সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে করা ‘অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের’ মামলার তদন্তভার পেয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। মামলার নথিপত্র গতকাল বুধবার ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার সাজ্জাদুর রহমান। এদিকে মামলায় জামিনের শুনানি হবে আজ বৃহস্পতিবার। তার নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে সাংবাদিকদের প্রতিবাদ অব্যাহত রয়েছে। গতকালও ঢাকাসহ সারা দেশে সাংবাদিকরা মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছেন। এদিকে সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে গ্রেফতারের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে জাতিসংঘ।
রাজধানীর শাহবাগ থানায় রোজিনার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ১৫ জুলাই দিন ধার্য রয়েছে। রাষ্ট্রীয় গোপন নথি ‘চুরির চেষ্টার’ অভিযোগে প্রথম আলোর সিনিয়র রিপোর্টার রোজিনা ইসলামকে সোমবার সচিবালয়ে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের এক কর্মকর্তার কক্ষে প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা আটকে রাখা হয়। পরে রাতে তাকে শাহবাগ থানায় সোপর্দ করে ব্রিটিশ আমলের অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ও দণ্ডবিধির কয়েকটি ধারায় মামলা করে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। রোজিনা ইসলাম ঐ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
রোজিনার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানিয়েছে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ)। গতকাল ডিআরইউ চত্বরে এক সমাবেশ থেকে রোজিনাকে আটকে রেখে হেনস্তায় জড়িতদের শাস্তির দাবিও জানানো হয়। সমাবেশে সচিবালয় রিপোর্টার্স ফোরামের সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমেদ বলেন, আমরা দেখেছি কীভাবে আমাদের বোন রোজিনা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। আমাদের চোখের সামনে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেছেন, তবুও তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়নি। টেলিকম রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ-টিআরএনবির সভাপতি রাশেদ মেহেদী বলেন, রোজিনা ইসলাম জেলে আছেন মানে আমরা সব সাংবাদিক জেলে আছি। আমরা ব্রিটিশ উপনিবেশ দেখিনি, পাকিস্তান উপনিবেশ দেখিনি, কিন্তু বাংলাদেশে এখন আমরা প্রশাসন ক্যাডারের উপনিবেশ দেখছি। ইকোনমিকস রিপোর্টার্স ফোরামের সাধারণ সম্পাদক রাশেদুল হাসান বলেন, এটি কেবল সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা নয়, এর মাধ্যমে সাংবাদিকদের তথ্য অধিকারের বিষয়কে ক্ষুণ্ন করা হয়েছে।
সমাবেশে সংহতি জানিয়ে প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আনিসুল হক বলেন, তথ্য গ্রহণ করা মানেই তথ্য চুরি নয়। রোজিনা যে তথ্য পেয়েছেন, সেটি ক্রসচেকের উদ্দেশ্যেই সেখানে গেছেন। আমরা তার নিঃশর্ত মুক্তি এবং মামলা প্রত্যাহারের দাবি করছি।
জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খান বলেন, রোজিনাকে নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। ডিআরইউ সভাপতি মোরসালিন নোমানী বলেন, একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। যারা মেরেছেন তাদের দিয়ে কমিটি করা হয়েছে, এটা হাস্যকর। ডিআরইউ সাধারণ সম্পাদক মসিউর রহমান খান অবিলম্বে রোজিনার মুক্তি দাবি করেন। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন ডিআরইউর সাবেক সভাপতি ইলিয়াস হোসেন, রফিকুল ইসলাম আজাদ, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ আলম খান তপুসহ সিনিয়র সাংবাদিকরা।
জাতিসংঘের উদ্বেগ
রোজিনা ইসলামকে গ্রেফতারের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে জাতিসংঘ। মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক জাতিসংঘের উদ্বেগের কথা জানান। জাতিসংঘ ওয়েবসাইট অনুযায়ী এক প্রশ্নের জবাবে স্টিফেন বলেন, আমরা বাংলাদেশে সাংবাদিক গ্রেফতার নিয়ে প্রেস রিপোর্ট দেখেছি। এটি অবশ্যই আমরা দেখব। এটি একটি উদ্বেগজনক বিষয়। তিনি আরো বলেন, আমাদের অবস্থান পরিষ্কার। কোনো ধরনের হয়রানি বা শারীরিক নির্যাতন ছাড়া পৃথিবীর সব দেশে সাংবাদিকদের তাদের দায়িত্ব স্বাধীনভাবে পালনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। অবশ্যই এর মধ্যে বাংলাদেশ ও অন্যান্য দেশ রয়েছে।
আইনি সুবিধা দিতে প্রস্তুত পাঁচ সংগঠন
রোজিনা ইসলামের নিঃশর্ত মুক্তি, মামলা প্রত্যাহার ও হেনস্তাকারী কর্মকর্তাদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে পাঁচটি নারী ও মানবাধিকার সংগঠন। বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতি, নারীপক্ষ, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, ব্লাস্ট ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন গতকাল এক অনলাইন সাংবাদিক সম্মেলনে এই দাবি জানায়। তারা রোজিনাকে আইনগত সুবিধা দিতেও প্রস্তুত রয়েছেন বলে জানিয়েছেন। বক্তব্য রাখেন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নীনা গোস্বামী, নারীপক্ষের তামান্না খান, মহিলা আইনজীবী সমিতির অ্যাডভোকেট সালমা আলী এবং ব্লাস্ট থেকে ব্যারিস্টার সারা হোসেন এবং ব্যারিস্টার শারমিন আক্তার। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে স্বাগত বক্তব্য রাখেন শাহীন আনাম।
সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষকদের প্রতিবাদ
রোজিনা ইসলামকে হেনস্তা ও পরবর্তী সময়ে মামলা দিয়ে হয়রানির ঘটনায় অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষকের প্ল্যাটফরম ‘মিডিয়া এডুকেটরস নেটওয়ার্ক’। নেটওয়ার্কের ৪২ শিক্ষকের স্বাক্ষরিত এক লিখিত বিবৃতিতে শিক্ষকরা এ কথা জানান। তারা বলেছেন, আমরা একজন পেশাদার সাংবাদিকের সঙ্গে এ ধরনের অমানবিক ও অপেশাদারি আচরণের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।
বিবৃতিদাতাদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক ড. গোলাম রহমান, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ড. শেখ শফিউল ইসলাম, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মাধব দীপ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মামুন আ. কাইউম, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তাবিউর রহমান প্রধান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজীব নন্দী প্রমুখ। এছাড়া জাতীয় কন্যা শিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামও প্রতিবাদ জানিয়েছে।