ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা

সারা দেশে করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। যশোর জেনারেল হাসপাতালে ছয় জনের শরীরে এই ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হওয়ার পর এবার ঢাকায় ডিএনসিসি করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে ভারতফেরত দুই রোগীর শরীরে ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন হাসপাতালটির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসির উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘ভারত থেকে আসা দুজনের মধ্যে আমরা করোনা ভাইরাস পেয়েছি। তাদের আইসিইউতে রাখা হয়েছে এবং ভালো আছেন। তবে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট কি না, সেটা পরীক্ষা করা হচ্ছে। এছাড়া চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় মিজানুর রহমান নামের ভারতফেরত এক জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছেন। জানা গেছে, সীমান্ত বন্ধ থাকলেও অবৈধ পথে ভারত থেকে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ বাংলাদেশে আসছে। এ কারণেই সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট। এমন অবস্থার মধ্যে ঈদের ফিরতি যাত্রা বিলম্বিত করার সুপারিশ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। কমপক্ষে এক সপ্তাহ যে যেখানে আছেন তাকে সেখানে রাখতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী বরাবর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

করোনায় প্রতিবেশী ভারতের অবস্থা ভয়াবহ। মৃত্যু ও শনাক্তে নতুন নতুন রেকর্ড হচ্ছে প্রতিদিন। দেশটিতে এবারের পরিস্থিতির জন্য বিশেষভাবে দায়ী করা হচ্ছে কোভিডের ‘ডাবল’ বা ‘ট্রিপল মিউটেন্ট’ ভ্যারিয়েন্টকে। অত্যন্ত বিপজ্জনক সেই ধরন বাংলাদেশে যাতে আর আসতে না পারে, সে জন্য ভারতের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধের মেয়াদ আরো দুই সপ্তাহ বাড়ানো হয়েছে। তার পরও মানুষ আসছে ভারত থেকে। বাংলাদেশের বেশির ভাগ সীমান্ত ভারতের সঙ্গে। রাতের বেলায় বিনা বাধায় এসব স্থলপথ ও নৌসীমান্ত দিয়ে প্রচুর মানুষ ভারতে যাচ্ছে এবং ভারত থেকে দেশে আসছে, যাদের অনেকের শরীরে করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট থাকতে পারে। কেউ কেউ জ্বর, সর্দি, কাশিসহ করোনার উপসর্গ নিয়ে চিকিত্সাধীন রয়েছে। তবে কেউই কোয়ারেন্টাইনে থাকেনি। তাদের খবর কেউ রাখে না।       যারা বৈধ পথে আসছে, তাদের কোয়ারেন্টাইনে রাখা হচ্ছে। তবে হাসপাতাল থেকে রোগী পালানোর ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। যশোর জেনারেল হাসপাতাল থেকে আবারও ভারতফেরত এক করোনা রোগী পালিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার নিজেকে রোগীর স্বজন পরিচয় দিয়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যাওয়া এই রোগীকে ফিরিয়ে আনতে অভিযানে নেমেছে পুলিশ। এর আগে গত ২৩ ও ২৪ এপ্রিল এই হাসপাতাল থেকে ভারতফেরত সাত জনসহ মোট ১০ জন করোনা রোগী পালিয়ে যান। পরে অভিযান চালিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের ধরে ফেলে এবং হাসপাতালে ভর্তি করে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এ বি এম খুরশীদ আলম বলেন, লকডাউনের মধ্যে মানুষ যেভাবে স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে দলে দলে বাড়ি গেছে, একইভাবে ফিরে এলে তা ঝুঁকি বাড়াবে। লাখো মানুষ যাতে দেরি করে ঢাকায় ফেরে এমন সুপারিশ করে তিনি বলেন, ‘এই লকডাউনের মধ্যে আবার যদি লোকজন এভাবেই ফেরে, তাহলে এটা অবশ্যই বিপজ্জনক হবে। এ কারণে এই ফেরাটা যদি একটু বিলম্বিত করা যায় ভালো হয়। এছাড়া যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিয়ে তাদের ঢাকায় আনার ব্যবস্থা করা যায়, সেটাও বিবেচনা করা যেতে পারে।’

প্রসঙ্গত, দেশে চলমান বিধিনিষেধের মধ্যে দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকলেও ঈদের কয়েক দিন আগে থেকেই লাখো মানুষ যে যেভাবে পারে, সেভাবে গ্রামের বাড়ি গেছে। দূরপাল্লার বাস, ট্রেন, লঞ্চ বন্ধ থাকায় ঘরমুখী মানুষ ছোট ছোট যানবাহনে গাদাগাদি করে বাড়িতে গেছে। ফেরিতেও ছিল উপচে পড়া ভিড়। স্বাস্থ্যবিধির কোনো বালাই ছিল না কোথাও। স্বাস্থ্যবিধি না মেনে এভাবে ভ্রমণ, বিভিন্ন বিপণিবিতানে মানুষের ভিড়ের কারণে নতুন করে সংক্রমণ বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, এমনিতেই করোনায় মৃত্যু ও আক্রান্ত ঢাকায় সবচেয়ে বেশি। ঈদের আগে যেভাবে মানুষ গ্রামে গেছে, ঈদের পর যদি সেইভাবে ঢাকায় তারা ফেরে, তাহলে পরিস্থিতি হবে ভয়াবহ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিত্সক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, যেহেতু সরকার আরো সাত দিন লকডাউন ঘোষণা করেছে, তাই এটা সবার মেনে চলা উচিত। এই সাত দিন যে যেখানে আছে, তাকে সেখানেই থাকতে হবে। আর যদি ঈদের আগে যেভাবে মানুষ গ্রামে গেছে, একইভাবে আবার ঈদের পর ফিরে আসে, তাহলে ঢাকার অবস্থা হবে ভয়াবহ। করোনা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। তিনি বলেন, ‘বাস বন্ধ থাকায় ঈদের আগে মানুষ কীভাবে গ্রামে গেছে আমরা দেখেছি। তাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে বাস চলাচল করলে ঐ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে না।’

আইসিডিডিআর,বির জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ভাইরোলজি ল্যাবের প্রধান ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘এখনো ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট পাইনি। তবে জিনোম সিকোয়েন্স করছি। ঢাকায় আক্রান্তদের মধ্যে এখনো ৯৮ ভাগ আফ্রিকান ভ্যারিয়েন্ট।’ তিনি বলেন, সরকার লকডাউন আরো এক সপ্তাহ বাড়িয়েছে। এই লকডাউন মানলে তৃতীয় ঢেউ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। নইলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে।

সোসাইটি অব মেডিসিনের সাধারণ সম্পাদক ও মুগদা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর বলেন, ‘লকডাউন দেওয়ার সুফল আমরা পেয়েছি। দ্বিতীয় ঢেউ অনেকটা নিয়ন্ত্রণে। তবে আগামী এক সপ্তাহ লকডাউন পালন না করলে করোনার তৃতীয় ঢেউ আসতে পারে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগনিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. নাজমুল হক বলেন, ‘বাংলাদেশে করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্টের ছয় জন রোগীর তালিকা আছে। ঈদে বন্ধ ছিল। এখনো রিপোর্ট পাইনি।’ তিনি বলেন, সামনে এক সপ্তাহ শতভাগ লকডাউন মেনে চলতে হবে। যে যেখানে আছেন, তাকে সেখানেই থাকতে হবে। তিনি বলেন, সীমান্তে চিঠি দেওয়া হয়েছে। ভারত থেকে আসা মানুষদের সঠিকভাবে কোয়ারেন্টাইনে রাখতে বলা হয়েছে।

এদিকে দেশে যারা কোভিড-১৯ টিকা নিয়েছেন, তাদের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআর দেখেছে, প্রায় সবার দেহেই অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। অর্থাত্ টিকা গ্রহীতাদের পরবর্তী সময়ে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কমে গেল। যদিও টিকার ফলে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি কত দিন স্থায়ী হবে কিংবা করোনা ভাইরাসের পরিবর্তিত নানা রূপ টিকা ঠেকাতে পারবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয় বলে স্বাস্থ্যবিধি মানার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এক গবেষণায় আইইডিসিআর দেখেছে, অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার তৈরি কোভিশিল্ড টিকা নেওয়ার এক মাসের মধ্যে শরীরে ৯২ শতাংশ এবং দুই মাস পর ৯৭ শতাংশের অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। এছাড়া করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন এমন টিকা গ্রহীতাদের শরীরে চার গুণ অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। টিকা গ্রহীতাদের দেহে অ্যান্টিবডির উপস্থিতি পরীক্ষার ফল গত বুধবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে আইইডিসিআর।