ডলারের বাড়তি মূল্য ও দণ্ডসুদ প্রসঙ্গ

দেশের মুদ্রামানের বিপরীতে ডলারের মূল্য ক্রমেই বাড়িতেছে। গত ২৫ বত্সরে ডলারের মূল্য বাড়িয়াছে দ্বিগুণেরও অধিক। ১৯৯৬ সালে ৪০ টাকায় পাওয়া যাইত এক ডলার। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় আসে তখন প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য ছিল ৬৯ টাকা। আর এখন ডলার ক্রয় করিতে হইলে দিতে হইবে ৮৬ টাকার অধিক। কার্ব মার্কেট হইতে ক্রয় করিতে গেলে দাম পড়িবে ৯০ টাকা। ডলারের এই মূল্যবৃদ্ধি আমদানি ব্যয়ভার যেমন বাড়াইয়াছে, তেমনি উদ্যোক্তার ঘাড়ে চাপাইয়াছে বাড়তি ব্যয়ের বোঝা। তাহার উপর রহিয়াছে জ্বালানির সংকট, নীতিগত অসহযোগিতা, সুদের উপর সুদ ইত্যাকার অসুবিধাসমূহ। উদ্যোক্তাদের এই সকল যন্ত্রণা লাঘবের বিপরীতে কঠিন নীতি আরোপের মাধ্যমে বরং প্রকল্প রুগ্ণ কিংবা বন্ধের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করা হইতেছে। দিন শেষে উদ্যোক্তার উপর দোষারোপ, ঋণখেলাপির তকমা পড়ে। ইহা বলিলে অত্যুক্তি হইবে না যে, একজন উদ্যোক্তা এক দিনে তৈরি হয় নাই। বড় ঝুঁকি লইয়া যিনি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেন, পদ্ধতিগত কারণে তিনি সমস্যায় পড়িলে উদ্ধার করিবার পরিবর্তে তাহাকে চাপিয়া ধরা হয়; কিন্তু ইহা বুঝিতে চাহে না যে, উদ্যোক্তাকে আটকাইলে ব্যাংক নিজেই আটকাইয়া যায়।

ডলারের দাম একসময় সরকার তথা বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারণ করিয়া দিত। ১৯৯৪ সালের ২৪ মার্চ টাকাকে রূপান্তরযোগ্য ঘোষণা করা হয়। ইহার পর ২০০৩ সালে ভাসমান বিনিময় হার বা ফ্লোটিং এক্সচেঞ্জ রেট কার্যকর করা হয়; কিন্তু নামে মাত্র ভাসমান হইলেও কার্যত বাংলাদেশ ব্যাংকই ডলারের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করিয়া থাকে। যেই কারণে ইহাকে ‘ম্যানেজড ফ্লোটিং রেট’ও বলা হইয়া থাকে। নীতি যাহাই হউক, ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছেন উদ্যোক্তা। ব্যবসায় কিংবা শিল্পে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মেশিনারিজ ও পণ্য আমদানি করিতে এলসি খুলিতে হয়। ক্ষেত্রবিশেষে ৯০, ১২০, ১৮০ ও ৩৬০ দিন পূর্বে ব্যাংক কোনো মেশিনারিজ ও পণ্য আমদানি বাবদ ব্যয়ের হিসাব করিয়া থাকে; কিন্তু আলোচ্য সময়ের মধ্যে কিংবা ইহার পরেও ডলারের মূল্য বাড়িয়া গেলে তাহা গ্রাহকের কাঁধেই বর্তায়। অন্যদিকে একেক ব্যাংকে একেক দরের বিষয়টিও মনিটর না করিবার কারণে উদ্যোক্তা বিপাকে পড়িয়া যান। তাহার উপরে রহিয়াছে ব্যাংকের অন্যান্য খরচ। যাহার রেশ টানিতে হয় ক্রেতা-ভোক্তাকেও। এমন পরিস্থিতিতে যদি জ্বালানির সংকট দেখা দেয়, তাহা হইলে উদ্যোক্তা কীভাবে ঋণ পরিশোধ করিবেন! আমরা জানিয়াছি, এখনো সাভারসহ ঢাকার আশপাশে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নাই। ফলে, শুধু উত্পাদনই বাধাগ্রস্ত হইতেছে না, বরং পণ্যের মানও ক্ষুণ্ন হইতেছে। এই অবস্থায় পড়িয়া ঋণের কিস্তি সময়মতো পরিশোধ না করিলে সুদের উপর সুদ তথা দণ্ডসুদ আরোপ করিয়া উদ্যোক্তার মাথায় আরো বোঝা চাপাইয়া দেওয়া হয়। এই বোঝা লইয়া উদ্যোক্তা একসময় অপারগ হইয়া কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া পড়েন। সময় যতই বহিয়া যায়, ব্যাংকের সুদ ও জরিমানা ততই বাড়িতে থাকে। চারিদিক হইতে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়িয়া উদ্যোক্তা তখন নিজেই দিশাহারা হইয়া পড়েন। এই পরিস্থিতির জন্য উদ্যোক্তা নিজে কতটা দায়ী, তাহা কেউ বিবেচনায় নেন না। অথচ ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যাংকের ঋণ লইয়া যাহারা লুটপাট চালাইতেছেন, তাহারা দিব্যি ঘুরিয়া বেড়াইতেছেন। প্রকৃত উদ্যোক্তার ঘাড়ে আসিয়া পড়িতেছে যত যন্ত্রণা।

অর্থমন্ত্রী মহোদয় একবার বলিয়াছিলেন, সরল সুদ কার্যকর করা হইবে। তাহাও ধামাচাপা পড়িয়া গিয়াছে। আমরা পূর্বেই এমনটি আশঙ্কা করিয়াছিলাম যে, ইহার বাস্তবায়ন করা দুরূহ হইবে। কেননা, অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান হইতেছে যে, যাহারা ব্যাংক পরিচালনায় রহিয়াছেন তাহারা অনেক শক্তিশালী। এই শক্তিশালী চক্রের ব্যূহ ভাঙা মোটেই সহজকর্ম নহে। এমতাবস্থায় সিদ্ধান্ত লইবার সময় আসিয়াছে যে শিল্প উদ্যোগ পূর্বে, নাকি লুটেরা শ্রেণির স্বার্থই প্রাধিকার পাইবে। তাহা না হইলে প্রকৃত উদ্যোক্তাদের হয়রানি নিরসনের কথা হইবে অরণ্যে রোদন মাত্র।