প্রস্তুতি গ্রহণে কালবিলম্ব নহে

আইনের প্রয়োগের ব্যাপারে একটি বহুল প্রচলিত কথা আছে যে, এমন আইন বা নির্দেশ জারি করা উচিত নহে, যাহা পালন করা সম্ভবপর হয় না। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের দেশে এমন আইন অনেক রহিয়াছে এবং এমন নির্দেশও প্রায়শই দেওয়া হয়—যাহা বাস্তবিক অর্থে পালন করা সম্ভব হইয়া উঠে না। করোনার লাগাম টানিতে আগামী ১৬ মে অবধি লকডাউন বৃদ্ধি করা হইয়াছে। তবে লোকাল গাড়ি এবং অন্য সকল কিছু চালু করিয়া কেবল দূর পাল্লার গাড়ি বন্ধ রাখা হইয়াছে। সংশ্লিষ্টরা ভাবিয়াছেন, ইহাতে ঈদ উপলক্ষ্যে সাধারণ মানুষ হয়তো ঢাকা ছাড়িতে নিরুত্সাহিত হইবেন। কিন্তু কীসের কী! মানুষ দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাড়া বেশি দিয়া পথে-পথে ভাঙিয়া-ভাঙিয়া যাত্রা করিতেছেন। তাহারা হয়তো জন ডেনভারের ‘টেক মি হোম, কান্ট্রি রোডস’ গানটি শোনেন নাই, জন ডেনভারও জানেন নাই একটি গরিব দেশের গরিব মানুষ গ্রামের বাড়ি যাইতে কীভাবে মরিয়া হইয়া উঠিতে পারে। বিশেষ করিয়া নদী পাড়ি দেওয়ার জন্য তাহারা কীভাবে সামান্য সুযোগে ঝাঁক বাঁধিয়া বাঁধভাঙা স্রোতের মতো ফেরিতে উঠিতে পারে। কীসের করোনা ভাইরাস? কীসের সামাজিক দূরত্ব? ফেরি বন্ধ তাহাতে কী? লাশের গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্স পারাপারের সময় তাহারা হুড়মুড়াইয়া ফেরিতে উঠিয়া পড়িতেছেন। দিনের বেলা ফেরি বন্ধ করিয়াও লাভ হয় নাই। অবশেষে গতকাল বিআইডব্লিউটিসি কর্তৃপক্ষ ফেরির সংখ্যা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত লইয়াছে গরিব মানুষদের কষ্ট দেখিয়া।

বস্তুত, যাহারা প্রায় সকল কিছু খোলা রাখিয়া জনগণের আক্কেলের ওপর ‘সচেতনতার দায়িত্ব’ ছাড়িয়া দিয়া ভাবেন যে, জনগণ নিজ দায়িত্বে নিজ নিজ অবস্থানেই ‘অবস্থান’ করিবে এবং সামাজিক দূরত্ব মানিয়া চলিবে—তাহাদের আক্কেল লইয়াই প্রশ্ন তোলা যায়। আমাদের সমাজ হইতে এখনো আধা-সামান্তবাদের গন্ধ দূর হয় নাই। এইখানে আপামর জনগণের ‘সচেতনতা’র উপর ভরসা করাটা বিপজ্জনক বটে। শিয়রে শমনের মতো করোনা ভাইরাসের ভারতীয় স্ট্রেন ধরা পড়িয়াছে। কিন্তু সাধারণ জনগণ এতকিছু বোঝেন না। তাহারা করোনার বিপদ লইয়াও খুব বেশি মাথা ঘামায় না। এক শ্রেণির মানুষের সহিত কথা বলিয়া স্পষ্টভাবেই জানা যায়, তাহারা প্রায় সকলেই মনে করেন—করোনা ভাইরাস তাহাদের ধরে না। উহা বড়লোকদের রোগ। এই ‘মিথ’ তাহাদের ভিতরে একরকম গাঁথিয়া গিয়াছে। এখন তাহারা সহজাত রোগপ্রতিরোধ শক্তির কারণে কোভিডে আক্রান্ত না হইয়া কিংবা সামান্য আক্রান্ত হইয়া কেবল করোনার ‘সুপার স্প্রেডার’ হইয়া শহর হইতে গ্রামে ছড়াইয়া দিল—ইহা লইয়া তাহাদের মাথাব্যথা নাই। কিন্তু তাহাদের বিপদের গন্ধ পাইবার ক্ষমতা না থাকিলেও সরকারের তো রহিয়াছে।

এইদিকে গত সোমবার দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের একটি প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, করোনা ভাইরাস যদি বিশ্বের বেশির ভাগ অঞ্চলে তাহার অনিয়ন্ত্রিত সংক্রমণ অব্যাহত রাখে, তাহা হইলে তাহা স্থানীয় রোগে পরিণত হইবার পথে রহিয়াছে। তাহার অর্থ হইল, বিশ্বে করোনা ভাইরাসের হুমকি সব সময়ই থাকিবে। কেবল আশার কথা হইল, করোনা স্থানীয় রোগে পরিণত হইলে একসময় তাহা আর প্রাণঘাতী নাও থাকিতে পারে। ইহা তখন একটি সাধারণ ঠান্ডা রোগের মতো হইতে পারে। এই সবই সম্ভাবনার কথা। তবে অল্প কিছুদিন পর যদি সত্যিই ভারতীয় স্ট্রেন আমাদের মধ্যে ছড়াইয়া পড়ে এবং তাহা যদি ভারতের মতোই প্রলয়ঙ্কর অবস্থা সৃষ্টি করে, তবে তাহার জন্য আমাদের হাতে প্রস্তুতি গ্রহণের সময় খুবই কম। ভারত অপ্রস্তুত থাকিয়া যেই ভুল করিয়াছে সেই ভুল আমাদের করা যাইবে না। যেইটুকু সময় পাওয়া গিয়াছে, তাহার সবটুকু কাজে লাগাইতে হইবে ত্বরিত প্রস্তুতি গ্রহণের মাধ্যমে। কী ধরনের প্রস্তুতি লইতে হইবে, তাহা ভারতের বিপদ ও খামতি হইতেই সবচাইতে সহজে অনুধাবন করা যায়।