উপাচার্যের শেষ কর্মদিবসে তড়িঘড়ি করে নিয়োগ দেওয়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ১৪১ জনের যোগদান কার্যক্রম গতকাল শনিবার স্থগিত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এই নিয়োগ শিক্ষা মন্ত্রণালয় দ্বারা অবৈধ ঘোষণার পর এই কাজের সঙ্গে জড়িতদের খুঁজতে গতকাল ক্যাম্পাসে গিয়ে সাক্ষাত্কার নিয়েছে সংশ্লিষ্ট তদন্ত কমিটি। তারা সদ্য বিদায়ী উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুস সোবহানকে ডেকে এনে তারও সাক্ষাত্কার নিয়েছেন। গতকাল সংশ্লিষ্ট প্রায় ১৫ জনের সাক্ষাত্কার নেওয়া হয়।
তদন্তের জন্য বেলা পৌনে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যান শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের করা তদন্ত কমিটির সদস্যরা। এরা হলেন: কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আলমগীর হোসেন, ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. মো. আবু তাহের, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ড. জাকির হোসেন আখন্দ ও ইউজিসির পরিচালক মোহাম্মদ জামিনুর রহমান। তারা প্রথমেই বিশ্ববিদ্যালয়ের রুটিন দায়িত্বে থাকা উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনন্দ কুমার সাহা ও রেজিস্ট্রার অধ্যাপক আব্দুস সালামের সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন। সাবেক উপাচার্যের জামাতা শাহেদ পারভেজের সাক্ষাত্কার নেওয়া হয়। পরে তদন্ত কমিটির কাছে লিখিত বক্তব্য দেন শাহেদ পারভেজ। এছাড়া বিভিন্ন বিভাগের সভাপতির সাক্ষাত্কার গ্রহণ করে তদন্ত কমিটি। এছাড়া নিয়োগ সংশ্লিষ্ট সহকারী রেজিস্ট্রার তারিকুল আলম, পরিষদ শাখার কর্মকর্তা মামুন অর রশীদ, সংস্থাপন শাখার উপ-রেজিস্ট্রার ইউসুফ আলীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। প্রত্যেকের থেকে লিখিত বক্তব্য নেন তদন্ত কমিটির সদস্যরা।
এ প্রসঙ্গে কমিটির এক সদস্য বলেন, এই নিয়োগ যে অবৈধ, এটা প্রমাণিত। মন্ত্রণালয় এমন সিদ্ধান্ত আগেই জানিয়ে দিয়েছে। এ কারণে নিয়োগ কার্যক্রম বৈধ বা অবৈধ এটা কমিটির কাজ নয়। কমিটি এই অবৈধ কার্যক্রমের সঙ্গে কারা জড়িত তাদের খুঁজে বের করে মন্ত্রণালয়ের কাছে নাম জমা দেবে। মন্ত্রণালয়ের এদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেবে।
বিকাল ৪টার দিকে তদন্ত কমিটির প্রধান ড. আলমগীর হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে এটি একটি নিয়মবহির্ভূত নিয়োগ। সুতরাং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব ব্যক্তিকে সাক্ষাত্কারের আওতায় আনা হয়েছে। নিয়োগ সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। আমরা সব তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছি। কাগজপত্র দেখেছি। বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করব, তারপর আমাদের প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেব।’
সাক্ষাত্কার শেষে সদ্য বিদায়ী উপাচার্য অধ্যাপক এম আব্দুস সোবহান বলেন, ‘১৯৭৩-এর অধ্যাদেশে উপাচার্যকে যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে সেই ক্ষমতাবলে আমি নিয়োগ দিয়েছি। এটা আমি নিজ দায়িত্বে দিয়েছি। যদি নিয়োগ অবৈধ বলতে হয় তাহলে ৭৩-এর অধ্যাদেশের ঐ সেকশনটি বাতিল করা হয়নি কেন?’ তিনি আরো বলেন, যারা নিয়োগ পেয়েছে তারা এই চাকরি ডিজার্ভ করেন। ছাত্রলীগ নেতাকর্মী ও আওয়ামী লীগ পরিবারের সন্তানদের মানবিক কারণে এই চাকরি দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
সেই ১৪১ জনের যোগদান স্থগিত
রাবি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক আব্দুস সালাম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক পত্রের মাধ্যমে বুধবার অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগকৃত সবার (১৪১ জন) নিয়োগ অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে কোনোরূপ সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত নিয়োগপ্রাপ্তদের যোগদানসহ এ সংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রম স্থগিত থাকবে।
এদিকে কারা এই নিয়োগ পেয়েছে এ নিয়ে ক্যাম্পাসে দিনভর আলোচনা-সমালোচনা, বিশ্লেষণ চলছে। একাধিক শিক্ষক ও কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নিয়োগ টিকিয়ে রাখার জন্য ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের চাকরি দেওয়া হয়েছে বলে প্রচার করা হচ্ছে। আসলে তা ঠিক নয়। ১৪১ জনের মধ্যে ৩৫ থেকে ৪০ জন্য ছাত্রলীগ সমর্থিত। বাকিরা উপাচার্যের ঘনিষ্ট বা কেউ কেউ আর্থিক সুবিধা দিয়েও চাকরি নিয়েছেন।
অতিথি ভবন ক্রয়ে দুর্নীতি: ব্যবস্থা নিতে ভিসিকে লিগ্যাল নোটিশ
রাজশাহী থেকে স্টাফ রিপোর্টার জানান, রাবির জন্য ঢাকায় অতিথি ভবনের জমি ক্রয় সংক্রান্ত অনিয়ম ও দুর্নীতিতে অভিযুক্ত ক্রয় কমিটির সভাপতি ও সাবেক উপ-উপাচার্য চৌধুরী সারওয়ার জাহানসহ সবার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন একজন আইনজীবী। গত শুক্রবার দুপুরে ঢাকা জজ কোর্টের আইনজীবী গোলাম রব্বানী ই-মেইলে এই নোটিশ পাঠান। নোটিশে আগামী সাত দিনের মধ্যে আত্মসাত্কৃত অর্থ ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে বর্তমান উপাচার্যসহ সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইনানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে। এ বিষয়ে মতামতের জন্য রাবি উপাচার্যের রুটিন দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আনন্দ কুমার সাহার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি এই বিষয়ে দৈনিক ইত্তেফাকে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এ ঘটনায় হাইকোর্টে মামলা হলে ঘটনাটি তদন্ত করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দুদকের চেয়ারম্যান ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে রুল জারি করা হয়।