চলতি সময়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক টানাপোড়েনের ভেতরে এই উপমহাদেশের অতীতের কিছু ছায়া দেখতে পাচ্ছেন অনেকে। পশ্চিমবঙ্গের এবারের বিধানসভা নির্বাচন ছিল যার-পর-নাই গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্বজ্জনদের মতে, এটা ছিল বাঙালি বনাম অবাঙালি এবং সাম্প্রদায়িকতা বনাম অসাম্প্রদায়িকতার নির্বাচন। এই নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের অবিসংবাদিত নেতা মমতা ব্যানার্জির ক্যারিশমায় তাঁর দল তৃণমূল কংগ্রেস বিপুল বিজয় অর্জন করে। ২৯২টি (২৯৪টির মধ্যে) আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে তৃণমূল কংগ্রেস বিজয় লাভ করে ২১৩টি আসনে। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা দখলে ভয়ংকরভাবে মরিয়া হয়ে ওঠা কেন্দ্রশাসিত দল বিজেপি জয়লাভ করে মাত্র ৭৭টি আসনে।
কিন্তু তৃণমূলের এই ভূমিধস বিজয়ের মধ্যেও নন্দীগ্রামে মমতা ব্যানার্জি পরাজিত হন। যেখানে মমতার ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বে তৃণমূল দুই-তৃতীয়াংশের অধিক আসনে জয়লাভ করেছে, সেখানে মমতার এই পরাজয় বিস্ময়কর বটে। এটা অনেকের মনেই অন্য ধরনের সন্দেহেরও উদ্রেক করেছে। এই পরাজয়ের ব্যাপারে মমতা স্বয়ং প্রশ্ন তুলে বলেছেন, ‘৮ হাজারের ওপরে এগিয়ে থাকার মার্জিন এক নিমেষে কী করে শূন্য হয়ে যায়? ইচ্ছা করে সার্ভার ডাউন করে রাখা হয়েছিল। না হলে সারা বাংলার এমন ফলাফল আর নন্দীগ্রামে আলাদা ফল কীভাবে হয়?’ মমতা স্পষ্ট ভাষায় আরো জানিয়েছেন, ‘নির্বাচন কমিশন না থাকলে ৩০টি আসনও পেত না বিজেপি।’
মমতা মুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন বটে, কিন্তু ছয় মাসের মধ্যে তাকে উপনির্বাচনে জিতে আসতে হবে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, মমতাকে হয়তো উপনির্বাচনে অংশ নিতেই দেওয়া হবে না। কিন্তু এর ফল কি ভালো হবে? মমতা যেদিন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন, ভোট-পরবর্তী সন্ত্রাসের প্রতিবাদে সেদিন ঐ অনুষ্ঠান বয়কট করে বিজেপি। ভারতের সর্বাধিক প্রচারিত বাংলা দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা তাদের সম্পাদকীয়তে ‘হার মানিতে শিখুন’ শিরোনামে গত ৭ মে লিখেছে, ‘...ভারতীয় জনতা পার্টি ৩৮ শতাংশ ভোট ও সিকি ভাগ আসন লইয়া বিধানসভায় একমাত্র বিরোধী দল হিসেবে উঠিয়া আসিয়াছে, কিন্তু তাহাতে নরেন্দ্র মোদি ও তাহার পারিষদবর্গের মন উঠে নাই। তাহারা ‘বঙ্গাল’ দখল করিতে চাহিয়াছিলেন, প্রলম্বিত নির্বাচনপর্বে তাহাদের রথী-মহারথীরা রাজ্য জুড়িয়া দাপাইয়া বেড়াইয়াছিলেন।’ সম্পাদকীয়তে আরো বলা হয়েছে, ‘...ভারতের সাত দশকের ইতিহাসে এই উত্থান-পতন বহুবার ঘটিয়াছে। বস্তুত, বিশ্ব জুড়িয়া ইহাই ভারতীয় গণতন্ত্রের প্রধান শক্তি বলিয়া স্বীকৃত ও বন্দিত। বিজেপি গত সাত বত্সরে অনেক নির্বাচনে জিতিয়াছে, অনেক নির্বাচনে হারিয়াছে, আরও অনেক নির্বাচন হইবে, খেলা চলিবে—হারজিত না থাকিলে খেলা কীসের? কিন্তু গোল বাধিয়াছে ঠিক এইখানেই। নরেন্দ্র মোদিরা সব সময় সব খেলাই জিতিতে চাহেন, জিতিতে না পারিলে বরং খেলাটি ভণ্ডুল করিয়া দিবেন, তবু
হার মানিবেন না।’
আমরা দেখতে পাচ্ছি, ভোটে ‘বিপর্যয়ের’ পর পশ্চিমবঙ্গে কেন্দ্রীয় শাসন তথা ‘রাষ্ট্রপতি শাসন’ জারির মরিয়া চেষ্টা শুরু করেছে বিজেপি। এমনকি নজিরবিহীনভাবে মমতা ব্যানার্জির মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নেওয়ার আগেই রাজ্যে রাষ্ট্রপতির শাসন জারির দাবি শুরু হয়ে গেছে। শপথের পরের দিন ছুটে এসেছেন ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের অফিসাররা। গত মঙ্গলবার ইন্ডিয়া কালেক্টিভ ট্রাস্ট নামক একটি এনজিও পশ্চিমবঙ্গে ৩৫৬ ধারা জারি করে রাষ্ট্রপতি শাসনের জন্য সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছে। কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে, পশ্চিম বাংলায় ভোট-পরবর্তী ‘সন্ত্রাসে’ গণতন্ত্র ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। সেখানকার পত্রপত্রিকায় বলা হচ্ছে যে, রাষ্ট্রপতি শাসনের প্ল্যাটফরম তৈরির জন্যই পশ্চিমবঙ্গের ভেতরে অস্থিরতা তৈরির দৃশ্য ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠছে। সেখানে একের পর এক ফেক নিউজ, ভুয়া ছবি, মিথ্যা ভিডিওর মাধ্যমে প্রচার চালিয়ে পশ্চিম বাংলার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হিসেবে দেখানোর চেষ্টা চলছে। বিভেদকামী শক্তি কতখানি বিষধর, কীরূপ মারাত্মক হতে পারে, পশ্চিমবঙ্গে তার হাতে গরম প্রমাণ মিলছে। সেখানকার পত্রিকার সংবাদে এটাও বলা হচ্ছে, প্রতিটি ঘটনাতেই মিথ্যা সাম্প্রদায়িক রং চড়ানো হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, তাহলে এসব হিংসার পেছনে আসলে কারা রয়েছে? নির্বাচনের সময় যারা মাসের পর মাস ধরে পশ্চিমবঙ্গে পড়ে ছিলেন, তাদের লোকই কিন্তু এখন তদন্ত করতে আসছেন।
পশ্চিম বাংলায় এবারের ভোটে যে রকম হিংসার প্ররোচনা, ব্যক্তিগত কুত্সা, কুিসত ভাষা প্রয়োগ ছিল—এ সবই বিস্ময়কর। বিজেপির মরিয়া দশা আর কোথাও এভাবে দেখা যায়নি। এতত্সত্ত্বেও তৃণমূল কংগ্রেস জিতেছে। জয় হয়েছে অসাম্প্রদায়িকতার। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে পশ্চিমবঙ্গে যা হচ্ছে, তা যেন ইতিহাসের ছায়া। পাকিস্তান আমলেও কেন্দ্রীয় সরকার তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে নানান ধরনের কেন্দ্রীয় প্রভাব-প্রতিপত্তি ও শক্তির অপপ্রয়োগ ঘটিয়েছিল। বিদ্বজ্জনদের মনে প্রশ্ন জাগছে, পশ্চিমবঙ্গেও কি এমনটাই হচ্ছে?
এটা মানতেই হবে, ভারতে সবাই গণতন্ত্রমনস্ক। গণতন্ত্রে সহনশীলতা ইলাস্টিকের মতো অনেক দূর অবধি যায়। তবে সেটারও একটা সীমাবদ্ধতা আছে। পশ্চিমবঙ্গের চারদিকের আবহ দেখে অনেকেরই মনে হচ্ছে, ডালমে কুছ কালা হ্যায়। পশ্চিমবঙ্গের চলমান অস্থিরতা যেন অনেক কিছু বলতে চায়। যেন মনে করিয়ে দিতে চায় ইতিহাসের অনেক কিছু।
মাটিভাঙ্গা, পিরোজপুর