ব্যাকুল কণ্ঠে বালিকা বলল, তুমি কেমন আছো বিস্ট? এক মাস তোমার কোনো খবর নেই।
এক মাসে তুমি ষাট বার নক করেছো। কেন এত ডাকাডাকি করো?
ভয়ে।
কিসের ভয়?
তুমি অসুস্থ কিংবা তোমার কোনো বিপদ হয়েছে কি না—এই দুশ্চিন্তা আমার ঘুম কেড়ে নিয়েছে।
আমার বিপদ হলে তুমি কী করবে?
তুমি আমার বন্ধু। তোমার বিপদে আমি কি স্থির থাকতে পারি? আমি ছুটে আসবো প্লাবনের মতো।
তুমি নেহাতই এক বালিকা। আদরের ছায়ায় বেড়ে ওঠা পুষ্পকলি।
আমাকে তুচ্ছ কোরো না। অবজ্ঞা আমাকে আঘাত করে। কোনোদিন আমার দিকে তাকিয়েছ তুমি? কী করে জানবে আমি কলি, না পুষ্প? আমার সুবাস প্রকৃতিতে বসন্ত আনে। হূদয় আন্দোলিত করে। তোমার কঠিন হূদয়ে কোনোদিনও তা পৌঁছাল না।
তুমি আমার স্বপ্নে ভাসা এক কল্পনা। তুমি ফুলের সুবাস। বসন্তের সমীরণ। তুমি পূর্ণিমার প্লাবিত জ্যোত্স্না। তুমি চাইলে শীত বসন্ত হয়। গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুরে তোমার স্পর্শে প্রশান্তির বারিধারা নামে। তুমি সুন্দর। তুমি কল্যাণময়ী। জগতের সকল সৌন্দর্য তোমার। মুগ্ধ নয়নে সকলে তোমার জয়গান গায়।
শুধু তুমি কখনো ফিরে তাকালে না। সুন্দর তোমাকে স্পর্শ করল না। তোমার পাষাণ হূদয়ে আমি যত কড়া নাড়ি তুমি কোনো সাড়া দাও না। আমি তোমাকে ভালোবাসতে চাই। আমি বারবার ছুটে যাই। তোমার মনের লৌহকপাটের আগল খুলতে চাই। তোমার কোনো সাড়া নেই। কেন তুমি আমাকে অবজ্ঞা কর?
এ অবজ্ঞা নয়, পুষ্পকলি। এ প্রত্যাখ্যান নয়, মেঘবালিকা। আমারও ইচ্ছে করে ভালোবাসার মাল্যদান। আমার হূদয়েও জেগে ওঠে প্রেম স্পর্শ করার দুর্বার আকাঙ্ক্ষা।
আমার ডাকে সাড়া দাও তবে। তোমার লৌহকপাট খুলে বেরিয়ে এসো।
তা হয় না। কোনোদিন তা সম্ভব নয়। তোমার বিপরীত মেরুতে আমার বসবাস। আমি অসুন্দর। আমি কুিসত। আমি দানব। প্রভাতের আলোয় মুক্তির আনন্দে জেগে ওঠে সকল প্রাণী। আমি তখন লুকিয়ে পড়ি গভীর অন্ধকারে। কোনো প্রাণী যেন আমাকে দেখতে না পায়।
তোমাকে দেখলে কী হবে?
ভয় পাবে। সহ্য করতে পারবে না আমার ভয়ংকর সেই দর্শন। রহস্য কি জান, আমার চোখ দেখে তুমি মুগ্ধ হয়ে যাবে। শিশুর সারল্যে ভরা মায়াবী দুটি চোখ তোমার ভয় তাড়িয়ে দেবে। ধীরে ধীরে ঝরে পড়বে তোমার পুষ্পপত্র। তোমার বসন্ত চলে যাবে। তুমি লক্ষ করেছ আমি সারাক্ষণ মুখোশ পরে থাকি।
সে তোমার হবি। মুখোশ সংগ্রহ করা। মুখোশ পরা।
না। মুখোশের আড়ালে আমার কুিসত চেহারা লুকিয়ে রাখি। আমার সঙ্গে যার দৃষ্টিবিনিময় হয় সে তার বসন্ত হারায়। দৃষ্টি লুকিয়ে পৃথিবীর সৌন্দর্য আমি রক্ষা করি। পৃথিবীর সৌন্দর্য আরেকবার আমি রক্ষা করেছি দেবতাদের গ্রাস থেকে। রুষ্ট দেবতার অভিশাপে তাই আজ আমি দানব।
পৃথিবীর সকল সৌন্দর্য আমার জন্য নিষিদ্ধ আজ।
আমার কোনো স্বজন থাকবে না। সীমাহীন নিঃসঙ্গ জীবন। আমার মৃত্যু নেই। অমরত্বের দুঃসহ যাতনায় আমি ক্লান্ত। অনন্তকাল অন্ধকারে দানব হয়ে আমি বেঁচে থাকব।
ভালোবাসা কাকে বলে আমি জানি না। প্রেম! সে তো স্বপ্নে দেখা একবিন্দু আলো। যেমন তুমি। তোমার ভেতর দিয়ে আমি প্রকৃতির রূপ-রসের স্বপ্ন দেখি। প্রেমের দেবী রঙ্গ করে আমাকে বর দিলেন, যদি কোনো সুন্দরী কুমারী তোর প্রেমে পড়ে, তোকে বিয়ে করে তবেই তোর শাপমোচন হবে। কী হাস্যকর বর! বলো, দানবকে কোন রূপবতী বিয়ে করবে? হা... হা... হা... দানব অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে।
দ্বিধা-দ্বন্দ্বে আতঙ্কে বালিকা দোদুল্যমান, বন্ধু, কোনোদিন কি তোমার সঙ্গে আমার দেখা হবে না?
না।
এখন আমি কী করব?
তোমার জীবনে আমি ভুল মানুষ। সুদর্শন হূদয়বান কোনো তরুণকে তুমি নির্বাচন কর।
তোমার ভরাট কণ্ঠের আবৃত্তি যখন শুনি আমার দেহ-মনে শিহরণ জাগে। হূদয়ে ঝংকার ওঠে। তোমার গান যখন ইন্দ্রিয় স্পর্শ করে, আহা আজি এ বসন্তে..., আমার দেহে বসন্তের জোয়ার নামে। পুষ্পে পল্লবে আমার অঙ্গ প্রকৃতি হয়ে ওঠে। অন্তরে বাজে নিরন্তর তোমারই সুরের ধ্বনি। তুমি কী সুন্দর করে কথা বলো। ইচ্ছে করে কান পেতে রই। নীরবে একলা সেই কথার ধ্বনি সারাক্ষণ হূদয়ে মর্মরিত হয়। এমন তো কারো বেলায় হয় না। যে মানুষের অন্তর এত সুন্দর, প্রকাশ এত মার্জিত, সে অসুন্দর হয় কী করে? বন্ধু, বলো আমায়। এ তোমার সাজানো গল্প?
কোনো কথা নেই। বেদনার গভীর দীর্ঘশ্বাস ভেসে আসে শুধু।
হ্যালো... হ্যালো... তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছ? কথা বলছ না কেন? বিস্ট, তুমি কি চলে গেছ?
বালিকার চোখে জল, হূদয়ে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা। বিস্ট, দেবীর চ্যালেঞ্জ আমি গ্রহণ করলাম। বাহ্যিক সৌন্দর্য ক্ষণস্থায়ী। অন্তরের সৌন্দর্য চিরন্তন। তোমার অন্তরের সৌন্দর্য দিয়ে তুমি আলোকিত করো আমার হূদয়। আমার বাহ্যিক সৌন্দর্য মুগ্ধ করুক তোমার অন্তর, প্লাবিত করুক তোমার দেহ। এসো প্রিয় এসো স্বামী, তুমি আমার প্রেম গ্রহণ করো। শাপমুক্ত স্বাধীন চিত্তে তুমি এসো আমার অন্তরে।
এরপর কেটেছে কত শত সহস্র দিবস ও রজনী। বিস্টের পাষাণ হূদয় গলেনি। বালিকা তার লৌহকপাটে করাঘাত করে মিনতি করেছে বারবার, তুমি বেরিয়ে এসো, আমার হাত ধরো। বসন্ত আজ জাগ্রত দ্বারে। বনে বনে নানা বর্ণের সুবাসিত ফুলের মৌ মৌ গন্ধে ব্যাকুল প্রজাপতি ডানা মেলেছে। মৌমাছিরা ফুলে ফুলে গুনগুনিয়ে গাইছে গান। ওরা তোমায় ডাকছে।
আমি অন্ধ, আমি বধির। আমি কিছু দেখি না। আমি কিছু শুনি না। বসন্ত কী আমি জানি না। তুমি ফিরে যাও বালিকা। ভুল ঠিকানায় কেন তুমি বারবার নক করো? কেন আমাকে বিচলিত করো। কুিসতের কাছে সকল সৌন্দর্য অর্থহীন। আমার ভবিতব্য নিঃসঙ্গ অন্ধকার জীবন।
বিস্ট, মিনতি করছি দোর খোল, বেরিয়ে এসো আলোকের ঝরনাধারায়। তুমি কি শুনতে পাচ্ছ না বসন্তের আহ্বান। তুমি বসন্তের গান গাইতে গাইতে আমার হাত ধরো। আমাকে স্পর্শ করা মাত্র তোমার শাপ মোচন হবে। আমি তোমায় ভালোবাসি। দেবীর বরে তুমি ফিরে পাবে হূত জীবন। এসো প্রিয়, আমার বসন্তকে তুমি ব্যর্থ করে দিও না।
হায় অবুঝ বালিকা, কেন তুমি বুঝতে চাইছো না। আমার দৃষ্টি অভিশপ্ত। আমি এক দানব। আমার দৃষ্টির স্পর্শ মাত্র তোমার বসন্ত, তোমার যৌবন লুপ্ত হবে। তুমি আমার বেঁচে থাকার একমাত্র স্বপ্ন। আমার জীবনকে তুমি আর দুঃসহনীয় করো না, মিনতি করি। তুমি ফিরে যাও বসন্তের আনন্দে। অন্ধকারে তোমার স্বপ্নে নিমগ্ন থেকে আমি কাটিয়ে দেবো হাজার বছর।
আজ আমি ফিরে যাওয়ার জন্য আসিনি। আমি এসেছি অন্ধকার দূর করতে। কুিসতকে সৌন্দর্যের বরণডালায় অন্তরে গ্রহণ করতে। এসো প্রিয়, তোমাকে বসন্তের পুষ্পমাল্য দিয়ে স্বামী রূপে বরণ করি।
না, তুমি উন্মাদ!
সকল প্রেমিক-প্রেমিকা উন্মাদ। উন্মাদ বলেই তারা প্রেমের জন্য জীবন বাজি রাখতে পারে। যতক্ষণ তুমি লৌহকপাট খুলে আমার হাত না ধরছো, তোমার লৌহকপাটে আমি মাথা কুটবো মৃত্যু অবধি। দেবী দেখুক তোমাকে পাবার জন্য আমার দুর্বার আকাঙ্ক্ষা। দেখুক তোমার প্রতি আমার প্রেম, আমার ভালোবাসা। আমার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তোমার শাপমোচন হবে।
ধীরে ধীরে খুলে গেল লৌহকপাট। বালিকার চেতনায় ছড়িয়ে পড়ল আনন্দ ও ভয়ের শিহরণ। যেন এক কৃষ্ণগহ্বর। মহাশূন্যতা। কিছু নেই। দৃষ্টি সয়ে এলে দেখা গেল মুখোশ পরা এক কৃষ্ণ যুবক অন্ধকার ভেদ করে বেরিয়ে এল আলোর প্রাঙ্গণে।
বালিকা অন্ধ আবেগে তীরের মতো ছুটে গিয়ে কৃষ্ণ যুবকের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। চোখের জলে বুক ভাসিয়ে বলল, যদি মরতে হয় মরবো একসাথে।
বালিকার স্পর্শে অদ্ভুত এক কাণ্ড হলো। লৌহকপাট কৃষ্ণগহ্বর কোথায় লুপ্ত হলো! মুখোশ খুলে পড়ল। বালিকা বিস্ময়ে দেখল তার সামনে দাঁড়িয়ে কৃষ্ণবর্ণের এক দীপ্ত তরুণ। উন্নত শির বলিষ্ঠ বাহু। আনন্দে আত্মহারা হয়ে বিস্ট বলল, একি, আমার হূত জীবন আমি ফিরে পেয়েছি! প্রিয়, তুমি আমার প্রেম, আমার জীবন। তুমি আমার প্রেম গ্রহণ করো। আমাকে ধন্য করো।
বালিকা আনন্দে বিস্টের বুকে মুখ লুকালো। ফিসফিস করে বলল, তুমি আমার যুবরাজ।
বসন্তের বর্ণিল আনন্দে যুগলবন্দি তরুণ তরুণী নানা স্বপ্নে নিমগ্ন। ভেসে আসছে নানা বর্ণের পুষ্প ও আম্র মুকুলের সুবাস। নাচে গানে কোকিলের কুহু কুহু তানে বসন্ত আজ উচ্চকিত। বালিকা ও যুবরাজ পরস্পরের বাহু বন্ধনে এগিয়ে যাচ্ছে বসন্তের আনন্দে। মৃদু কণ্ঠে গাইছে কৃষ্ণ যুবরাজ, আহা আজি এ বসন্তে...