এ বছরের মার্চ মাসে উদ্যাপিত হলো স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং সেই সঙ্গে পালিত হলো জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী। এ উপলক্ষ্যে দক্ষিণ এশিয়ার পাঁচটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান/ সরকারপ্রধান বাংলাদেশ সফর করেন। প্রতিবেশী রাষ্ট্রনেতাদের এ সফরের মাধ্যমে অনেকগুলো সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।
শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপক্ষের ঢাকা সফরের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বিষয়ক ছয়টি সমঝোতা স্মারক সই হয়। এছাড়াও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি এবং অগ্রাধিকার বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ব্লু-ইকোনমি এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের আগ্রহ প্রকাশ করেন মাহিন্দা রাজাপক্ষে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো শ্রীলঙ্কা এবং বাংলাদেশের মধ্যে কোস্টাল শিপিং অ্যাগ্রিমেন্ট হতে যাচ্ছে। এ চুক্তি সম্পাদিত হলে কলম্বো বন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে ২৫ শতাংশ পরিবহন ব্যয় কমবে। বাংলাদেশ এবং পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে সমুদ্রপথে যে আমদানি-রপ্তানি হয় তার ৪ ভাগের ১ ভাগ কলম্বো বন্দরে ট্রানশিপমেন্ট হয়। আর ৪ ভাগের ৩ ভাগ ট্রানশিপমেন্ট হয় সিঙ্গাপুর এবং পোর্ট ক্লাঙ্কে। এ পর্যন্ত শ্রীলঙ্কা ৪০০ মিলিয়ন ডলার বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেছে।
মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহীম মোহাম্মদ সলিহ মার্চ মাসে ঢাকা সফরের মাধ্যমে চারটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। সমঝোতা স্মারকগুলো হচ্ছে : বাংলাদেশ-মালদ্বীপ যৌথ কমিশন গঠন (জেসিসি), পররাষ্ট্র পর্যায়ে নিয়মিত বৈঠক, সামুদ্রিক সম্পদ আহরণে সহায়তা এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় (২০২২-২৫)। সুখবর হলো—চট্টগ্রাম থেকে মালে সরাসরি শিপিং লাইন চালু হবে এবং সেই সঙ্গে ঢাকা-মালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস চলাচল শুরু করবে। দুই দেশের মধ্যে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি নিয়েও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। মালদ্বীপে কর্মরত ১ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিকের আইনি সহায়তা দিবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন ইব্রাহিম মোহাম্মদ সলিহ।
নেপালের রাষ্ট্রপতি বিদ্যাদেবী ভান্ডারি ঢাকায় অবস্থানকালীন সময়ে চারটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। নেপাল-বাংলাদেশের সম্পর্ক হলো ঐতিহাসিক সম্পর্ক। নেপাল এখন থেকে বাংলাদেশের আঞ্চলিক বিমানবন্দর নামে খ্যাত ‘সৈয়দপুর বিমান বন্দর’ ব্যবহার করতে পারবে। এছাড়াও বাংলাদেশের দুইটি প্রধান সমুদ্রবন্দর নেপাল ব্যবহার করতে পারবে। এর মাধ্যমে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক আগের চেয়ে কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যায়।
ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ডা. লোটে শেরিং-এর সফরের মধ্য দিয়ে ঢাকা-থিম্পু কূটনৈতিক সম্পর্ক আরো জোরদার হলো। ঐতিহাসিকভাবে ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বরাবরই ভালো। বাংলাদেশের সঙ্গে প্রথম অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি হয় ২০২০ সালে। এ চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের ১০০টি পণ্য ভুটানে এবং ভুটানের ৩৪টি পণ্য বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। এ সফরের মাধ্যমে লোটে শেরিং ঢাকা-থিম্পু সরাসরি বিমান চলাচলের জন্য প্রস্তাবনা দেয়।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দ্বিতীয় বারের মতো ঢাকা সফরে এসে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা অনেক বিষয় সমাধান করেছেন। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের পাঁচটি সমঝোতা স্মারক সই হয় এবং আটটি নতুন প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়। এর মধ্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, অভিযোজন ও প্রশমনের ক্ষেত্রে সহযোগিতা, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি) ও ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর অব ইন্ডিয়ার (আইএনসিসি) মধ্যে সহযোগিতা, বাণিজ্য বিকাশে অশুল্ক বাধা দূর করতে একটি সহযোগিতা ফ্রেমওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করা, বাংলাদেশ-ভারত ডিজিটাল সার্ভিস অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং (বিজিএসটি) সেন্টারের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি সরঞ্জাম, কোর্সওয়্যার ও রেফারেন্স বই সরবরাহ এবং প্রশিক্ষণ সহযোগিতা ও রাজশাহী কলেজ মাঠের উন্নয়নে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন। এছাড়াও বিএসটিআই ও ব্যুরো অব ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ডস (বিআইএস) এর মধ্যে নিবিড় সহযোগিতা সিদ্ধান্ত হয়েছে। ঢাকা-নিউ জলপাইগুড়ির মধ্যে ‘মিতালী এক্সপ্রেস’ নামে একটি ট্রেন চালু হলো এ সফরের মাধ্যমে। বিশেষ করে সার্ক, বিমসটেক, বিবিআইএন জোটভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে আন্তঃসড়ক স্থাপনে যৌথভাবে কাজ করবে প্রতিবেশী এ দুই দেশ। বাংলাদেশ থেকে পাটজাত পণ্য রপ্তানির ওপর ২০১৭ সাল থেকে ভারত কর্তৃক আরোপিত অ্যান্টি ডাম্পিং ডিউটিস প্রত্যাহারের অনুরোধ জানানো হয়েছে। বলা প্রয়োজন যে, বিগত ১০ বছরে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে ১০০-এর কাছাকাছি বা তার বেশি চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। ৬৮টি চুক্তি সই হয়েছে গত তিন বছরে। স্বাক্ষরিত হয়ে যাওয়া ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে ‘কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট’ (সিইপিএ) এবং ট্রান্সশিপমেন্ট চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে সামনের দিনে বাণিজ্য কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো—ভুটান এবং নেপালের সঙ্গে আন্তঃযোগাযোগের ক্ষেত্রে ভারতের সহযোগিতা অত্যাবশ্যক। কারণ ভারতের ওপর দিয়ে রেল এবং সড়ক পথ নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে সংযুক্ত হবে। যখন চিলাহাটি-হলদিবাড়ী যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল শুরু করবে তখন ভারতের মধ্য দিয়ে ভুটানে যাওয়া যাবে। এ ট্রেন রুট ব্যবহার করে ভুটানে পৌঁছানোর জন্য ভারতের অনুমতি লাগবে। এছাড়াও নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের যে ব্রডগেজ রেলপথ আছে তা ভারতের ওপর দিয়ে গেছে। প্রথম রেল-রুট রোহনপুর-জিরো পয়েন্ট-সিনগাবাদ (পশ্চিমবঙ্গ)-জগবানি (বিহার) বিরাটনগর (নেপাল)। এ রেল পথের দূরত্ব হলো ২১৭ কিলোমিটার। দীর্ঘ ৫১৭ কিলোমিটার দূরত্বের দ্বিতীয় রেল-রুট রোহনপুর-জিরো পয়েন্ট-বিরাল (পশ্চিমবঙ্গ)-রাধিকাপুর (পশ্চিমবঙ্গ) রক্সল (বিহার)-বীরগঞ্জ (নেপাল)। ২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ-ভারত রোহনপুর এবং সিনগাবাদ ব্রডগেজ রেলসংযোগ ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করার জন্য নেপাল অনুমতি দেয়। এরপর ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ও নেপালকে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে ভারত নতুন এই রেল-রুট ব্যবহারের অনুমতি দেয়। এ মুহূর্তে বাংলাদেশ, ভারত এবং ভুটান সম্মিলিতভাবে হাইড্রোপাওয়ার প্রকল্প স্থাপন করতে পারে। এছাড়াও, বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের যৌথ সহযোগিতায় নেপালের পানিসম্পদ ব্যবহার করে জলবিদ্যুত্ প্রকল্প করা যেতে পারে।
বাংলাদেশ যদি সমুদ্রের লুক্কায়িত সম্পদ আহরণ করতে পারে তাহলে প্রতি বছর ২৫০ মিলিয়ন ডলার আয় করা সম্ভব। সমুদ্রসম্পদ আহরণের মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট জিডিপির ৫ শতাংশ অর্জন করা সম্ভব। এ জন্য যত দ্রুত সম্ভব শ্রীলঙ্কা এবং মালদ্বীপের কাছ থেকে সমুদ্রসম্পদ আহরণের বিষয়ে অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে হবে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বহু বছর আগে স্বাক্ষরিত হওয়া কিছু চুক্তি এখনো বাস্তবায়ন করা হয়নি। আমরা আশা করব, বাংলাদেশের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার পাঁচটি দেশের সম্প্রতি সই হওয়া সমঝোতা স্মারকগুলো যেন দ্রুত বাস্তবায়িত হয়। এসব চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে। বিশ্বের এক-চতুর্থাংশ মানুষের বসবাস দক্ষিণ এশিয়ায়। এখানকার বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। এ সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য আঞ্চলিক নেতাদের আগ্রহ দরকার।
n লেখক :ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক