ধারণা করা হয় খ্রিষ্টপূর্ব ৮০০০ সালে, কৃষি যুগের সূচনালগ্নে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৫০ লাখ। আজকের পৃথিবীতে প্রায় ৭৯০ কোটির বেশি মানুষ বসবাস করে, যা ২০৫০ সাল নাগাদ প্রায় ১০০০ কোটিতে পৌঁছাবে। ম্যালথাস বলেছিলেন, জনসংখ্যা জ্যামিতি হারে বাড়লেও খাদ্য উত্পাদন বাড়ে গাণিতিক হারে। মানবজাতি প্রযুক্তি চর্চায় উত্কর্ষতা দেখিয়ে ম্যালথাসের সেই তত্ত্বকে ভুল বলে প্রমাণিত করেছে। কৃষি বিজ্ঞানের সাফল্যে জনসংখ্যার বৃদ্ধির সঙ্গে খাদ্য উত্পাদনও বেড়েছ পাল্লা দিয়ে, ফলে মানবসভ্যতায় জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে নিশ্চিন্তে। সময়ের সঙ্গে বিশ্বব্যাপী জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, ১৯৬৮ বিশ্বব্যাপী গড় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ২.০৯ শতাংশ। এসব উদ্যোগের ফলে পরবর্তী সময়ে জনসংখ্যার বৃদ্ধির এই হার কমে গিয়ে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১.০১ শতাংশে। ২১০০ সাল নাগাদ জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হবে প্রায় শূন্যের কাছাকাছি এবং ১১০০ কোটি মানুষ নিয়ে মানবসভ্যতা হয়তো স্থিত অবস্থায় গিয়ে ঠেকবে।
জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বজুড়ে বেড়েছে নগরায়ণ। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৫৬.২ শতাংশ মানুষ শহরে বাস করে, ২০৫০ সাল নাগাদ পৃথিবীর প্রায় ৬৮.৬ শতাংশ মানুষ শহরে বসবাস করবে। বৈশ্বিক নগরায়ণ অস্বাভাবিক হারে বাড়লেও এই নগরসমূহ জনবান্ধব হয়ে উঠেনি। অনেক ক্ষেত্রেই নগর আমাদের উপহার দিয়েছে সারিসারি বস্তি। ফলে অস্বাস্থ্যকর, দূষিত ও ন্যূনতম নাগরিক পরিষেবাবিহীন এসব নগর অনুন্নত বিশ্বে শুধু জঞ্জালই বৃদ্ধি করেছে, আর একই সঙ্গে জন্ম দিয়েছে নানাবিধ অসুখ ও মহামারির। অপরিকল্পিত নগরায়ণ আগামীদিনেও অনুন্নত দেশগুলোকে ভোগাবে। আগামী দিনে অপরিকল্পিত নগরায়ণ বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে আরেকটি কারণ হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ঢাকা শহরের বস্তিবাসীদের ভেতরে ৭০ শতাংশ বা তার থেকেও বেশি হচ্ছে জলবায়ু উদ্বাস্তু। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভবিষ্যতে ‘জলবায়ু উদ্বাস্তু’র সংখ্যা আরো বাড়বে। এর সঙ্গে মানুষের দেশান্তরী হওয়ার প্রবণতাও বাড়বে। সমুদ্র উপকূলবর্তী মানুষের উন্নত বিশ্বে মাইগ্রেশন করার হারও বাড়বে সামনের দিনগুলোতে। ফলে বিশ্বব্যাপী সব রাষ্ট্রকেই কম-বেশি নগরায়ণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
কোনো দেশের মোট জনসংখ্যার ১৫ থেকে ৬৪ বছরের মানুষদের ‘উত্পাদনশীল’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শিশু ও বৃদ্ধরা সাধারণত ‘উত্পাদনশীল’ অংশের ওপর নির্ভরশীল। যেসব দেশের মোট জনসংখ্যার তুলনায় ‘উত্পাদনশীল’ অংশের অনুপাত বেশি সেসব দেশের অর্থনীতি সাধারণত গতিশীল হয়ে থাকে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে, মানবসভ্যতা ক্রমশ বৃদ্ধ হচ্ছে। চিকিত্সা বিজ্ঞানের অভাবনীয় সাফল্যের ফলে মৃত্যুহার ক্রমশ হ্রাস পেয়েছে। গড় আয়ু বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে এটিও বড় একটি কারণ। ফলে মানবসভ্যতা আগামী দিনে তারুণ্য প্রাধান্য থেকে পরিবর্তিত হয়ে প্রবীণ প্রধান হওয়ার দিকে ধাবিত হবে। এর ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। প্রবীণদের দেখভাল করার জন্য রাষ্ট্রসমূহের প্রচুর সম্পদ ব্যয় করতে হবে। বিশেষ করে পেনশন, চিকিত্সা ও সামাজিক পরিষেবা নিশ্চিত করাই বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। বাজার ব্যবস্থায় দেখা যায়, তরুণেরা বিভিন্ন পরিষেবা ও বিলাসী পণ্য ব্যবহারে বেশি আগ্রহী হয়ে থাকে, ফলে তারুণ্য নির্ভর বাজার ব্যবস্থা অর্থনৈতিকভাবে গতিশীল হয়ে থাকে। আগামী দিনের অর্থনীতিতে ক্রেতা সম্প্রদায়ের এধরনের পরিবর্তনের ধাক্কা আসবে বেশ জোরেশোরেই।
২০৫০ সাল নাগাদ বৈশ্বিক গড় আয়ু দাঁড়াবে ৮৮ বছর। প্রবীণ প্রধান পৃথিবীতে ‘উত্পাদনশীল’ তরুণ জনগোষ্ঠীর সংকট দেখা দেবে অনেক দেশেই। উন্নত দেশগুলোতে এধরনের পরিস্থিতিতে সব থেকে বেশি সংকটাপন্ন হবে। তবে জনমিতির এধরনের প্রেক্ষাপটে ভিন্নতা দেখা দেবে অনেক দেশেই। ইউরোপ, আমেরিকা ও জাপান বার্ধক্যের ভারে নুয়ে পড়লেও চীন, ভারত বাংলাদেশসহ আফ্রিকান অনেক দেশের জনমিতিতে দেখা যাবে তারুণ্যের জয়গান। সম্প্র্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিল প্রকাশিত ‘গ্লোবাল ট্রেন্ড ২০৫০’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০৪০ সাল নাগাদ চীন ও ভারত যথাক্রমে বিশ্বের ১ম ও ৩য় অর্থনীতির দেশ হিসেবে জায়গা করে নেবে। এই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান হবে ২৮তম। মূলত তারুণ্য নির্ভর জনমিতির প্রতিফলন দেখা যাবে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে। বিশ্ব জুড়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বৈপ্লবিক পরিবর্তন এলেও ভবিষ্যত্ পৃথিবীতে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষের অনুপাত প্রায় অপরিবর্তিতই থাকবে। মানব সভ্যতায় শ্রেষ্ঠত্বের কাটা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। রোমান সভ্যতা প্রাচীন যুগে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়েছে, সময়ের সঙ্গে সেই নেতৃত্ব মধ্যপ্রাচ্য তথা ইসলামি সভ্যতার কাছে ধাবিত হয়। পরিশেষে বর্তমানে বিশ্ব সভ্যতার নেতৃত্ব এসে ধরা দিয়েছে ইউরোপ ও পশ্চিমা সভ্যতার কাছে। আজকের জনমিতি আভাস দিচ্ছে আগামী দিনের বিশ্বকে নেতৃত্ব দেবে চীন, ভারত ও বাংলাদেশের মতো এশিয়ার উদয়মান দেশগুলো। আগামীর পৃথিবীর জনমিতি আমাদের সামনে এই সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। সামনের কয়েক দশক জুড়ে বাংলাদেশ পাবে তারুণ্যনির্ভর জনমিতির সেই সুযোগ, যাকে বলা হচ্ছে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট। একটি জাতির ইতিহাসে জনসংখ্যার এই তারুণ্যনির্ভর সোনালি যুগ সাধারণত একবারই আসে, অতীতে যারা এই সুবর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পেরেছে তারাই আজ বিশ্বকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। জাতি হিসেবে আমাদের সামনেও সেই প্রতীক্ষিত মুহূর্ত উঁকি দিচ্ছে, যার সফলতা নির্ভর করবে আমাদের পরিকল্পনা, সুশাসন ও শুদ্ধাচারের ওপর।
n লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়