ঈদ উত্সবে মানুষ বাড়িতে ফেরার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। এই বছর সারা দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব কমাতে সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে মাত্র তিন দিন ঈদের ছুটি দেওয়া হয়েছে। দূরপাল্লার সব ধরনের গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও জেলাগুলোর অভ্যন্তরে পরিবহন চলছে, তাতে থেমে নেই বাড়ি ফিরতে চাওয়া মানুষ। ভেঙে ভেঙে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ফিরছে মানুষ, যার ফলে সড়ক এবং নৌপথে সব ধরনের দুর্ঘটনা অনেক বেড়েছে। ঈদ যাত্রায় প্রাণহানি আমাদের দেশের জন্য যেন একটি অতি সাধারণ ঘটনা। একদিকে প্রাণহানি বাড়ছে অন্যদিকে মানুষ মরিয়া হয়ে উঠছে ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফেরার জন্য। কারো মধ্যে নেই যথেষ্ট স্বাস্থ্যবিধি মানার বালাই। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রিকশা, বাস, সিএনজি, মটরসাইকেল, নৌকা, ট্রলার, স্পিডবোট—যে কোনো উপায়ে মানুষ ছুটে যেতে চায় নিজ গন্তব্যে।
“নিরাপদ সড়ক চাই”-এর তথ্য অনুযায়ী ২০২০ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪ হাজার ৯৬৯ জন। এ ছাড়া আহত হয়েছেন ৫ হাজার ৮৫ জন। শুধু ঈদ নয় প্রায় সারা বছরই আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ যায় হাজার হাজার মানুষের, পঙ্গু হয় অনেক মানুষ। ঈদের সময় সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ সচেতনতার অভাব। অতিরিক্ত ভাড়া, অসহনীয় যাত্রীর চাপ, যানবাহনের অভাব—কোনো কিছুই যেন বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না ঈদে ঘরমুখো মানুষের সামনে। এমনকি সারা দিনের কর্মব্যস্ততা শেষে রাতে বাড়ি ফেরার প্রবণতা বেড়ে যায় ঈদ এলে, রাতে দূরপাল্লার গাড়িতে দুর্ঘটনার পরিমাণও বাড়ে।
যানবাহন চালকদের অসতর্কতা ও অদক্ষতার কারণে ঈদের সময় সড়কে দুর্ঘটনা বেড়ে যায়। অতিরিক্ত উপার্জনের জন্য চালকগণ বেপরোয়া গতিতে যানবাহন চালিয়ে থাকেন। অন্য যানবাহনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে এগিয়ে যাওয়া এবং অন্য স্টেশনের যাত্রীদের নিজের গাড়িতে তুলে ভাড়া আদায় করা হলো চালকদের মূল লক্ষ্য, যেখানে যাত্রীদের নিরাপত্তা অবহেলিত। দীর্ঘদিন ধরে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কঠোর আইনের দাবির পরে ২০১৯ সালের ১ নভেম্বর থেকে ‘নিরাপদ সড়ক আইন-২০১৮’ কার্যকর হয়েছে; কিন্তু বাস্তবে তেমন কোনো সুফল দেখা যায়নি।
আমাদের দেশে ঈদযাত্রায় সড়কের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। দেশের অভ্যন্তরে প্রধান যোগাযোগমাধ্যম সড়কপথে বিশৃঙ্খলা ও অনিরাপত্তার কারণে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা বেড়ে যাচ্ছে। ঈদ এলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। সড়কে চলাচলের পরিবেশের উন্নয়ন, চালকদের সঠিক প্রশিক্ষণ প্রদান, ত্রুটিবিহীন নিরাপদ সড়ক নির্মাণ, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপূর্ণ আচরণ, চালকদের মাদকসেবন থেকে দূরে রাখা, সড়ক ব্যবহারকারী চালক, পথচারী, যাত্রী—সবাইকে সচেতন হতে হবে।
সড়কের পাশাপাশি নৌপথ বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্ যোগাযোগমাধ্যম। ঈদ এলে নৌপথের ওপর বিরাট চাপ লক্ষ করা যায়; কিন্তু এ বছর নৌযোগাযোগ বন্ধ থাকলেও মানুষের নৌপথে বাড়ি যাওয়া থেমে নেই। ছোট ছোট নৌকা, লঞ্চ, ট্রলার, স্পিডবোটে চেপে যে যেভাবে পারছে ছুটছে গন্তব্যের দিকে। নৌপথে নিরাপত্তা যেন সড়ক পথের চেয়েও বেশি অবহেলিত। ঈদে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী পরিবহন, জীবন রক্ষাকারী সামগ্রী না থাকা, মেয়াদোত্তীর্ণ ও ত্রুটিপূর্ণ নৌযান চলাচল নৌ-দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। আমাদের দেশে নৌপথে যাত্রা সুগম করতে তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় নি। অনেক নৌযানেরই নেই কোনো রেজিস্ট্রেশন। আবার বেশির ভাগ নৌযান চালকদের লাইসেন্স এবং প্রশিক্ষণ নেই।
করোনার কারণে এ বছর সরকার সবাইকে নিজ নিজ কর্মস্থলে থাকতে বলেছেন; কিন্তু সাধারণ মানুষ নিজের জীবনকে তোয়াক্কা করছে না। এভাবে শহর ছেড়ে যেতে থাকলে দুর্ঘটনার পাশাপাশি আবারও সারা দেশে ব্যাপকভাবে করোনা ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়