অতীতে বেতন-বোনাস নিয়ে শ্রম অসন্তোষের খবর শোনা গেলেও এবার ঈদের আগে শ্রম অসন্তোষ দেখা দিল ছুটিসংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে। সরকারি সিদ্ধান্তে তিন দিনের বেশি ছুটি দিতে না চাইলেও শ্রমিকদের দাবি সাত থেকে ১০ দিন ছুটি দেওয়ার জন্য। এ নিয়ে টঙ্গীতে হা-মীম গ্রুপের একটি কারখানায় গতকাল সোমবার রীতিমতো তুলকালাম কাণ্ড ঘটে গেছে। ছুটি বাড়ানোর দাবিতে শ্রমিকেরা কারখানার বাইরে বেরিয়ে এসে সড়ক অবরোধ ও গাড়ি ভাঙচুর করেন। পুলিশ তাতে বাধা দিলে দুই পক্ষে সংঘর্ষ হয়। এতে কয়েক জন পুলিশসহ ২৫ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া গাজীপুরে স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের একটি কারখানা, রাজধানীর মিরপুর-১৪ এলাকায় চারটি কারখানায় একই ইস্যুতে শ্রম অসন্তোষের খবর পাওয়া গেছে। এজন্য শ্রমিক ও মালিকপক্ষ পরস্পরকে দুষছে।
আমাদের টঙ্গী সংবাদদাতা জানান, গতকাল সকালে কারখানায় কাজে যোগ দিয়ে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ঈদুল ফিতরের সাত দিনের ছুটির পরিবর্তে ১০ দিনের ছুটির দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করেন শ্রমিকেরা। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা কারখানায় কাজ বন্ধ করে দিয়ে প্রধান ফটকে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন। পরে পুলিশ শ্রমিকদের বিক্ষোভে বাধা দিলে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। এ সময় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা প্রথমে কারখানায় ভাঙচুর চালান এবং পরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বেশ কয়েকটি যানবাহনে ভাঙচুর করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ বেশ কয়েক রাউন্ড রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল ছোড়ে। এতে অন্তত ২০ জন শ্রমিক আহত হন। অন্যদিকে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা পুলিশের ওপর হামলা চালালে শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জালাল উদ্দিন আহম্মেদ, গোয়েন্দা শাখার উপপরিদর্শক (এসআই) কামাল পাশা ও সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) রুবেল হাওলাদারসহ পাঁচ জন আহত হন। স্থানীয়রা আহতদের উদ্ধার করে টঙ্গীর শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখান থেকে গুরুতর আহত আট শ্রমিককে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
কারখানার শ্রমিকেরা জানান, কারখানায় ঈদ উপলক্ষ্যে সাত দিনের ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু শ্রমিকেরা ১০ দিনের ছুটির দাবি জানিয়ে আসছিলেন। তিন দিনের ছুটি বাড়ানো নিয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেও কোনো ফল পাননি শ্রমিকেরা। বাধ্য হয়েই আন্দোলনে নামেন তারা।
কারখানাটির সহকারী জেনারেল ম্যানেজার মিজানুর রহমান বলেন, শ্রমিকদের আন্দোলন অযৌক্তিক। প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদ উপলক্ষ্যে শ্রমিকদের সাত দিনের ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু শ্রমিকেরা অযৌক্তিকভাবে আন্দোলন চালিয়ে কারখানায় ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়েছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গতকাল সোমবার থেকেই কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জালাল উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ বেশ কয়েক রাউন্ড রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে।
শ্রমিকনেতা ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশ কাউন্সিলের (আইবিসি) সাবেক মহাসচিব তৌহিদুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, শ্রমিকেরা আগে বন্ধের দিনে কাজ করে ঈদের সময় বাড়তি ছুটি নিতেন। এবার ছুটি দেওয়া হচ্ছে না। অন্যান্য সেক্টরের শ্রমিকেরা বাড়ি গেলেও করোনার অজুহাতে গার্মেন্টস শ্রমিকদের যেতে ছুটি দেওয়া হচ্ছে না। এ কারণে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
এদিকে শ্রমিকদের আহত হওয়ার ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে বাংলাদেশ পোশাকশিল্প শ্রমিক ফেডারেশন, গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রসহ বিভিন্ন সংগঠন।
এ বিষয়ে পোশাক শিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি এস এম মান্নান কচি ইত্তেফাককে বলেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী এবং করোনা ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে তিন দিন ছুটির বিষয়টি মালিকপক্ষ কার্যকর করেছে। তবু বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিকদের চাপে তা কার্যকর করা যাচ্ছে না।