ঈদে গ্রামের বাড়ি গিয়ে মহামারির মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে ছোটাছুটি না করে যে যেখানে আছেন সেখানে থেকেই উত্সব উদ্যাপনের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল রবিবার গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের অবশিষ্ট মূল অধিবাসী ও সাধারণ ক্ষতিগ্রস্ত একহাজার ৪৪০ জনের মধ্যে প্লট বরাদ্দ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি এ আহ্বান জানান।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি জানি, ঈদের সময় মানুষ পাগল হয়ে গ্রামে ?ছুটছে। কিন্তু এই যে আপনারা একসঙ্গে যাচ্ছেন, এই চলার পথে ফেরিতে হোক, গাড়িতে হোক, যেখানে হোক, কার যে করোনা ভাইরাস আছে আপনি জানেন না। কিন্তু আপনি সেটা বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন আপনার পরিবারের কাছে। মা, বাবা, দাদা, দাদি, ভাই, বোন যেই থাকুক, আপনি কিন্তু তাকেও সংক্রমিত করবেন। তার জীবনটাও মৃত্যুর ঝুঁকিতে ফেলে দেবেন।’
দেশে করোনা ভাইরাসের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় এপ্রিল থেকে লকডাউনের বিধিনিষেধ জারি রেখেছে সরকার। এর মধ্যে দূরপাল্লার বাস বন্ধ থাকলেও ঈদে প্রিয়জনের কাছে ফেরার তীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়ে মানুষ শহর থেকে গ্রামে ছুটছে নানাভাবে। ঢাকা থেকে বিভিন্ন ছোট যানবাহন, এমনকি পণ্যের ট্রাক বা পিকআপে চড়ে ভেঙে ভেঙে মানুষ ছুটছে উত্তর ও দক্ষিণের বিভিন্ন জেলায়। গাদাগাদি করে তাদের পদ্মা পার হওয়া ঠেকাতে দিনের বেলায় ফেরি বন্ধ রেখে এবং বিজিবি মোতায়েন করেও কাজ হচ্ছে না।
মরিয়া এই যাত্রীদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, ‘একটা ঈদে কোথাও না গিয়ে নিজের ঘরে থাকলে কী ক্ষতিটা হয়? কাজেই আপনারা ছোটাছুটি না করে যে যেখানে আছেন, সেখানেই থাকেন। সেইখানে নিজের মতো করে ঈদটা উদ্যাপন করেন।’ দেশবাসীর উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আপনারা একটু ধৈর্য ধরেন, নিজের ভালো চিন্তা করেন। সাথে সাথে যার যার পরিবারের ভালোর চিন্তা করেন।’
মহামারিতে সারা বিশ্বেই যে মানুষের প্রাণহানি ঘটছে, সে কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে বলেন, ‘আমাদের প্রতিবেশী দেশে প্রতিনিয়ত মারা যাচ্ছে। এবং এই প্রতিবেশী দেশে যখন হয়, তখন খুব স্বাভাবিকভাবেই আমাদের দেশে আসারও একটা সম্ভাবনা থাকে। সেজন্য আগে থেকেই আমাদের নিজেদের সুরক্ষিত থাকতে হবে। নিজেদের সেভাবে চলতে হবে, যেন সবাই করোনা ভাইরাস থেকে বেঁচে থাকতে পারি।’
সবাইকে স্বাস্থ্যবিষয়ক নির্দেশনাগুলো মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘করোনা ভাইরাসের সময়ে আপনারা একটু মাস্ক পরে থাকবেন। সাবধানে থাকবেন। কারণ আবার নতুন আরেকটা ভাইরাস (করোনা ভাইরাসের নতুন ভ্যারিয়েন্ট) এসেছে, এটা আরো বেশি ক্ষতিকারক। যাকে ধরে, সাথে সাথে তার মৃত্যু হয়। সেই জন্য আপনি নিজে সুরক্ষিত থাকেন, অপরকে সুরক্ষা দেন।’
রাজধানীর অভিজাত এলাকায় বিশাল বিশাল অট্টালিকা থাকলেও নতুন গড়ে ওঠা পূর্বাচলে একটি প্লটের জন্য অনেকের মরিয়াভাবের কথা তুলে ধরে এর সমালোচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি অতিরিক্ত সম্পদ গড়ার মানসিকতা পরিহারের আহ্বান জানান।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘যাদের এত বিশাল বিশাল অট্টালিকা, বাড়িঘর, ফ্ল্যাট সবই আছে, তাদের আরো লাগবে কেন? মরলে তো সবাইকে যেতে হবে সেই কবরে, মাত্র তিন হাত-সাড়ে তিন হাত জায়গায়। এই ধনসম্পদ কেউ সাথে নিয়ে যেতে পারবে না। এই কথাটা মানুষ কেন ভুলে যায় আমি জানি না। আমরা শহর গড়ে তুলতে চাই। আমাদের দেশে যারা বিত্তশালী তারা প্লট কেনেন, ভালো ভালো দৃষ্টিনন্দন বাড়িঘর বানান। যখন পূর্বাচল শুরু হলো, তখন আমি দেখেছি... এমনকি গুলশান, বারিধারায় বিশাল বিশাল অট্টালিকাও যাদের, তাদেরও পূর্বাচলে একটা প্লট না থাকলে নাকি ইজ্জতই থাকে না। এই রকমও কিছু কিছু মানুষের মানসিকতা আমি দেখেছি।’
রবিবার যারা প্লটের বরাদ্দ পেলেন, তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কিন্তু যাদের সত্যিকার প্রাপ্য, আপনারা কিন্তু বঞ্চিত ছিলেন। কাজেই আমার সব সময় একটা প্রচেষ্টা ছিল যে, কীভাবে আপনাদের বঞ্চনার হাত থেকে মুক্তি দেব। আপনারা জমি দিয়েছেন অথচ প্লট পাবেন না, এটা হতে পারে না।’
তিনি বলেন, ‘আমি এইটুকু চাই, বাংলাদেশের একটি মানুষও গৃহহীন থাকবে না। যেইটুকু পারি, যেভাবে পারি একটা মানুষকে একটা ঘর, একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই সেটা আমরা করে দেব এবং প্রত্যেকটা ঘরেই বিদ্যুত্ থাকবে, আলো জ্বলবে। প্রতিটি পরিবারেই শিক্ষিত মানুষ থাকবে, লেখাপড়া শিখবে।’
যুবসমাজকে আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তোলার প্রত্যয়ের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘লেখাপড়া শুধু কেতাবি না, সাথে সাথে ভোকেশনাল ট্রেইনিং নিতে হবে, কারিগরি শিক্ষা নিতে হবে, যেন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়। শুধু বিএ, এমএ পাশ করলে হবে না, চাকরির পেছনে ঘুরলে হবে না। নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে, নিজেরা যেন চাকরি দিতে পারে সেভাবে নিজেদের কাজ করতে হবে। আমরা সেইভাবে এদেশের যুবসমাজকে গড়ে তুলতে চাই।’
অনুষ্ঠানস্থলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমদ অধিবাসী ও ক্ষতিগ্রস্তদের হাতে প্লটের বরাদ্দপত্র তুলে দেন।
ইতিমধ্যে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের মূল অধিবাসী ও সাধারণ ক্ষতিগ্রস্তদের ৬ হাজার ৪৪২টি প্লটের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনা বিরোধীদলীয় নেত্রী থাকা অবস্থায় মূল অধিবাসী ও সাধারণ ক্ষতিগ্রস্ত অন্যদের মধ্যে ১ হাজার ৪৪০টি প্লটের বরাদ্দ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, গতকাল সেটা পূরণ করলেন।