খালেদা জিয়ার বিদেশে যাওয়ার আবেদন নাকচ

করোনায় আক্রান্ত হয়ে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিত্সাধীন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিত্সার জন্য বিদেশে নেওয়ার অনুমতি চেয়ে পরিবার যে আবেদন করেছিল, তা নাকচ করে দিয়েছে সরকার। ‘ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারায় খালেদা জিয়ার আবেদন পুনর্বিবেচনা করে শর্ত শিথিল বা পরিবর্তন করে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিতে বিদেশে পাঠানোর কোনো সুযোগ নেই’—আইন মন্ত্রণালয়ের এমন মতামতের ভিত্তিতে গতকাল রবিবার আবেদনটি নাকচ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ফলে চিকিত্সার জন্য আপাতত দেশের বাইরে যেতে পারছেন না খালেদা জিয়া। তবে আইন মন্ত্রণালয় কিংবা আইনমন্ত্রীর মতামতকে ‘বেআইনি’ মন্তব্য করে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দণ্ডিত ব্যক্তি চিকিত্সার জন্য বিদেশে যেতে পারবেন না ৪০১ ধারায় এমন কোনো কথা বলা নেই।

খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম এস্কান্দার গত ৫ মে রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে দেখা করেন। তখনই তিনি পরিবারের পক্ষ থেকে খালেদা জিয়াকে চিকিত্সার জন্য বিদেশে নেওয়ার অনুমতি চেয়ে একটি আবেদন দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে। এ বিষয়ে আইনি মতামতের জন্য ঐ রাতেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবেদনটি পাঠিয়ে দেন আইন মন্ত্রণালয়ে। আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের মতামতসহ আবেদনটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পৌঁছায় গতকাল সকালে। মতামতে আইনমন্ত্রী উল্লেখ করেন, ‘ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারায় খালেদা জিয়ার সাজা ও দণ্ডাদেশ স্থগিত করে যে শর্তে তাকে সাময়িক মুক্তি দেওয়া হয়েছিল, তা শিথিল করে এখন তাকে বিদেশে যেতে দেওয়ার সুযোগ নেই।’

এরপর গতকাল দুপুরে সচিবালয়ে  নিজ দপ্তরে সংবাদ ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানিয়ে দেন, আইন অনুযায়ী দণ্ড মওকুফ করে খালেদা জিয়াকে বিদেশ পাঠানোর কোনো সুযোগ নেই। তিনি বলেন, এ বিষয়ে খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম এস্কান্দারের আবেদন আমরা মঞ্জুর করতে পারিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মানবিক কারণে ৪০১ ধারায় দণ্ড স্থগিত রেখে খালেদা জিয়াকে তার সুবিধা মতো চিকিত্সা নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তিনি বাসায় থেকে কিংবা সুবিধা মতো                 চিকিত্সা নিচ্ছেন। কয়েক দিন আগে করোনা আক্রান্ত হলে তিনি এভারকেয়ার হাসপাতালেও চিকিত্সা নিয়েছেন। এর মধ্যে তার ছোট ভাই শামীম এস্কান্দার আরেকটি আবেদন করেন বিদেশে নেওয়ার জন্য। সেটার আইনি দিকগুলো খতিয়ে দেখতে আমরা আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে ছিলাম। তারা মতামত দিয়েছেন, যে ধারায় তার দণ্ড স্থগিত রেখে চিকিত্সা-সুবিধা দেওয়া  হয়েছে সেটি পুনরায় বিবেচনা করে বিদেশে পাঠানোর সুযোগ নেই। আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত অনুযায়ী আমরা তাদের আবেদনটি মঞ্জুর করতে পারছি না।

তাহলে আপনারা বিষয়টিকে আর মানবিকভাবে দেখছেন না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মানবিক বিষয় দেখব বলেই তো আমরা আবেদনটি গ্রহণ করে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি, যে আইনের কোনো জায়গার মাধ্যমে তাকে সুযোগ দেওয়া যায় কি না। প্রচলিত আইন অনুযায়ী এখানে সুযোগ প্রদানের কোনো সুযোগ নেই। মানবিকতা দেখেই প্রধানমন্ত্রী  সাজা স্থগিত রেখে চিকিত্সাসেবা গ্রহণের সুযোগ দিয়েছিলেন। আরেক প্রশ্নের জবাবে আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, আমাদের আইন অনুযায়ী যেটুকু করণীয় সেটুকু করছি। বিএনপি আবেদন করতেই পারে, আমরা তো আইনের বাইরে কিছু করতে পারি না।

বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ আছে, সরকারের কারণে বেগম জিয়ার যথাযথ চিকিত্সা করা যাচ্ছে না। ভবিষ্যতেও যদি বিএনপি এমন অভিযোগ তোলে এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিএনপি কী অভিযোগ করল সেটা প্রশ্ন আসে না। আমাদের আইন অনুযায়ী যেটুকু করণীয় আমরা সেটুকু করছি। যেখানে মানবতার প্রশ্ন এসেছে সেটাও আমরা করেছি। বিএনপি আবেদন করতেই পারে। আইনের বাইরে তো আমরা কিছু করতে পারি না।

যে ব্যাখ্যা দিলেন আইনমন্ত্রী

খালেদা জিয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে করা আবেদনটি বিবেচনা না করার ক্ষেত্রে আইনি কী কী ব্যাখ্যা রয়েছে, আপনার মতামতের পক্ষে কী যুক্তি রয়েছে? ইত্তেফাকের এই প্রশ্নের জবাবে গতকাল সন্ধ্যায় আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘সব ব্যাখ্যা আমি দেব। আমি পরিষ্কারভাবে বলছি, গত বছরের মার্চে খালেদা জিয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে আমাদের কাছে একটি দরখাস্ত আসে। দরখাস্তে বলা হয়, খালেদা জিয়া অসুস্থ, তাকে মুক্তি দেওয়া হোক। খালেদা জিয়া তখন দুটি আদালত কর্তৃক সাজাপ্রাপ্ত। দরখাস্তেরও একটি আইনি কাঠামো প্রয়োজন। সরকারও কোনো আইন মোতাবেক এটা বিবেচনা করতে পারে সেটি দেখার দরকার হলো। কোনো আইনে সরকারকে এই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে কি না—সেটি আমরা দেখলাম। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারা অনুযায়ী সরকার চাইলে যে কোনো আসামিকে সাজা মওকুফ বা স্থগিত করে মুক্তি দিতে পারে। এক্ষেত্রে সরকার শর্তসাপেক্ষেও দিতে পারে, শর্তহীনভাবেও করতে পারে। সরকার তখন দুটি শর্ত দিয়েছিল খালেদা জিয়াকে।’

প্রসঙ্গত, দুর্নীতির মামলায় দণ্ড নিয়ে তিন বছর আগে কারাগারে যেতে হয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে। করোনার মহামারির ?শুরুতে পরিবারের আবেদনে সরকার তার দণ্ডের কার্যকারিতা স্থগিত করে গত বছরের ২৫ মার্চ সাময়িক মুক্তি দেয়। সে সময় শর্ত দেওয়া হয়, মুক্ত থাকার সময়ে খালেদা জিয়াকে ঢাকায় নিজের বাসায় থেকে চিকিত্সা নিতে হবে এবং তিনি বিদেশে যেতে পারবেন না।

আইনমন্ত্রী গতকাল ইত্তেফাককে আরো বলেন, ‘দুটো শর্ত মেনেই খালেদা জিয়া মুক্ত হয়েছিলেন। ৪০১ ধারায় যখন আমরা কার্য সম্পাদন করে ফেলেছি, পুনরায় সেটি বিবেচনা করে শর্ত শিথিল বা পরিবর্তনের ক্ষমতা সরকারের নেই। আর এখানে মানবিক বিষয়েরও কিছু নেই। সবসময় আইনের মধ্যে থেকেই তো সিদ্ধান্ত নিতে হয়।’

দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি বিদেশে যেতে পারবেন না, ৪০১ ধারায় এমন কিছু বলা নেই: খন্দকার মাহবুব

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় গতকাল গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিত্সার বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত বেআইনি। ৪০১ ধারায় কোথাও বলা হয়নি যে, দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি বিদেশে যেতে পারবে না। এ আইনটি করাই হয়েছে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের জন্য।’

খন্দকার মাহবুব বলেন, চিকিত্সা শেষে দেশে ফিরে আসতে হবে—সরকার নতুন করে এই শর্ত দিতে পারত। খালেদা জিয়া তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। তার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত জটিল। বিদেশে তার চিকিত্সা প্রয়োজন। সরকার মানবিকভাবে বিষয়টি দেখতে পারত। তার চিকিত্সার ব্যাপারে সরকারের নিজেরই বরং উদ্যোগ নেওয়া উচিত। বিদেশে যাবার অনুমতি না দিয়ে সরকারের এতবড় ঝুঁকি নেওয়া ঠিক হয়নি। কেননা আল্লাহ না করুন, যদি কোনো অঘটন ঘটে যায় তখন সম্পূর্ণ দায়ভার কিন্তু সরকারকেই নিতে হবে।

খন্দকার মাহবুবের বক্তব্যের জবাবে আইনমন্ত্রী যা বললেন

খালেদা জিয়ার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেনের বক্তব্যের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমি বলি একরকম, আর উনি (খন্দকার মাহবুব হোসেন) বলেন আরেকরকম। ওনার কথার কোনো যুক্তি নেই। একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে সরকার চাইলেই বিদেশে পাঠিয়ে দিতে পারে! বললেই হলো! আমার কথা পরিষ্কার, ৪০১ ধারায় খালেদা জিয়ার আবেদন পুনর্বিবেচনার সুযোগ নেই। উনি যে বললেন—বেআইনি, তাহলে আইনি কোনটা? যে দরখাস্ত ৪০১ ধারায় একবার নিষ্পত্তি করা হয়েছে, সেটি তো সরকার পুনরায় বিবেচনা করতে পারে না। আমার কথা পরিষ্কার, ৪০১ ধারায় দরখাস্ত পুনর্বিবেচনার কোনো সুযোগ নেই।’

আইনের কোথাও কী বলা আছে—সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে সরকার বিদেশে পাঠাতে পারবে না? প্রশ্নটির সরাসরি উত্তর চাইলে আইনমন্ত্রী পালটা প্রশ্ন করে বলেন, ‘কোন আইনে আছে যে—বিদেশে পাঠানোর অনুমতি দেওয়া যাবে? খালেদা জিয়াকে সাজা দিয়েছে আদালত। এখন সেই আদালতের সিদ্ধান্ত ছাড়া কীভাবে সরকার তাকে বিদেশে যাবার অনুমতি দেবে?’ আরেক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘বিদেশে পাঠানো না পাঠানোর বিষয়ে আমি কিছু বলিনি। আমি শুধু আইনের কথা বলেছি, আমার কথা পরিষ্কার।’

৪০১ ধারায় কী আছে

ফৌজদারী কার্যবিধির ৪০১ ধারায় (১) উপধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো ব?্যক্তি কোনো অপরাধের জন?্য দণ্ডিত হইলে সরকার যে কোনো সময় বিনা শর্তে বা দণ্ডিত ব?্যক্তি যাহা মানিয়া নেয় সেই শর্তে তাহার দণ্ড স্থগিত রাখিতে বা সম্পূর্ণ দণ্ড বা দণ্ডের অংশবিশেষ মওকুফ করিতে পারিবেন।’

সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ দুই দিন আগে ইত্তেফাককে বলেছেন, সরকার চাইলে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে মুক্তিও দিতে পারে। বিষয়টি তা নয়। কথা হচ্ছে—খালেদা জিয়ার মেডিক্যাল বোর্ড কি লিখিতভাবে সুপারিশ করেছে যে, তাকে চিকিত্সার জন্য বিদেশে নিতে হবে? আর একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামি সব ধরনের সুবিধা পাবেন না, সেটিও তো দেখা দরকার।

সরকার ভিত্তিহীন অজুহাত দাঁড় করিয়েছে: মির্জা ফখরুল

এদিকে, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল রাতে সাংবাদিকদের বলেছেন, চিকিত্সকরা বলছেন উন্নত চিকিত্সা না পেলে খালেদা জিয়ার জীবনের ঝুঁকি রয়েছে। তিনি বলেন, উন্নত চিকিত্সার জন্য বিদেশে নিতে তার পরিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে। কিন্তু সরকার সেই আবেদনে সাড়া না দিয়ে ভিত্তিহীন অজুহাত দাঁড় করিয়েছে।

তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার বিষয়ে সরকারের এই সিদ্ধান্তের কোনো ভিত্তি নেই। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির সাজা মওকুফ করে দেওয়ার নজির আছে। সরকার অসংখ্য নজির সৃষ্টি করেছে। রাজনৈতিক কারণে তিনবারের প্রধানমন্ত্রীর আবেদনে সরকার সাড়া দেয়নি। তিনি একজন রাজনৈতিক নেতা, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, এদেশের জন্য তার অবদান অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু তার চিকিত্সার জন্য আইনের দোহাই দিয়ে বিদেশে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে কারাগারে আছেন। মনে হচ্ছে সরকার তার বিষয়ে আন্তরিক নয়। এক প্রশ্নের জবাবে ফখরুল বলেন, আবেদন পার্টির পক্ষ থেকে করা হয়নি, আবেদন করেছে পরিবার। পরিবার সিদ্ধান্ত নেবে তারা কী করবেন।