নারদা স্ট্রিং অপারেশন-কাণ্ডে উত্তপ্ত পশ্চিমবঙ্গ। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির মন্ত্রিসভার দুই মন্ত্রী সুব্রত মুখার্জি, ফিরহাদ হাকিমসহ চার জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সন্ধ্যায় জামিন দেওয়া হলেও রাতেই আবার হাইকোর্ট জামিনে স্থগিতাদেশ দেয়। ফলে তারা মুক্তি পাচ্ছেন না। বুধবার পর্যন্ত জেলে থাকতে হবে। এরই মধ্যে মমতা ব্যানার্জিকে এক হাত নিয়েছেন রাজ্যপাল জগদীপ ধনকড়। তিনি মমতা ব্যানার্জিকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, নৈরাজ্য ও সাংবিধানিক ব্যর্থতার ফল কী হয় তা দেখতেই পাচ্ছেন। জানা গেছে, এসব নেতাকে গ্রেফতারে অনুমোদন দিয়েছিলেন রাজ্যপালই। এই অনুমোদন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে তৃণমূল কংগ্রেস। দলের নেতাদের গ্রেফতারে অবস্থান ধর্মঘটও পালন করেন মমতা ব্যানার্জি।
জামিন নিয়ে নাটকীয় পরিস্থিতি : গতকাল সকালে পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েতমন্ত্রী সুব্রত মুখার্জি, কামারহাটির এমএলএ মদন মিত্র এবং কলকাতা পৌরসভার সাবেক মেয়র ও বিজেপির নেতা শোভন চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি পৌঁছে যান সিবিআইয়ের অফিসাররা। প্রায় একই সময়ে কেন্দ্রীয় বাহিনী ঘিরে ফেলে পশ্চিমবঙ্গের পরিবহনমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমের বাড়ি। সেখানেও পৌঁছে যান সিবিআইয়ের কর্মকর্তারা। জানানো হয়, তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। পরে নিজাম প্যালেসে নিয়ে গিয়ে চার জনকেই গ্রেফতার করা হয়। এরপরই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ফিরহাদ হাকিমের বাড়ি হয়ে সকালেই সিবিআইয়ের কলকাতা সদর দপ্তর নিজাম প্যালেসের ১৫ তলায় সংস্থাটির ডিআইজির ঘরে যান। তারপর থেকে তিনি টানা ৬ ঘণ্টা সেখানেই ছিলেন। নিজেকেই গ্রেফতারের দাবি জানান মমতা। নিজাম প্যালেসে ইট ছোড়া হয় বলে অভিযোগ। দিনভর উত্তেজনার পর সন্ধ্যায় তাদের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেয় সিবিআইয়ের বিশেষ আদালত। তবে বিশেষ সিবিআই আদালত অন্তর্বর্তী জামিনের আবেদন মঞ্জুর করলেও রাতেই তা স্থগিত করে দেয় কলকাতা হাইকোর্ট। আগামী বুধবার এই মামলার পরবর্তী শুনানি হবে। ততদিন পর্যন্ত মুক্তি পাবেন না ফিরহাদ, সুব্রত, মদন এবং শোভন। তাদের বিচার বিভাগীয় হেফাজতে রাখা হবে প্রেসিডেন্সি জেলে। পাঁচ চিকিত্সকের একটি দল নিজাম প্যালেসে আটককৃতদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেছে।
বস্তুত বিশেষ সিবিআই আদালত জামিনে মুক্তির নির্দেশ দেওয়ার পরেও চার নেতাকে মুক্তি দেয়নি সিবিআই। তাদের নিজাম প্যালেসে হেফাজতে রেখেই বিশেষ সিবিআই আদালতের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। পাশাপাশি হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি রাজেশ বিন্দল এবং বিচারপতি অরিজিত্ ব্যানার্জির বেঞ্চে নারদা মামলা পশ্চিমবঙ্গের বাইরে সরানোরও আবেদন জানানো হয়। তাদের এই গ্রেফতারকে কেন্দ্র করে দিনভর উত্তপ্ত ছিল পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি। প্রতিবাদে কলকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় ধর্মঘটে বসেন তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মী-সমর্থকেরা।
মমতাকে আইনের শাসনের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন রাজ্যপাল
মমতা ব্যানার্জির উদ্দেশে গতকাল এক টুইটার বার্তায় পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল জগদীপ ধনকড় বলেন, ‘নৈরাজ্য ও সাংবিধানিক ব্যর্থতার ফল কী হয়, তা নিশ্চয় দেখতেই পাচ্ছেন। মুখ্যমন্ত্রীকে আমি বলব, দয়া করে সংবিধান এবং আইন মেনে চলুন। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে অনুরোধ করব পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ, কলকাতা পুলিশ এবং রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তরকেও। এটা খুবই দুঃখজনক বিষয় যে, পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে দেখেও প্রশাসন এখনো কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।’
বিজেপির বিরুদ্ধে প্রতিহিংসার রাজনীতির অভিযোগ
মন্ত্রী ও নেতাদের গ্রেফতারে বিজেপির প্রতিহিংসার রাজনীতি রয়েছে বলে অভিযোগ করেছে তৃণমূল কংগ্রেস। একই মত সিপিএম এবং জাতীয় কংগ্রেসেরও। তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ, একই ঘটনায় তৃণমূল থেকে বিজেপিতে যোগ দেওয়া মুকুল রায় ও শুভেন্দু অধিকারীর নাম থাকা সত্ত্বেও তাদের ছাড় দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, কলকাতার সাবেক মেয়র শোভন চ্যাটার্জি গত বছর তৃণমূল কংগ্রেস থেকে বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন।
মন্ত্রীকে গ্রেফতার, আইন কী বলে??
সিবিআই সূত্রে জানানো হয়, এই গ্রেফতারের বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল জগদীপ ধনকড় অনুমোদন দিয়েছেন। এ নিয়ে প্রশ্ন তোলে তৃণমূল কংগ্রেস। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার স্পিকার বিমান ব্যানার্জি বলেন, তাকে না জানিয়ে গ্রেফতার করা হয়েছে, যা অবৈধ। এ প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইন বলছে, এমপিদের গ্রেফতারের ক্ষেত্রে লোকসভা বা রাজ্যসভার স্পিকারকে জানাতে হয়। এমএলএদের ক্ষেত্রে জানাতে হয় সংশ্লিষ্ট রাজ্যের বিধানসভার স্পিকারকে। তবে আগে জানিয়ে অনুমতি নিতে হবে এমনটা নয়। গ্রেফতারের পরও জানানো যেতে পারে। রাজ্যপাল অনুমোদন দিয়েছিলেন ৭ মে। তখন পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস তৃতীয় বারের মতো জয়ের পর মমতা ব্যানার্জি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেও বিধানসভায় নতুন স্পিকার নির্বাচিত হননি। মন্ত্রী, বিধায়কেরা শপথ না নেওয়ায় সরকার গঠন হয়নি। সরকার গঠন না হওয়া পর্যন্ত রাজ্যের প্রশাসকপ্রধান রাজ্যপাল। সেই হিসেবেই পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল জগদীপ ধনকড় এই চার জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট তৈরির অনুমতি দিয়েছিলেন। সেই অনুযায়ী চার্জশিট তৈরির পর ঐ চার জনকে গ্রেফতার করা হয়।
নারদা স্ট্রিং অপারেশন-কাণ্ড
২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে ম্যাথু স্যামুয়েলের সংস্থা স্ট্রিং অপারেশন করে। সেই অপারেশনের নাম ছিল ‘নারদা’। অপারেশনের ফল প্রকাশ্যে আসে ২০১৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের আগে। সেই ভিডিও প্রকাশ্যে আসায় হইচই শুরু হয়। সেখানে মুকুল রায় (তত্কালীন রাজ্যসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের এমপি, এখন বিজেপিতে), মদন মিত্র (তত্কালীন মন্ত্রী, পশ্চিমবঙ্গ সরকার), সুলতান আহমেদ (তত্কালীন এমপি, লোকসভা), ইকবাল আহমেদ (তত্কালীন এমএলএ), ফিরহাদ হাকিম (তত্কালীন মন্ত্রী, পশ্চিমবঙ্গ সরকার), সৌগত রায় (এমপি), কাকলি ঘোষ দস্তিদার (এমপি), প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় (এমপি), শুভেন্দু অধিকারী, (তত্কালীন পরিবহনমন্ত্রী, পশ্চিমবঙ্গ সরকার, এখন বিজেপির এমএলএ), শোভন চট্টোপাধ্যায়, তত্কালীন মন্ত্রী পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং কলকাতা পৌরসভার মেয়র, এখন বিজেপি নেতা), সুব্রত মুখার্জি (তত্কালীন মন্ত্রী, পশ্চিমবঙ্গ সরকার), অপরূপা পোদ্দার (তৃণমূলের এমপি) এবং পুলিশ অফিসার এম এইচ আহমেদ মির্জা ঘুষ নিচ্ছেন বলে ভিডিওতে ধারণ করা হয় এমন অভিযোগ ওঠে। প্রথমে তদন্ত করছিল এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চ। পরে দায়িত্ব নেয় সিবিআই।
ম্যাথু স্যামুয়েলের প্রতিক্রিয়া
ম্যাথু স্যামুয়েল বলেন, ঘটনার যথাযথ তদন্ত হচ্ছে, তাতে তিনি খুশি। কিন্তু একই ঘটনায় শুভেন্দু অধিকারী এবং মুকুল রায়ও জড়িত ছিলেন। তাদের কেন গ্রেফতার করা হলো না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, সবার ক্ষেত্রে একইভাবে বিচার হওয়া উচিত।