ঈদের শুভেচ্ছাবাণী নিয়েও রাজনীতি

ঈদের শুভেচ্ছা ও উপহার পাঠানো নিয়ে একটা অহেতুক হইচই সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে বিএনপি। বেগম খালেদা জিয়াকে দ্রুত আরোগ্য লাভের কামনা জানিয়ে ঢাকায় অবস্থিত বিদেশের দূতাবাসগুলো থেকে ঈদের শুভেচ্ছা জানানোসহ কোনো কোনো দেশ কিছু উপহার পাঠিয়েছে। এটা একটা অরাজনৈতিক শিষ্টাচার। বেগম খালেদা বাংলাদেশের তিন-তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। তার দেহে বিভিন্ন রোগসহ করোনা সংক্রমনের আশঙ্কার কথা জোরেশোরে প্রচারিত হওয়ার পর আমেরিকা, ভারত, চীন, রাশিয়া, পাকিস্তান প্রভৃতি দেশ তার আরোগ্য কামনা করবে এবং বেগম জিয়াকে তা জানাবে, তাতে অস্বাভাবিক কিছু নেই। আমাদের প্রধানমন্ত্রীরও উচিত ছিল বেগম জিয়ার দ্রুত আরোগ্য কামনা করে শুভেচ্ছা বাণীসহ ঈদের তোহ্ফা পাঠানো। তাতে বিএনপির প্রচারযন্ত্রটা ভোঁতা হতো।

বিভিন্ন দেশ কর্তৃক বেগম জিয়ার দ্রুত রোগমুক্তি কামনা করে শুভেচ্ছা ও উপহার পাঠানো স্বাভাবিক। অস্বাভাবিক হলো এটা নিয়ে বিএনপির নেতাদের রাজনীতি ও প্রোপাগান্ডা। বিএনপির কোনো কোনো কেন্দ্রীয় নেতা এমন হাবভাব দেখাচ্ছেন, যেন বিশ্বের ছোট-বড় দেশ বেগম জিয়াকেই ক্ষমতায় দেখতে চায় এবং আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতায় থাকার দিন শেষ। বিলাতে এই প্রচারণাটি আরো জোরদার। কারণ, দলের ভারপ্রাপ্ত নেতা তারেক রহমান লন্ডনে বসবাস করার ফলে লন্ডন এখন বিএনপির কেন্দ্রীয় হেডকোয়ার্টার।

এই হেডকোয়ার্টারের নেতাদের আনন্দ-স্ফূর্তির অন্ত নেই। পারলে তারা লন্ডনে বিজয় দিবস পালন করে। এরকম বিজয়-ফুর্তি তাদের মধ্যে দেখা গিয়েছিল ভারতে বিজেপি নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর। বিজেপি একটি ধর্মীয় জাতীয়তাভিত্তিক দল। বাংলাদেশের বিএনপিও তাই। এদিকে তারেক রহমান নরেন্দ্র মোদিকে আবার চাচা ডেকেছেন। সব দিক মিলিয়ে বিএনপি আশা করেছিল, নরেন্দ্র মোদি হাসিনা সরকারকে আর সমর্থন না জানিয়ে বিএনপিকে সমর্থন জানাবে। যেমন, বিজেপির অটল বিহারী সরকার বাংলাদেশে ২০০১ সালের নির্বাচনের সময় ঝুঁকেছিলেন খালেদা জিয়ার দিকে।

সেবার বিএনপি ও তারেক রহমান বিজেপিকে তাদের সমর্থনের বিনিময়ে ভারতের জন্য অনেক কিছু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তার মধ্যে বাংলাদেশের স্বার্থ ও অধিকার ক্ষুণ্ন হয়, এমন বিষয়ও ছিল। ক্ষমতায় গিয়ে বিএনপি এসব প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা দূরের কথা, পাকিস্তানের সঙ্গে গা ঢলাঢলি শুরু করে। বিএনপি বিশ্বাস হারায় বিজেপি নেতাদের।

এই বিশ্বাস বিএনপি আর ফিরে পায়নি। তবু নরেন্দ্র মোদির নির্বাচন বিজয়ে ঢাকায় উত্সব করেছিল বিএনপি। খালেদা জিয়ার মুখে অনেককাল পর শোনা গিয়েছিল, ভারত সম্পর্কে নরম নরম কথা। কিন্তু নরেন্দ্র মোদির মন গলাতে পারেননি খালেদা জিয়া। নরেন্দ্র মোদি সেই যে হাসিনা সরকারের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার হাত মিলিয়েছেন, সে হাত আর ফিরিয়ে নেননি। আওয়ামী শাসনের এই দীর্ঘ কয়েক বছরে বিএনপিকে শুধু শূন্য হাত কচলাতে হয়েছে।

ঢাকার বিদেশি দূতাবাসগুলো রুগ্ণ খালেদা জিয়ার আরোগ্য কামনা করে যে শুভেচ্ছা বাণী পাঠিয়েছেন, তাতেও অতি আশাবাদী হয়ে বিএনপি এখনই যদি নাচতে শুরু করেন, তাহলে পরিণামে এবারেও তাদের হাত কচলাতে হবে। বিদেশি দূতাবাসগুলোর মধ্যে পাকিস্তান বিএনপির শুধু বন্ধু নয়, পৃষ্ঠপোষকও। খালেদা জিয়াকে তাদের শুভেচ্ছা বাণী পাঠানো, উপহার পাঠানোর মধ্যে অন্য ইচ্ছা থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু সেই ইচ্ছা যে পূরণ হবে না, এটা দেশটির সামরিক জান্তা জানে।

শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর পাকিস্তানের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ আমন্ত্রণ জানিয়ে খালেদা জিয়াকে পাকিস্তানে নিয়েছিলেন এবং তাকে বিপুল সংবর্ধনা জানিয়েছিলেন। পাকিস্তানের সরকার-সমর্থক মিডিয়ায় বলা হয়েছিল, খালেদা জিয়াকে পাকিস্তান তখন ‘প্রধানমন্ত্রীসুলভ’ সংবর্ধনা জানিয়েছে। পাকিস্তান সরকার তাকে সংবর্ধনা জানাতে গিয়ে আশা ব্যক্ত করেছে, খালেদা জিয়া শিগিগই আবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পদে বসতে যাচ্ছেন।

এই আশা পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী এজন্যই তখন পোষণ করছিল, তাদের ইনটেলিজেন্স সার্ভিসের বিভিন্ন মেকানিজমের ও কৌশলের সাহায্য নিয়ে বিএনপি একাধিকবার যেভাবে নির্বাচনে জিতেছে, নিকট ভবিষ্যতেও তেমনি জিতবে। অর্থাত্ দলটিকে জেতানো হবে। কিন্তু পাকিস্তান গোয়েন্দা সংস্থা তখন বুঝতে পারেননি, তারা নির্বাচন জেতার জন্য খালেদা জিয়াকে যে মেকানিজমটি শিখিয়েছিলেন, সেই মেকানিজমের কথা শেখ হাসিনা জেনে গেছেন।

চাণক্য বলেছেন, ‘তুমি যদি শত্রুপক্ষের কৌশলটির কথা আগেই জেনে গিয়ে সেই কৌশলটি শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করতে পারো, তাহলে যুদ্ধে তোমার জয় অনিবার্য।’ শেখ হাসিনা এই চাণক্য-বুদ্ধি দ্বারা শিক্ষিত হয়ে নির্বাচনে নেমেছেন এবং একটানা তিনটি নির্বাচনে জিতে গেছেন। হতভম্ব বিএনপি মাখায় হাত দিয়ে কাঁদছে। তাদের হনুমান ও সুগ্রীব দোসরেরাও ‘সুশীল সমাজের’ সাইনবোর্ডের আড়ালে মুখ লুকিয়ে বিদেশিদের কাছে বাংলাদেশে ‘গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার’ জন্য এগিয়ে আসতে মায়াকান্না কাঁদছেন। সুযোগ পেলেই তাদের দুটি ‘নিরপেক্ষ মিডিয়া’ তিলকে তাল করে হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে প্রচার চালাচ্ছে।

একবার তাদের এই কৌশল সফল হয়েছিল। শেখ হাসিনা তখন বিএনপি-জামায়াতের এই কৌশল সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। ঢাকায় নিযুক্ত তত্কালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত   ম্যারিঅ্যান পিটার্স ছিলেন প্রচণ্ডভাবে বাংলাদেশবিরোধী। তত্কালীন মার্কিন সরকারও হাসিনা সরকারকে সুনজরে দেখত না। ২০০১ সালের কথা। বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন। এই নির্বাচনে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের নেতৃত্বে গঠিত ঢাকায় নিযুক্ত বিদেশি দূতদের সংগঠন ‘টুয়েসডে ক্লাব’ আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে হারাবার জন্য প্রকাশ্যে মাঠে নেমেছিল। যদিও ভারত, চীন আরো অনেক রাষ্ট্র এই ক্লাবের সদস্য হওয়া সত্ত্বেও এই চক্রান্তে অংশগ্রহণ করেনি।

সেবার পাকিস্তানের গোয়েন্দা সার্ভিস, টুয়েসডে ক্লাব, বাংলাদেশের একটি সুশীল সমাজ এবং দুটি নিরপেক্ষ মিডিয়া মিলে যে জোট তৈরি করেছিল, সেই জোটের সঙ্গে বাংলাদেশের তত্কালীন প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দীন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান লতিফুর রহমানের হাত মেলানোর ফলে অসতর্ক হাসিনার দলের মাথায় পরাজয় চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। তারপর আর সম্ভব হয়নি। কারণ আওয়ামী লীগ চক্রান্তকারী জোটের কৌশলটি শিখে গিয়েছিল। নতুন কোনো কৌশল উদ্ভাবন করতে না পারলে বিএনপির বা আগের চক্রান্তকারী জোটটির মরা গাছে নতুন পাতা গজাবার সম্ভাবনা খুব কম। সে চেষ্টা তারা করেছিলেন গত সাধারণ নির্বাচনে জাতীয় ঐক্য মোর্চা গঠনের নামে কিছু  ফসিল রাজনৈতিক নেতাকে এক মঞ্চে এনে। সে চেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে।

তারা শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য এখন বিদেশি সাহায্য চাইছেন। কিন্তু আগে যেসব দেশের সরকার হাসিনা সরকারের প্রতি বিরূপ ছিল, যেমন চীন ও সৌদি আরব তারাও এখন হাসিনা সরকারের মিত্র। ভারতের নরেন্দ্র মোদি এই মহামারির মধ্যেও শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে বাংলাদেশ সফর করে গেছেন। সুতরাং কয়েকটি দেশের দূতাবাসের ঈদের শুভেচ্ছাবাণী ও উপহারকে বিএনপি তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সিদ্ধির কাজে ব্যবহার করে লোক হাসাবে, তার বেশি কিছু হবে না।

বেগম খালেদা জিয়া বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছেন। অবশ্যই দেশের মানুষ তার দ্রুত আরোগ্য কামনা করছে। কিন্তু তার এই অসুস্থতা এবং তার করোনায় আক্রান্ত হওয়ার খবর ছড়িয়ে বিএনপি যে নাটকটি করেছে তা হাস্যকর। বেগম জিয়া যখন জেলে ছিলেন, তখন বিএনপি তার রোগের খবর অতিরঞ্জিত করে প্রচার করে দাবি জানিয়েছে তাদের নেত্রীকে অন্তত জামিনে মুক্তি দেওয়া হোক। সরকার তাকে জামিন দিয়েছে এবং তার জামিনের মেয়াদ বাড়িয়ে দিয়েছে। খালেদা জিয়া তার ব্যক্তিগত চিকিত্সকদের দ্বারাই চিকিিসত হচ্ছেন।

এখন আর তার রোগ নিয়ে অতিরঞ্জিত প্রচার সম্ভব নয়। তাই করোনা নাটকের উদ্ভাবন। বিলাতের বাজারে জোর গুজব, এসবই তারেক রহমানের মন্ত্রণাক্রমে পরিচালিত হচ্ছিল। করোনার দোহাই দিয়ে বেগম জিয়াকে লন্ডনে এনে তারেকের নাকি ইচ্ছা ছিল, তার মাকে প্রধানমন্ত্রী করে বিদেশে একটি অস্থায়ী সরকার প্রতিষ্ঠা করা এবং হাসিনা সরকার অবৈধ সরকার—এই যুক্তি তুলে বিভিন্ন দেশের সমর্থন ও সাহায্য চাওয়া। তার ইচ্ছা পূরণ হবে না জেনেও হাসিনা সরকারের ওপর একটা চাপ সৃষ্টির জন্য এই পন্থার কথা ভেবেছিলেন হয়তো তারেক।

এ খবর কতটা সঠিক আমার জানা নেই। কিন্তু বিএনপির করোনা নাটকের পর এই গুজব সত্য বলেই আমার ধারণা হয়েছে। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের বিকল্প একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক বিরোধী দল গড়ে উঠুক, তা আমারও কাম্য। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল আদর্শকে নস্যাত্ করে যারা পাকিস্তানের ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে বাংলাদেশকে ফিরিয়ে নিতে চায়, তারা তাদের ষড়যন্ত্রে সফল হোক—কোনো দেশপ্রেমিক মানুষ তা কামনা করতে পারে না। হাসিনা সরকার সকল দোষত্রুটির ঊর্ধ্বে, এ কথা বলি না। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের আদর্শবিরোধী দলগুলোর আবার দেশের ক্ষমতা দখল তারা ঠেকিয়ে রাখতে পেরেছেন, এটাই তাদের বড় সাফল্য। বিদেশি দূতাবাসের ঈদের শুভেচ্ছাবাণীকে কেন্দ্র করে তারা নতুন যে প্রচারচক্রান্ত শুরু করতে চেয়েছিলেন তা ব্যর্থ হওয়াতেও আমি আনন্দিত।

n লন্ডন, ১৮ মে মঙ্গলবার, ২০২১