চট্টগ্রামে গৃহবধূ মাহমুদা খানম মিতু হত্যা মামলার অন্যতম আসামি কামরুল ইসলাম শিকদার মুসার অন্তর্ধান রহস্যের জট খোলেনি আজও। ২০১৬ সালের ৫ জুন মিতু খুন হওয়ার ১৭ দিন পর রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে যান মুসা। তার পরিবারের দাবি, মুসাকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। ঘটনার পর থেকেই মুসার স্ত্রী পান্না আক্তার এমনটাই দাবি করে আসছিলেন। কিন্তু পুলিশের রেকর্ডে মুসাকে আজও পলাতক হিসেবেই দেখানো হচ্ছে। তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মুসাকে পলাতক দেখিয়েই গত ১২ মে আদালতে মিতু হত্যা মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এই মামলার বাদী ছিলেন মিতুর স্বামী সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তার। একই দিন বাবুল আক্তারকে প্রধান আসামি করে নতুন একটি হত্যা মামলা করেন মিতুর বাবা। এতে বাবুল, মুসাসহ আট জনকে আসামি করা হয়েছে।
নগরীর পাঁচলাইশ থানায় এই মামলা হওয়ার পরদিন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে মুসার স্ত্রী পান্না আক্তারের কিছু বক্তব্যে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। অনেকটা নাটকীয়ভাবে পান্না দাবি করেছেন, তার স্বামী মুসা মিতু হত্যায় জড়িত ছিলেন। তবে তিনি স্বেচ্ছায় এই কাজ করেননি। মিতুর স্বামী সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের নির্দেশে আরো কয়েক জনের সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডে অংশ নেন তিনি। মুসার অবস্থান নিয়ে পুলিশের বক্তব্য প্রসঙ্গে পান্না আক্তার বলেন, তার স্বামী পলাতক নন। মিতু হত্যার ১৭ দিন পর ২২ জুন চট্টগ্রাম নগরীর কাঠগড় এলাকা থেকে পুলিশ মুসাকে গ্রেফতার করে।
গতকাল মঙ্গলবার এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে একই দাবির পুনরাবৃত্তি করেন পান্না আক্তার। তিনি আরো দাবি করেন, ‘মুসাকে গ্রেফতার অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যেসব সদস্য ছিলেন, তাদের মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের দুই থানার দুজন ওসিকে আমি চিনতে পেরেছি। তারা সাদা পোশাকে ছিলেন। তবে তাদের নাম প্রকাশ করতে চাই না। এতে আমাদের বিপদ হতে পারে। বাকি যারা ছিলেন তাদের কয়েক জনকে দেখলে চিনতে পারব।’ মিতু হত্যায় মুসার জড়িত থাকার বিষয়টি এত দিন গোপন রাখার কারণ জানতে চাইলে পান্না আক্তার বলেন, ‘মুসা জড়িত থাকার কথা প্রকাশ করতে গেলে স্বাভাবিকভাবেই নির্দেশদাতা বাবুল আক্তারের কথা বলতে হতো। কিন্তু আমাকে পুলিশ প্রশাসনসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল, যাতে আমি এ বিষয়ে মুখ না খুলি। কাউকে কিছু না বলি। মামলার তদন্তকারীরাও কখনো আমাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেননি। তাই এত দিন কাউকে বলা হয়নি। এখন দেখলাম নতুন একটা মামলা হয়েছে, যেখানে বাবুল আক্তারও আসামি। তাই ভাবলাম এখন সত্য কথা বলার সময় এসেছে।’
মুসাকে সাবধানে থাকতে বলেছিলেন বাবুল
পান্না আক্তার বলেন, ‘মিতু মারা যাওয়ার চার-পাঁচ দিন পর আমার স্বামীর মোবাইলে টিঅ্যান্ডটি নম্বর থেকে একটি কল এসেছিল। আমি ফোন রিসিভ করেছিলাম। কলদাতা তার পরিচয় না দিয়ে মুসা কোথায় জানতে চায়। আমি বলি, উনি বাসার বাইরে। এ কথা বলার পর কলদাতা আমাকে বলেন, মুসাকে সাবধানে থাকতে বলবা। এটা বলেই তিনি ফোন রেখে দেন। আমার স্বামীকে এ ঘটনা বলার পর তিনি বলেন, এটা বাবুল আক্তার স্যার। উনি আমাকে এই কাজটা (মিতু হত্যা) করতে বাধ্য করেছে। এরপর আমার স্বামী আমাকে বলেন, আমি যে মিতু হত্যায় জড়িত ছিলাম, এই কথাটা তুমি কাউকে বোলো না। আমার সমস্যা হবে। তাছাড়া স্যার (বাবুল আক্তার) আমাকে বলেছেন, তিনি আমাকে রক্ষা করবেন। আমার কোনো সমস্যা হবে না।’
আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চেয়েছিলেন মুসা
পান্না আক্তার বলেন, ‘আপন দুই ভাইকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেলে মুসা আমাকে বলে, পান্না তুমি ভয় পেয়ো না। আমি আদালতে গিয়ে আত্মসমর্পণ করব। ২২ জুন যেদিন মুসা গ্রেফতার হন, সেদিন তার আদালতে আত্মসমর্পণ করার কথা ছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী আগের দিন সন্ধ্যায় (২১ জুন) আমি, আমার দুই ছেলে ও মেজো ভাশুর সাকু (মিতু হত্যা মামলার অন্যতম আসামি সাইদুল ইসলাম শিকদার সাকু) চট্টগ্রাম শহরের কাঠগড় এলাকায় মুসার বন্ধু নুরুন্নবী ড্রাইভারের বাসায় যাই। ঐ সময় মুসা আমাদের সাথে ছিল না। ইফতারের পর সে আমাকে ফোন করে বলে, আমি কাল সকালে আসব। তুমি চিন্তা কোরো না। ঐ সময় নুরুন্নবী ড্রাইভার আমার কাছ থেকে ফোনটা নিয়ে আমার স্বামীকে বলে, মুসা ভাই কোনো সমস্যা নাই। আপনি সকালে আসেন। আপনাকে আমি রিসিভ করব।’ পান্না বলেন, ‘সম্ভবত আমাদের ঐ কলটা পুলিশ রেকর্ড করেছিল। পরদিন সকালে দেখি ঐ বাসায় পুলিশ আসে। আমরা তখন ঘুমে ছিলাম। পুলিশ সাদা পোশাকে ছিল। সেখানে দুজন ওসিকে আমি চিনতে পারি। নিজেদের ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে তারা আমার দেবর সাকুকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। একজন ওসি আমার স্বামীর অবস্থান জানতে চেয়ে বলে, আমরা জানতে পেরেছি তোমার স্বামী আজ এখানে আসবে। তোমার মোবাইলে এখন কল করবে। সে যেন বুঝতে না পারে এখানে পুলিশ আছে। এরপর তারা আমার মোবাইলটা নিয়ে নেয়। এরপর শুরু হয় হুমকি-ধমকি। একজন পুলিশ আমার বড় ছেলের ঘাড় চেপে ধরে। মিনিট পাঁচেক পরই আমার স্বামী নুরুন্নবী ড্রাইভারের মোবাইলে কল দেয়। পুলিশ মোবাইলের স্পিকার অন করে দেয়। আমরা যাতে চিত্কার না করি, সে জন্য আমাদের পাশের রুমে আটকে রাখা হয়। সেখান থেকে শুনতে পাই আমার স্বামী নুরুন্নবীকে বলছে, ভাই আমি কাঠগড় তিন রাস্তার মোড়ে আছি। আপনি আসেন।
বাবুল আক্তারের মুখোমুখি করার জন্য মুসাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়!
মুসার অবস্থান সম্পর্কে পরে আরো কিছু জানতে পেরেছিলেন কি না, জানতে চাইলে পান্না আক্তার বলেন, ‘তার সাথে আমার আর কোনো যোগাযোগই হয়নি। আমি এতটুকুই জানি, তাকে ২৪ জুন পর্যন্ত দামপাড়া পুলিশ লাইনে রাখা হয়েছিল। ঐ সময় ওয়াসিম, আনোয়ারসহ অন্য কয়েক জন আসামির সাথে তার কথাও হয়েছিল। আমরা জানতে পেরেছি, ২৪ তারিখ রাতে আমার স্বামীকে নাকি বাবুল আক্তারের মুখোমুখি করানোর জন্য ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।’