সমকালীন

গাছ কেটে আধুনিক হতে চাই না

‘গাছ লাগান, পরিবেশ বাঁচান’। বেগম রোকেয়ার মতো করে বলতে গেলে ঐ স্লোগানটা আমরা তখন দিতাম যখন আমরা অসভ্য ছিলাম, কিন্তু ক্রমেই আমরা সভ্য হতে সভ্যতর হচ্ছি। তাই হয়তো আমাদের এখন বলতে হচ্ছে ‘গাছ কাটুন, আধুনিক হোন’।

ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বহু বছরের পুরোনো গাছগুলো কেটে ফেলা হচ্ছে দেখে বিস্মিত হয়েছি। এই গাছ কাটা নতুন কিছু নয়। এর আগেও বহুবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে হামলা হয়েছে। প্রতিবাদও হয়েছে অনেক। দায়িত্বশীলদের ভাষ্যমতে, উদ্যানে ঘুরতে আসা মানুষের হাঁটার পথ বা ওয়াকওয়ে করতে হবে, তাদের খাবারের চাহিদা মেটানোর জন্য আধুনিক রেস্তোরাঁ প্রয়োজন। বিদেশিদের জন্য আধুনিক স্থাপনা নির্মাণ করতে হবে যেন তাঁরা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজরিত স্থানটি কাছ থেকে দেখতে পারে!

কথা হচ্ছে, গাছগুলো রেখে কি আধুনিক ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা যেত না? আর এখানে আধুনিক রেস্তোরাঁই বা কী প্রয়োজন? ঢাকা শহরে কি বিদেশিদের থাকা বা যাওয়ার মতো হোটেল-রেস্তোরাঁ নেই?

ঢাকা শহরের গাছ কাটা হোক—আমরা তা চাই না। আমরা একটু সবুজ চাই। প্রাণ খুলে শ্বাস নেওয়ার জন্য একটু বিশুদ্ধ অক্সিজেন চাই।

মো. মিলন হোসেন

বৃক্ষদেবীকুলের নিধন প্রসঙ্গে

বাংলাদেশে পূর্বে বাল্যকালে শিশুদের ‘সহজ পাঠ’ অধ্যায়ন করানো হইতো। কীভাবে একটি বৃক্ষ বীজ হইতে জন্ম লয়, কীভাবে সে ফল দেয় ফুল দেয় তাহা শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উক্ত পুস্তকে কবিতা-ছন্দ-উপমার সহিত উলে­খ করিয়াছেন। সেটুকু জ্ঞান থাকিলেও কেহ বৃক্ষদেবীর শরীরে কুঠার চালাইতে উদ্যত হইত না বৈকি। যথাযথ বাল্যবিদ্যের চর্চা আমাদের বাংলাদেশ হইতে বর্তমানে উধাও হইয়া গিয়াছে এবং তাহা রাতারাতি হয় নাই, ক্রমশ। যেই মানুষের শিকড়ই নিরস তাহা হইতে তো সুমিষ্ট ফল পাওয়া দূরের কথা, কোনো প্রকার ফললাভের আশা করাও বড্ডো বিলাসিতা! এদেশের বিদ্যেচর্চা-নীতিচর্চা যে ঠুনকো এক কাঠামোর উপর নির্ভর করিয়া কালাতিক্রম করিতেছে তাহা এরূপ বৃক্ষরাজির সহিত কর্তাদের মল­যুদ্ধ দেখিয়াই স্পষ্ট বোধ না করিবার কোনো উপয়ান্তর দেখি না। জ্ঞানচর্চার অভাবে, মস্তিষ্কে শৈল্পিক পুষ্টির অভাবে আমরা আমিত্ব তথা অনিত্যকেই প্রাধান্য দিতেছি দিনদিন। একজন মানুষ সৃষ্ট হয় নিত্যকে সম্বল করিয়া। বয়োবৃদ্ধির সহিত সম অনুপাতে যথা আমিত্ববোধ  প্রশস্ত হইবার উপক্রম ঘটে তখন আমিত্বের বিসর্জন করিতে করিতে একজন তার জন্মসূত্রীয় নিত্যর সন্ধান পায়। নিত্যের ভজন আমরা যতদিন না করিবো, জাগতিক মোহ-মায়াকে যতদিন প্রত্যাখ্যান করিবারে বিবেক তাড়না না দিবে ততদিন আমাদের মুক্তি নেই, অসম্ভব। বর্তমানে চলমান লোমহর্ষক ঘটনাটি কবে নাগাদ বন্ধ হইবে অথবা আদৌ বন্ধ হইবে কি না তাহা জানি না। তবে আমাদের প্রাচীন বিদ্যেচর্চার নবজাগরণ (পড়ুন পুনর্জাগরণ) প্রয়োজন। শিকড়ে পর্যাপ্ত পরিমাণে রসদ ঢালা এখন যুগের চাহিদা। আপনার প্রতিবেশে যদি কোনো শিশুবন্ধু থাকে তবে তাহাকে পত্রপাঠ এরূপ শিক্ষা দিতে দ্বিধা করিবেন না যে—‘বৃক্ষ আমাদিগের স্বার্থবুদ্ধিরহিত চিরসঙ্গী। তাহা যত্রতত্র নির্বিকারচিত্তে কর্তন করিবার বস্তু নহে।’

 বাংলাদেশের সমুদয় পঠনাক্ষম কর্তাদের কর্ণকুহরে যদি চিত্কার করিয়া বলিতে পারিতাম!—

‘দুঃখ পাচ্ছ, পাচ্ছ না?

তোমার তেমন মন তো না!’

তাজওয়ার ফাহিম