আসার প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে মনে করছেন না?

অবশ্যই আগ্রহ হারাচ্ছে। এর জন্য আমি মিডিয়াকে দায়টা দেবো। কারণ মিডিয়ার মাধ্যমেই কিন্তু আমরা মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারি। কিন্তু মূলধারার বাংলা গানের দিকে তাদের দৃষ্টি নেই। মিডিয়া যদি মানহীন, দায়সারা কিছু কাজ দিনের পর দিন প্রচার করে তাহলে তো মানুষ আগ্রহ হারাবেই। আর নতুনরা প্লাটফর্ম না পেলে গানে আসবে কেন! এতে করে কিন্তু আমাদের সমাজ সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে মেধাশূন্য হয়ে পড়ছে।

অনেকই বলেন রবীন্দ্রসংগীতের রক্ষণশীলতা কমাতে হবে। এ নিয়ে আপনি কী মন্তব্য করবেন?

আমি নিজে রক্ষণশীল নই, তবে রবীন্দ্রনাথ নিজেও যেহেতু চাননি তার গান ভিন্ন সুরে কেউ গাইবে সেহেতু আমি মনে করি রবীন্দ্রসংগীত রবীন্দ্রনাথের সুরেই গাওয়া উচিত।

রবীন্দ্রসংগীতে নারী শিল্পী অনেকেই রয়েছেন। সেই অনুপাতে পুরুষ শিল্পী না তৈরি হওয়ার কারণ কী বলে মনে করেন?

এর কারণ হিসেবে বলবো, ছেলেদের কিন্তু জীবিকার একটা বিষয় থাকে। কেউ যদি গান গেয়ে স্বচ্ছলভাবে না চলতে পারেন তাহলে কিন্তু গান নিয়ে পড়ে থাকা কঠিন একটা ছেলের জন্য।

রবীন্দ্রসংগীতকে পেশা হিসেবে নেওয়া কতটা ইতিবাচক বলে মনে করেন?

আমরা তো পেশা হিসেবে নিয়ে ভালোই আছি। তবে সামনের দিনগুলোতে পেশা হিসেবে রবীন্দ্রসংগীতকে নেওয়া যাবে কি-না সেটা নিয়ে আমার একটু সন্দেহ আছে।

নতুন প্রজন্মের রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে আগ্রহ কেমন দেখছেন?

রবীন্দ্রসংগীতে নতুনদের আগ্রহ আগে থেকেই রয়েছে। হয়তো তারা নিজেদের মতো করে গানটাকে সাজাতে চায়। তবে গান গুরুমুখী বিদ্যা। নতুন প্রজন্মের মাঝে এই জায়গায় একটু ঘাটতি আছে। তারা রাতারাতি স্টার হতে চায়, কিন্তু সেভাবে শিখতে চায় না।

রবীন্দ্রসংগীত অনেকেই এখন ফিউশন করে গান। এতে মূল রবীন্দ্রসংগীতের স্বকীয়তা কতটা বজায় থাকছে?

কয়েক বছর ধরে এই চর্চাটা আমাদের দেশে শুরু হয়েছে। তবে এটাকে আমি কখনোই সমর্থন করি না।

সংগীতের সোনালি যুগ থেকে নিয়মিত কাজ করছেন। সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে বর্তমান অবস্থা কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

বর্তমান অবস্থা তো আর আগের মতো নেই। আগে অনেক পরিশ্রম করে একটি অ্যালবাম করতে হতো। প্রস্তুতি নিতাম প্রায় ৬ মাস ধরে। কিন্তু গান এখন শোনার চেয়ে দেখার মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। আনুষাঙ্গিক বিষয়গুলো গানে বেশি যুক্ত হয়েছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে গান আগে, তারপর আনুষাঙ্গিক বিষয়।