নাসিম আলী, পিরোজপুর প্রতিনিধি ও হালিমুর রহমান, স্বরূপকাঠি (পিরোজপুর) সংবাদদাতা
নানা সংকটের কারণে স্বরূপকাঠির ইন্দুরহাটের কামার শিল্প বিলুপ্তির পথে। শতবর্ষ ধরে এখানকার কামারশালায় কর্মব্যস্ততা থাকলেও বর্তমানে তা চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। এক সময় ইন্দুরহাট কামারপট্টি টুংটুং শব্দে থাকত মুখরিত। সেই শব্দ এখন আর তেমন শোনা যায় না। কোরবানির ঈদের আগে কামারপট্টিতে কামারদের সামান্য একটু ব্যস্ততা দেখা গেলেও বছরের বেশির ভাগই অলস সময় কাটান কামার সম্প্রদায়ের লোকজন। ফলে তাদের সংসারে চলছে দুর্দিন।
প্রবীণ কামারদের কাছ থেকে জানা যায়, পদ্ম কর্মকার, মাধুরা নাথ কর্মকার, মধুসূদন কর্মকার, ঠাকুর চাদ কর্মকার, কর কিশোর কর্মকার, চন্দ্র কান্ত কর্মকারসহ তাদের পূর্বপুরুষরা প্রায় ২০০ বছর আগে যশোর থেকে স্বরূপকাঠিতে এসে সন্ধ্যা নদীর পশ্চিম তীরে বসবাস শুরু করে। কালের পরিক্রমায় তাদের বসত ইন্দুরহাট কামারপট্টি নামে পরিচিতি লাভ করেছে। ঐ সময়ে কৃষিকাজ ও গৃহস্থালি কাজে ব্যবহূত অধিকাংশ লৌহজাত যন্ত্রপাতি কামাররাই তৈরি করতেন। যার মধ্যে লাঙ্গলের ফলা, দা, বঁটি, কোদাল, কুড়াল, খোন্তা, কাঁচি, চাকু, চাপাটি, রায়েন্দা, বাইস, সর্তা, ঘর নির্মাণের কাজের জন্য খেরি লোহা চৌকাঠের লোহা, কাচ পাইরের লোহা, কোলদার ও উবির লোহা ছিল প্রধান। কাঠামী, বাছারি, পানশীসহ বিভিন্ন ধরনের নৌকা তৈরিতে গালি লোহা, বাসানের লোহা, মলমের লোহা, দেরেগা লোহা, টাবুশে লোহা, দিনারী লোহা, মালা লোহা, গাড়া লোহা, আইল মাছা লোহা, পাতাম লোহা ছিল উল্লেখযোগ্য। নৌকার নোঙর, শেকল, তালা ইত্যাদিও তৈরি হতো এখানে।
কামারশালায় হাপর দিয়ে কয়লার আগুন জ্বালিয়ে লোহা গরম করে তা পিটিয়ে বিভিন্ন প্রকার উপকরণ তৈরি করা হতো। কালের আবর্তে আধুনিকতার ছোঁয়ায় সেসব নৌকা হারিয়ে যাওয়ায় এসব লোহার ব্যবহার এখন আর নেই। অন্যদিকে স্টিলের তৈরি আধুনিক বিভিন্ন কৃষি যন্ত্রপাতি আমদানির কারণে এ শিল্প ধ্বংসের মুখোমুখি।
শান্তি রঞ্জন মুজমদার, সুখ রঞ্জন কর্মকার, চিত্ত রঞ্জন কর্মকার, হরে কৃষ্ণ কর্মকার, গৌতম কর্মকার কালু, ইন্দ্রজিত কর্মকার, অনিমেষ কর্মকারসহ অনেকে জানান, বাপদাদার প্রাচীন এ পেশা আগলে রেখে জীবনজীবিকা নির্বাহ করলেও তাদের সন্তানরা অন্য পেশায় চলে গেছেন। পরিবার পরিজন নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। শান্তি রঞ্জন মজুমদার ও চিত্ত রঞ্জন কর্মকার ইত্তেফাককে জানান, আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বৃদ্ধি, লোহার দাম বৃদ্ধি, কারিগর সংকট, শ্রমিককের মজুরি বেড়ে যাওয়া ও ভাল মানের কয়লা সংকটের কারণে বিলুপ্ত হতে যাচ্ছে ইন্দুরহাটের কামার শিল্প।