কেরানীগঞ্জে রাজউকের অনুমতি না নিয়ে তৈরি হচ্ছে বহুতল ভবন। আর এ কারণে দুই বছরের ব্যবধানে ধসে পড়েছে ছয়টি ভবন। ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে অন্তত আরো ২ হাজার বহুতল ভবন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজউকের অনুমোদন বাধ্যতামূলক হলেও উপজেলা ইঞ্জিনিয়ার কার্যালয় থেকে কয়েক বছর আগের তারিখে দাখিলকৃত ফাইলে নামকাওয়াস্তে নকশার ছাড়পত্র নিয়ে শতশত বহুতল ভবন তৈরি করা হচ্ছে। আর এসব ভবন নির্মাণ করছে ব্যক্তিমালিক ছাড়াও কয়েকটি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। পুরো কেরানীগঞ্জে অবৈধ এ নির্মাণ কার্যক্রম চললেও জিঞ্জিরা, মান্দাইল, বরিশুর, চড়াইল, খোলামোড়া, আঁটিবাজার, জয়নগর, ওয়াসপুর, কলাতিয়া, রোহিতপুর, শুভাঢ্যা, চুনকুটিয়া, আগানগর, কালীগঞ্জ, খেজুরবাগ, পারগেন্ডারিয়া, হাসনাবাদ, ইকুরিয়া, দোলেশ্বর, রাজেন্দ্রপুর ও আব্দুল্লাহপুর এলাকায় আধিক্য লক্ষ্য করা গেছে।
জানা গেছে, যথাযথ নিয়ম না মেনে নির্মাণের পাঁচ বছরের মাথায় ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দুই বছরে কালীগঞ্জ, বেগুনবাড়ী, শুভাঢ্যা, নেকরোজবাগ, ছাটগাঁও ও চড়াইল এলাকায় ছয়টি বহুতল ভবন ধসে পড়ে। তাতে অন্তত ১০ জন আহত হয়। আর্থিক ক্ষতি হয় ব্যাপক। এ সময় উপজেলা প্রশাসন ও রাজউকের কর্মকর্তারা কিছুদিন মাঠে দৌড়ঝাঁপ শেষে ঝিমিয়ে পড়ে। তবে রাজউকের অনুমোদন ছাড়া কেবল উপজেলাসংশ্লিষ্ট প্রশাসন থেকে ছাড়পত্র নিয়ে বহুতল ভবন নির্মাণ সম্পর্কে উপজেলা ইঞ্জিনিয়ার মো. শাহজাহান জানান, এর আগে স্থানীয় প্রশাসন থেকে ভবন তৈরির ছাড়পত্র দেওয়া হতো। গত পাঁচ বছর ধরে তা দেওয়া বন্ধ রয়েছে। তবে গত দুই বছরে কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় রাজউকের অনুমতি না নিয়ে প্রায় শতাধিক বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এটা কী করে সম্ভব—এমন প্রশ্নের জবাব তিনি এড়িয়ে যান। স্থাপত্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে কখনো আট মাত্রার ভূমিকম্প হলে কেরানীগঞ্জসহ রাজধানীর অধিকাংশ বহুতল ভবন ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে বুয়েটের প্রকৌশলী শফি আহম্মদ ও শাহজাহান জানান, পাঁচ কাঠা জমিতে একটি ১০ তলা ভবন নির্মাণ করতে হলে অন্তত ৮০ ফুট গভীরে ৮৬টি পাইলিং বসিয়ে তার ওপর ভিত্তি করে ভবনের কলাম উঠাতে হবে। নির্মাণকাজে ব্যবহার করতে থ্রি-ফোর পাথরের কংক্রিট, লাল মোটা বালি, ৫০০ গ্রেডের এস ডাব্লিউ বি-ফরম রড ও উন্নতমানের সিমেন্ট। তবেই তৈরি হবে আট মাত্রার ভূমিকম্প সহনশীল ভবন। অথচ সরজমিনে দেখা গেছে—জিঞ্জিরা, হাসনাবাদ, বরিশুর, রোহিতপুর, ওয়াসপুর, কলাতিয়া, আগানগর, চুনকুটিয়া ও শুভাঢ্যা এলাকায় কয়েকটি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান পর্যাপ্ত পাইলিং না করে ইটের খোয়া ও নিম্নমানের রড ও সিমেন্ট দিয়ে বহুতল ভবন তৈরি করে মোটা অঙ্কের মুনাফায় ফ্ল্যাট বিক্রি করে আসছে। নিম্নমানের এসব ঝুঁকিপূর্ণ ফ্ল্যাট কিনে শতশত গ্রাহক প্রতারিত হচ্ছে। এ ব্যাপারে রাজউক, ঢাকা দক্ষিণের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, কেরানীগঞ্জে রাজউকের নিয়মিত তদারকি করলে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন তৈরি বন্ধ হবে। প্রতারণা থেকে রক্ষা পাবে গ্রাহক। তিনি এ ব্যাপারে রাজউক কর্মকর্তাদের অবহেলাকে দায়ী করেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, কেরানীগঞ্জে রাজউকের কোনো তদারকি না থাকায় প্রায় ২ হাজার বহুতল ভবন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। যে কোনো মুহূর্তে ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা।