‘বাঙালির প্রাণ, বাঙালির মন’

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সম্মাননীয়া শেখ হাসিনার নিকট আমি কলকাতা থেকে এক বিশেষ আর্জি নিয়ে এ লেখাটি লিখছি। ১৯৪৭ সালে দেশভাগ হয়েছে। দেশভাগের পর উভয় বাংলার হাজার হাজার মানুষ তাদের ভিটেমাটি ছেড়ে অন্য বাংলায় চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। দেশভাগ নিয়ে অনেক গল্প-কবিতা-উপন্যাস আছে। আছে বিখ্যাত অনেক চলচ্চিত্র। উনিশ ও বিশ শতকে সারা বিশ্বের মানচিত্র সবচেয়ে বেশি বদলেছে। নিজ ভূমি ছেড়ে চলে আসার অভাবিত বিষাদ-বেদনা নিয়ে সারা বিশ্বেই রয়েছে কোটি কোটি মানুষ। বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ আধুনিক কবি জীবনানন্দ দাশ তার জন্মস্থান বরিশালের প্রতি তীব্র আকুতি জানিয়ে লিখেছেন— ‘তোমরা যেখানে সাধ চলে যাও—আমি এই বাংলার পারে র’য়ে যাব; দেখিব কাঁঠালপাতা ঝরিতেছে ভোরের বাতাসে; দেখিব খয়েরি ডানা শালিখের সন্ধ্যায় হিম হয়ে আসে...।’

মাননীয় প্রধান­মন্ত্রী, বয়স যত বাড়ছে, আমার দাদু (মায়ের বাবা) শ্রী প্রফুল্ল কমল সেনগুপ্ত ততই যেন জীবনানন্দের আকুতি নিয়ে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। আমার দাদুর আদি বাসস্থান ছিল বাংলাদেশের বরিশালের নলচিড়া গ্রামে। তার ছোটবেলার ১৬টি বছর ঐ গ্রামেই কেটেছে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় আমার দাদু ও তার পরিবার চোখের জলে ভিটেমাটি ছেড়ে কলকাতায় চলে আসতে বাধ্য হন। তারপর কেটে গেছে দীর্ঘ প্রায় ৭৪ বছর। এখন আমার দাদুর বয়স ৮৯ বছর। বার্ধক্যজনিত কারণে এখন তিনি অনেক কিছুই ভুলে যান, কিন্তু নলচিড়া গ্রামে কাটানো কৈশোরের সেই ১৬টি বছর তার স্মৃতির মণিকোঠায় আজো অমলিন হয়ে আছে। গ্রামের প্রতিটি রাস্তাঘাট, পুকুর, ডোবা, তার বাড়ির প্রতিটি গাছের বর্ণনা তিনি আজো নিখুঁতভাবে করেন। তার মুখে শুনেই নলচিড়া গ্রামের ছবি আমাদের চোখে জীবন্ত হয়ে ওঠে। আমার দাদু এখন জীবনের গোধূলিলগ্নে। তিনি এখন প্রায়ই বলেন, যেই মুহূর্তে তিনি চলে যাবেন সেই মুহূর্তেই তার আত্মা নলচিড়া গ্রামে ফিরে যাবে। সেই যে জীবনানন্দ দাশ ‘আবার আসিব ফিরে’ কবিতায় বলেছেন যে তিনি ধানসিঁড়িটির তীরে আবার ফিরে আসবেন। বরিশালের কার্তিকের নবান্নের দেশে আমার দাদুও যেন কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন চলে যাবেন। জন্মস্থান নলচিড়ার প্রতি দাদুর এই আকুতি আমাদের চোখ সজল করে তোলে।

আজকে আধুনিক প্রযুক্তির জোরে ইন্টারনেটের মাধ্যমে আমি দাদুকে তার গ্রামের, স্কুলের ছবি দেখাতে পেরেছি। কিন্তু ইচ্ছা থাকলেও তার বয়স ও শারীরিক অবস্থার কারণে আমাদের পক্ষে তাকে বাংলাদেশে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তার সঙ্গে কোভিডের অতিমারির দুর্বিষহ ঢেউ। অতি সম্প্রতি গত ২৮ ডিসেম্বর আমার দিদা (দাদুর স্ত্রী) শ্রীমতী পুষ্প সেনগুপ্ত পরলোকগত হয়েছেন। দীর্ঘ ৫৪ বছরের দাম্পত্য জীবনের অবসানে আমার দাদু এখন অত্যন্ত বিমর্ষ অবস্থায় দিন কাটান। ২০২১ সালের ২৪ মে দাদুর ৯০ বছর পূর্ণ হবে। সেই কারণে নাতনি হিসেবে আমি তার ৯০ বছরের জন্মদিনটিকে তার কাছে স্মরণীয় করে রাখতে চাই। তাই আমার দাদুর ফেলে আসা দেশের প্রধানমন্ত্রী তথা অভিভাবক হিসেবে আপনার কাছে আমার একটি আবদার আছে (হয়তো-বা আবদারটি বালখিল্য)। আপনার মতো ব্যস্ত মানুষের পক্ষে আমার মতো একটি সাধারণ মেয়ের এই আবদার রক্ষা করা কতটা সম্ভব, তা না ভেবেই আমি এই চিঠি আপনার কাছে পাঠাচ্ছি। আপনি যদি আমার দাদুকে তার ৯০ বছরের জন্মদিনে (২৪ মে) একটি শুভেচ্ছাবার্তা পাঠান, তাহলে সেটি তার কাছে তার হারিয়ে যাওয়া নলচিড়া গ্রামের মাটির সুবাস বয়ে নিয়ে আসবে।

আপনার শত ব্যস্ততার মধ্যেও আমার দাদুর ৯০তম জন্মদিনটিকে স্মরণীয় করে তুলতে আপনি যদি আমাকে এটুকু সাহায্য করেন, নাতনি হিসেবে আমি আপনার কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকব। আপনি আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম গ্রহণ করবেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘স্বদেশ’ কবিতার সুরে বলতে চাই—‘বাঙালির প্রাণ, বাঙালির মন,/ বাঙালির ঘরে যত ভাই বোন—এক হউক, এক হউক, এক হউক হে ভগবান।’ আমার দাদুর ঠিকানা :শ্রী প্রফুল্ল কমল সেনগুপ্ত, ৬৪/১/২১এ বেলগাছিয়া রোড, মিল্ক কলোনি, কলকাতা-৩৭, ভারত।

ইমেইল :meghnapal1811@gmail.com