সময়ের ভাবনায় পথের পাঁচালী

সাহিত্য ও চলচ্চিত্র দুটি ভিন্ন শিল্পমাধ্যম। মাধ্যম দুটি নিজ নিজ বলয়ে সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত। সাহিত্য থেকে পৃথিবীতে অনেক চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। কিন্তু সাহিত্যের চলচ্চিত্র রূপায়ণ খুব সহজ কাজ নয়। এজন্য অনেকে ব্যর্থও হয়েছেন। সত্যজিত্ রায় তার চলচ্চিত্রের প্লট নির্বাচনে সাহিত্যের আশ্রয় নিয়েছেন বহুবার। নিজেও একজন ভালো কথাসাহিত্যিক ছিলেন। প্রত্যেক শিল্পের ধরন ও চাহিদা অনুযায়ী তার রূপের পরিবর্তন ঘটে। চলচ্চিত্রে দৃশ্য-শব্দ-সংগীত দিয়ে যেভাবে গল্প বলা যায়, উপন্যাসে সেভাবে যায় না।  উপন্যাসে বাক্য দিয়ে যত সহজে যে কোনো কিছু বলা যায়, চলচ্চিত্রে বলা যায় না। চলচ্চিত্রের বড় উপাদান সময়। সেটাকে ব্যবহার করে সত্যজিত্ রায় সাহিত্যের নির্যাসকে নিয়ে চলচ্চিত্র রূপায়ণ করেছেন।

সত্যজিত্ রায়ের প্রথম পরিচালিত ‘পথের পাঁচালী’ চলচ্চিত্রটি ১৯৫৫ সালে মুক্তি পায়। এটা সে সময় ভারতীয় উপমহাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ে সূচনা করে। একটি গ্রামীণ পরিবারের অভাবের মধ্যে টিকে থাকার লড়াই এবং এর মধ্য দিয়ে পরিবার ও সদস্যদের পারিপার্শ্বিক সম্পর্ক এই গল্পের মূল উপজীব্য। চলচ্চিত্রের প্রতিটি দৃশ্যে গ্রাম বাংলার প্রতিটি উপাদানকে প্রাণ দিয়েছেন নির্মাতা সত্যজিত্ রায়। প্রতিটি দৃশ্য যেন সে সময়ের পরিবেশ-পরিস্থিতির বাস্তব চিত্রায়ণ। শত অভাবেও দুর্গার পরিবার আনন্দ খুঁজে ফেরে। হরিহরের একদিন ভালো সময় ফিরবে—এ আশায় সর্বজয়াও বুক বাঁধে। অপুকে পাঠশালায় পাঠানোর জন্য মা-বোনের যে প্রস্তুতির দৃশ্য তা যেন ছোট ছেলের প্রতি স্নেহ-ভালোবাসা বাংলার সব পরিবারের দৃশ্য। চলচ্চিত্রে চিরায়ত গ্রামবাংলার দৃশ্য চোখে প্রশান্তি জোগায়। বাঁশবাগান, মেঠো পথ, ফসলের মাঠ, মাঠের মধ্য দিয়ে গরু চরানো দৃশ্যগুলো সে সময়ের বাংলার প্রামাণ্যচিত্র বলে মনে হয়। এছাড়াও অপুদের গৃহের কাঠামো বারবার মনে করিয়ে দেয় অভাবের সংসারকে। তবুও এ পরিবারের মানুষগুলো প্রকৃতিপ্রেমী। বিড়াল-কুকুর দিব্যি আশ্রয় পেয়েছে তাদের ঘরে। ইন্দিরা ঠাকরুনকে কর্মহীন মনে হলেও তিনি তার সাধ্য মতো গৃহের কাজে অবদান রাখতেন সেটি দুর্গাকে মালা চুরির অভিযোগের দৃশ্যের দৃশ্যায়ণে ফুটে উঠেছে। চুলার জ্বালানির জন্য হাতে নারিকেলগাছের ডালপালা আনতে দেখা যায়। এভাবেই দৃশ্যের ভেতর দৃশ্য সৃষ্টি করেছেন নির্মাতা পুরো চলচ্চিত্রে। ইন্দিরা ঠাকরুনের অন্ধকারে সুতা সুঁইয়ে ঢুকানোর চেষ্টা, মায়ের ভয়ে অপু উচ্চ স্বরে পাঠ্যবই পড়া, সর্বজয়ার কটু কথায় ঠাকুরুনের রাগ হলে হামানদিস্তায় জোরে আঘাত, ঠাকরুন প্রথমবার এবং শেষবার ভিটে ছেড়ে যাওয়ার আগে গাছে পানি দেওয়া সবকিছুই যেন আমাদের দৃশ্যের ভেতর অন্তর্নিহিত অর্থকেই ইঙ্গিত করে। ইন্দিরা ঠাকরুন শেষবার ভিটে থেকে চলে যাবার সময় লং শটে কুকুরকে উঠানে খেতে দেখা যায়। ঠাকরুন ফিরে তাকায় কুকুরের দিকে, একই সঙ্গে সর্বজয়ার দিকে। তার মন যেন বলছে এ গৃহে কুকুরের ঠাঁই মিলল কিন্তু তার মিলল না। ঠিক সেসময় অপু-দুর্গা ট্রেন দেখার অপেক্ষায়। অবশেষে ট্রেনের দেখা মিলল। কালো ধোঁয়া ছেড়ে তার আগমন। তার আগমন যেন নতুন সময়ের ইঙ্গিত। কালো ধোঁয়া যেন এই গ্রামকে গ্রাস করে ফেলবে। এই ট্রেন মানুষের মাইগ্রেশনের প্রতীক, যা এই অধ্যায়ের শেষে অপুদের গ্রাম ছাড়ার মধ্য দিয়ে দেখতে পায়। ট্রেনের আগমন হলো, অন্যদিকে ঠাকরুনের প্রাণ গেল। পরের সময়গুলো দ্রুত বদলাতে থাকে।

হরিহর কাজের খোঁজে গ্রাম ছাড়লেন। অশুভ আশঙ্কায় সর্বজয়ার দিন কাটে। রাতের ট্রেনের শব্দ টেনশন জাগায়। হরিহরের খোঁজ নাই, ঘরে চাল নাই। এজন্য সর্বজয়া বিয়ের উপহার বিক্রি করতে বাধ্য হয়। কিছুদিন পর, অল্পকালে বাড়ি ফিরবে জানিয়ে হরিহরের চিঠি আসে। চিঠি পেয়ে সর্বজয়া প্রাণ যেন ফিরে পেলেন। সেই প্রাণের প্রতীকী রূপ দেখি প্রকৃতির প্রাণের মধ্য দিয়ে। বৃষ্টিতে ভিজে  অসুস্থ হয়ে দুর্গার আকস্মিক মৃত্যু হয়। দুর্গার মৃত্যুর পর হরি ফিরে আসলে লং শট এ গরুটিকে দেখা যায়। মৃত্যুশোকে প্রাণীটির চোখেও কান্নার চিহ্ন। দুর্গার মৃত্যু অপুর জীবনকে বদলে দিল। অপু যেন শিশু অপু আর থাকল না, নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে পরিবারের দায়িত্বশীল পুরুষের মতো বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল। চলচ্চিত্রটির প্রতিটি ফ্রেমই নান্দনিক। শব্দ ও সংগীতের প্রয়োগ অন্যরকম মাত্রা দিয়েছে চলচ্চিত্রটিকে। ইন্দ্রাণী ঠাকরুনের মুখে ‘হরি দিন তো গেল, সন্ধ্যা হলো, পার করো আমারে’ গানটি যেন চলচ্চিত্র জুড়ে তার অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছে। অপুর পরিবার সব স্বপ্নভঙ্গের পর বাঁচার নতুর স্বপ্ন নিয়ে নতুন পথের সন্ধানে ছুটে।

চলচ্চিত্রটির দৃশ্যায়ন, চরিত্রায়ন, শব্দ, সংগীত সবকিছুর সুনিপুণ নির্মাণ নিয়ে মহাকাব্য রচনা করা সম্ভব।

n লেখক :শিক্ষার্থী, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

humayunshrabon@gmail.com