ভাটি অঞ্চলের মানুষের জীবন অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। সেখানে বন্যা হয়, বানের পানিতে ভেসে যায় কৃষকের ফসল, জমিদারদের অলস সময় কাটে নারী ভোগের আনন্দে। দেওয়ান ভাবনাও তার ব্যতিক্রমী কোনো চরিত্র নয়। ঘরে তিনজন সন্তানসম্ভবা স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও তার নজর পড়ে সোনাইয়ের ওপর। পিতাহারা কন্যাকে মামাবাড়িতে রেখে যায় তার মা। বারো বছরে যৌবনবতী হতেই বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসতে থাকে সোনাইয়ের মামার কাছে। কিন্তু সবদিক না মেলার কারণে বিয়ে হয় না সোনাইয়ের। নদী পাড়ে দেখা হয় মাধবের সঙ্গে। চোখে চোখে ভাব হয়— ভাব গড়ায় প্রণয়ে। এদিকে দেওয়ান ভাবনার কাছে সোনাইয়ের রূপ যৌবনের গুণের কথা পৌঁছে গেলে তাকে পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে ভাবনা। লোক পাঠিয়ে তার মামাকে রাজি করাতে চায়। দেওয়ান ভাবনার প্রলোভনে তার মামা সোনাইকে কৌশলে তুলে দিতে রাজি হয়। নদী পাড় থেকে ভাবনার লোকেরা তুলে নিয়ে যায় সোনাইকে। পথিমধ্যে মাধব তাকে উদ্ধার করে এনে বিয়ে করে। ভাবনা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে যায়। সে মাধবের বাবাকে তুলে নিয়ে গিয়ে বিনিময়ে মাধবকে যেতে বলে। মাধব তার বাবার প্রাণ বাঁচাতে ভাবনা দেওয়ানের কাছে গিয়ে আত্মসমর্পণ করে। বেঁচে যায় মাধবের পিতার প্রাণ কিন্তু মাধবের কী হবে? মাধবের পিতা সোনাইয়ের কাছে অনুরোধ করে তার সন্তানের প্রাণ বাঁচাতে। সোনাই যদি যায় ভাবনা দেওয়ানের কাছে তবেই ছাড়া পাবে মাধব। স্বামীর প্রাণ বাঁচাতে ছুটে যায় সোনাই, সঙ্গে নিয়ে যায় বিষের বড়ি। ভাবনা দেওয়ান সোনাইয়ের ঘরে এসে দেখে সে বিষপাণে আত্মহত্যা করেছে।
অতীতকাল থেকেই নারী যে স্বামীর কল্যাণের জন্য প্রাণ উত্সর্গ করে তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ‘সোনাই মাধব’।
‘সোনাই মাধব’ নাটকের বিয়োগান্তক গল্পটাকে নির্দেশক লিয়াকত আলী লাকীর হাস্যরসাত্মক ভাবে উপস্থানের ভাবনাটা বেশ ভালো লেগেছে। কেননা এমন গল্প যে হাসতে হাসতে উপভোগ করা যায়, তাও তো ভাববার বিষয়। তবে সেক্ষেত্রে হয়তো নির্দেশকের ভাবনার সঙ্গে দর্শকের ভাবনা এক নাও হতে পারে। কেননা নাটক শেষে সোনাইয়ের জন্য যে ব্যথা অন্তরে অনুভূত হওয়ার কথা তা হলো না। এ দায় নির্দেশকের উপরেই কি বর্তায় না? তবে দর্শক যে হাস্যরস বেশ উপভোগ করেছেন তা বলাবাহুল্য। দেওয়ান ভাবনার চরিত্রটি যতটা না ক্রোধের তার চেয়ে বেশি হাস্যরসের হয়ে গেল। ভাবনা যে ভয়ানক এক জমিদার, গল্পে তা বোঝা গেলেও লিয়াকত আলী লাকীর কমেডি অভিনয়ের কারণে তা অনেকটা স্থূলভাবে উপস্থাপিত হলো। কমেডির কারণে ট্র্যাজেডির স্বাভাবিকত্ব নষ্ট হলো—জমে উঠল না। আবার, নাটকের অভিনয়শিল্পীরা একতালে অভিনয় করে গেলেও তার মধ্যে লাঠিয়ালের চরিত্রে স্বদেশ রঞ্জন দাশগুপ্ত যে মেলোড্রামাটিক অভিনয় করেন তাতে বেশ খাপছাড়া লাগে। তবে সোনাই ও মাধব চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করল রোকসানা আকতার রূপসা ও ড. জাহিদুল কবির লিটন। আবার অন্যান্য অভিনয়শিল্পীও বেশ জমিয়ে তুলেছিলেন নাটকটি। মাঝেমধ্যে বাদ্যযন্ত্রের আধিক্য সংলাপের কিছু কথা শোনার ব্যাঘাত ঘটালেও খুব যে খারাপ লেগেছে তা নয়। বাদ্যযন্ত্রের সমাহার ও ব্যবহারের মধুরতায় ভরপুর ‘সোনাই মাধব’।
এই নাটকে নেপথ্য কুশীলবগণ একটু বেশি প্রশংসার দাবিদার। বিশেষ করে যন্ত্রী ও সংগীতের সহশিল্পীদের পারদর্শিতায় মুগ্ধ দর্শক। একতালে একলয়ে সুর ও সংগীতে ভরপুর ছিল। গানের সঙ্গে অণিক বোসের নৃত্য সংযোজনায় নাচের মিশ্রণটাও বেশ মনোমুগ্ধকর। আইরিন পারভীন লোপার পোশাক পরিকল্পনা চরিত্রগুলোর আলাদা অর্থ দাঁড় করিয়ে দেয়। সোনাইয়ের যৌবনের লাল, মাধবের ঘুরে বেড়ানো মনের হরেক রং, সখীগণের হলুদ শাড়ি আর সবুজ ব্লাউজ গ্রামের হলুদ সরষে খেতের কথা মনে করিয়ে দেয়। চরিত্র অনুযায়ী পোশাক বেশ দারুণ। আলোর ক্ষেত্রে অসাধারণ ভাবনা যোগ করেছেন মাসুদ সুমন, সুজন মাহাবুব ও বজলুর রহমান। বিশেষ করে সোনাই যখন বিষের বড়ি খেয়ে মৃত্যুমুখে তখন আলো ধীরে ধীরে কমছে আবার বেড়ে যাচ্ছে। বিষ পানের পর চোখের আলোর সঙ্গে পৃথিবীর আলোর যে লুকোচুরি তৈরি হয়েছে তা সত্যিই প্রশংসনীয়। সব মিলিয়ে দারুণ এক অনুভূতি সৃষ্টি করে লোক নাট্যদলের ‘সোনাই মাধব’।