বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটা বড় পরিবর্তন এসেছিল একাত্তরে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মধ্য দিয়ে। এদেশ থেকে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রস্থান আর অসাম্প্রদায়িক, জাতীয়তাবাদী রাজনীতি চর্চার সূচনাকাল ছিল এই সময়টা। তবে বলাই বাহুল্য, এর স্থায়িত্বকাল ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর এদেশে আবারও রাষ্ট্রযন্ত্রের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় ধর্মভিত্তিক রাজনীতির উত্থান ও বিকাশ। এরই ধারাবাহিকতায় এদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আরো দুটি মৌলিক পরিবর্তন লক্ষ্যণীয়। একটি রাজনীতির বাণিজ্যিকীকরণ, অন্যটি বিরাজনীতিকরণ। কার্যত পরিস্থিতি এতটাই জটিল ও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে এই অশুভ রাজনীতির খপ্পর থেকে এখন আর কেউই মুক্ত নন, এমনকি যারা এই অশুভ ধারার ধারক তারাও নন।
সম্প্রতি দৈনিক ইত্তেফাকে একটি খবর ছাপা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের কমিটি অন ফরেন অ্যাফেয়ার্সের চেয়ারম্যান কংগ্রেসম্যান গ্রেগরি মিক্স বলেছেন, তার সরকার চায় বাংলাদেশ উন্নয়নের সব ক্ষেত্রে এগিয়ে যাক, কিন্তু তিনি বাংলাদেশের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে চিন্তিত। বলা বাহুল্য, এমন মন্তব্য আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর শামিল। আর পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে ক্যাপিটল হিলে কিংবা তারও আগে শিকাগোতে আমরা যে ঘটনাপ্রবাহ প্রত্যক্ষ করেছি, তার পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন কোনো কংগ্রেসম্যানের কাছ থেকে নির্বাচন আর গণতন্ত্র নিয়ে অন্তত এই মুহূর্তে আমাদের শিক্ষণীয় কিছু নেই।
কংগ্রেসম্যান মিক্স এই মন্তব্য করেছেন নিউ ইয়র্কের বাংলাদেশি অধ্যুষিত জ্যাকসন হাইটসে একটি ফান্ড রেইজিং অনুষ্ঠানে। আমেরিকা বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির ব্যানারে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তা মূলত আমেরিকা বিএনপি। সেখানে আমেরিকা বিএনপির সাবেক সভাপতিসহ বেশ কিছু স্থানীয় নেতাও উপস্থিত ছিলেন। জনগণকে আস্থায় না নিয়ে বরং আগুনসন্ত্রাসের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় বিমুখ করা আর বিদেশিদের কাছে নালিশি রাজনীতির চর্চা বিএনপির জন্য নতুন কিছু নয়। এটি সেই চর্চারই ধারাবাহিকতা মাত্র। এ নিয়ে নতুন করে অবাক হওয়ার বা লেখারও কিছু নেই। তার পরও এই লেখায় ঘটনাটার উল্লেখ প্রাসঙ্গিকতার তাগিদেই। বাংলাদেশের রাজনীতিতে পঁচাত্তর-পরবর্তী বিরাজনীতিকরণ বিএনপির হাত ধরেই। আর আজ সেই বিএনপিই বিরাজনীতিকরণ প্রক্রিয়ার শিকার হয়ে রাজনৈতিকভাবে যে কতটা দেউলিয়া হয়ে পড়েছে, এ ঘটনা তার ছোট্ট আরেকটি উদাহরণ মাত্র।
সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জে একটি আলোচিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। একজন ধর্মাশ্রয়ী রাজনৈতিক নেতার দ্বিতীয় স্ত্রী নেতার বিরুদ্ধে, তার অর্থনৈতিক ও সামাজিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ এনেছেন। মুখে অরাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃত্বের দাবিদার হলেও এই নেতার রাজনৈতিক পরিচয় আমরা সবাই অবগত আছি। তার প্রয়াত পিতার নেতৃত্বাধীন নেজামে ইসলামের ভূমিকা একাত্তরের জামায়াতে ইসলামীর চেয়ে ভালো কিছু ছিল না। তাদের সংগঠিত মুজাহিদ বাহিনী একাত্তরে রাজাকার-আলবদর-আলশামস বাহিনীর মতোই একইভাবে বাঙালি নিধনে মত্ত হয়েছিল। সেই অসুস্থ, সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ধারক আজকের এই ধর্ম ব্যবসায়ী নেতা তার পিতার সূচিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির গড্ডালিকা প্রবাহে এমনভাবে গা ভাসিয়েছেন যে এমনকি তার ব্যক্তিগত জীবনেও এখন ধর্মের লেশমাত্র অবশিষ্ট নেই।
এই যে নতুন সংস্কৃতির রাজনীতি, এ থেকে রাজনীতির সংস্কৃতিকে উদ্ধার না করতে পারলে সামনের যে উন্নত বাংলাদেশ তার গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা যে কোনো দিন, এমনকি ২০০ বছর পরেও যে মুখ থুবড়ে পড়তে পারে, তার উদাহরণ তো আমরা এই সেদিনই ওয়াশিংটনের ক্যাপিটল হিলে দেখলাম। তবে রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে সংস্কারের এই কাজটা শুধু সরকার কিংবা রাজনৈতিক দলের একার নয়। এক্ষেত্রে সিভিল সোসাইটির ভূমিকাও অনস্বীকার্য। বিষয়টি সবচেয়ে ভালো জানতেন বঙ্গবন্ধু। যে কারণে সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনগুলো সব সময় তার নিঃশর্ত প্রশ্রয় পেয়েছে। এমনকি একাত্তরেও আমরা এর উদাহরণ দেখেছি। রাজনৈতিক আর সামরিক ফ্রন্টের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও এ সময় আমরা একইভাবে সক্রিয় ছিলাম। তারেক মাসুদ ও লিয়ার লেভিনের ‘মুক্তির গান’ আর একাত্তরের সাড়া জাগানো নাটক ‘জল্লাদের দরবার’-এর কথা নিশ্চয়ই আজ নতুন করে মনে করিয়ে দেওয়ার কিছু নেই। যেমন দরকার নেই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কালজয়ী গানগুলো আর চমরপত্রের স্মৃতি সামনে নিয়ে এসে এই কথার যৌক্তিকতা প্রমাণেরও। কাজেই আমরা যদি সত্যি সত্যি এখনকার চলমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেড়িয়ে আসতে চাই, তাহলে আমরা যারা সিভিল সোসাইটির অংশীদার, আমাদেরও নিজেদের প্রশ্ন করতে হবে যে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিটাকে শুদ্ধ করার জন্য আমরা আমাদের কাজ কতটুকু করছি।
n লেখক :চেয়ারম্যান, লিভার বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং সদস্যসচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ