এ বছর আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছি। স্বাধীনতার এই সুর্বণজয়ন্তীতে গণতন্ত্র, সুশাসন, ন্যায়বিচার, চিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে আমাদের অধোগতির বিষয়টি জোর গলায় আলোচনা হচ্ছে। দেশ স্বাধীনের এই ৫০ বছরে অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলার কোনো নজির নেই। তবে কি এই সময়ে সরকারি গোপন নথির ওপর ভিত্তি করে গণমাধ্যমে কোনো সংবাদ প্রকাশ বা প্রচার হয়নি? সঠিক উত্তর হচ্ছে হাজার হাজার হয়েছে এবং প্রতিদিনই হচ্ছে।
সরকারি সব নথিই গোপন এবং ফাইলের ওপর লাল কালিতে বড় হরফে তা লেখা থাকে। সাংবাদিকরা জনস্বার্থে সেসব গোপন নথির তথ্য পবিত্র দায়িত্ব মনে করে জনগণের সামনে উপস্থাপন করেন। স্বাধীনতার পর এমন কোনো আমল নেই যে সরকারের কেনাকাটার দুর্নীতি নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়নি। আর এ সংক্রান্ত তথ্য গোপন নথি থেকেই প্রাপ্ত। দুর্নীতির এসব তথ্য প্রকাশিত হওয়ার পর মন্ত্রিত্ব চলে যাওয়া এবং দপ্তর বদলের একাধিক নজিরও রয়েছে। কিন্তু কখনোই সাংবাদিকের বিরুদ্ধ অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের প্রয়োগ হয়নি। কেননা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এ আইনের প্রয়োগ করা যায় না। এ আইন মূলত সরকারি কর্মচারী এবং গুপ্তচর ভিত্তিতে নিয়োজিত দেশি এজেন্ট ও বিদেশি শত্রুদের জন্য। আমরা এ আইন প্রণয়নের সময়, ইতিহাস, আইনের ধারা, তপশিল এবং এ সংক্রান্ত বিভিন্ন দেশের উচ্চ আদালতের রায় যদি পর্যালোচনা করি, তাহলে দেখা যাবে কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আইনগতভাবেই এর প্রয়োগের কোনো সুযোগ নেই। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রয়োগের জন্য ইতিমধ্যেই অনেক কালো আইন হয়েছে এবং সরকারি কর্মচারীরা তাদের নিজেদের অনুকূলে প্রয়োজনীয় অনেক বিধিবিধান তৈরি করে নিয়েছেন। যে কারণে এ আইনটি এতদিন পরিত্যক্ত ছিল।
অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট মূলত একটি ঔপনিবেশিক আইন। ব্রিটিশ শাসনামলে এই আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল। আঠারো শ নিরানব্বই সাল থেকে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত লর্ড কার্জন যখন ভারতবর্ষের ভাইসরয় ছিলেন তখন এই আইন প্রণয়ন করা হয়। বেশ কয়েক-দফা সংশোধিত হয়ে ১৯২৩ সালে অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট জারি করা হয়। সে সময় ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন নরমপন্থি ও চরমপন্থি, এই দুটি বিপরীত ধারায় সম্পন্ন হয়েছিল। গুপ্তহত্যা এবং ব্রিটিশ স্থাপনায় হামলাসহ বিভিন্ন ঘটনা ঘটতে থাকে। এমন এক পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ সরকার এই আইনটি প্রণয়ন করে। সে সময় গোপনে স্বদেশি আন্দোলনের সঙ্গে বহু সরকারি কর্মচারী যুক্ত ছিলেন। তারা সরকারের স্পর্শকাতর স্থাপনার তথ্য যাতে ব্রিটিশ সরকারের শত্রুদের হাতে তুলে না দেন, সেজন্যই আইনটি প্রণয়ন করা হয়। এ আইনের তপশিলে কোন কোন বিষয় অপরাধের আওতাধীন তা স্পষ্ট করেই উল্লেখ রয়েছে। এগুলো হচ্ছে—প্রহরারত পুলিশ বা সেনাবাহিনীর সদস্যদের কাজে হস্তক্ষেপ করা যাবে না; কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রপরিপন্থি উদ্দেশ্যে সরকারি দলিল নিজের অধিকারে রাখতে পারবে না; বিদেশি এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারবে না; মিথ্যা পরিচয় দিয়ে পুলিশ, সেনাবাহিনী কিংবা অন্যান্য বাহিনীর পোশাক পরতে পারবে না; নিরাপত্তার স্বার্থে সরকার কোনো এলাকা সংরক্ষিত বা নিষিদ্ধ করলে সে এলাকার ছবি, স্কেচ, নোট বা মডেল আঁকতে পারবে না। এগুলোর কোনোটিই সাংবাদিকের পেশাগত কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। অর্থাত্ সাংবাদিক এবং গণমাধ্যম কর্তৃপক্ষ কখনোই এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকেন না।
এ আইন প্রয়োগের দুটি দিক রয়েছে। একটি হচ্ছে গুপ্তচরবৃত্তি এবং অন্যটি হচ্ছে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্পর্শকাতর গোপন নথি ফাঁস। তবে এই আইনের কোথাও উল্লেখ করা নেই যে সরকারি ‘গোপন’ নথি সংবাদপত্রে প্রকাশ করা যাবে না। এখানে গোপন নথি বলতে সরকারের দৈনন্দিন কার্যক্রম বা সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত নথি বোঝানো হয়নি। এখানে গোপন নথি বলতে সরকারের স্পর্শকাতর স্থাপনা অর্থাত্ প্রতিরক্ষা নির্মাণকাজ, অস্ত্রাগার, নৌ, স্থল বা বিমান বাহিনীর স্থাপনা বা স্টেশন বা খনি, মাইনক্ষেত্র, কারখানার নকশা বা স্কেচ, প্ল্যান, নিষিদ্ধ স্থানের কোনো ফটো, অফিশিয়াল কোড, পাসওয়ার্ড ইত্যাদি বোঝানো হয়েছে।
অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট, ১৯২৩—এই আইনের ৩ ধারায় বলা হয়েছে, নিষিদ্ধ স্থানে যদি কেউ যায় বা যেতে উদ্যত হয় কিংবা ঐ স্থানের কোনো নকশা বা স্কেচ তৈরি করে বা কোনো গোপন তথ্য সংগ্রহ বা প্রকাশ করে, তাহলে সে অপরাধী হবে। ৩ (ক) ধারায় বলা হয়েছে যে, নিষিদ্ধ স্থানের কোনো ফটো, অফিশিয়াল কোড, পাসওয়ার্ড স্কেচ বা নকশা কেউ প্রকাশ করতে পারবে না। ৪ ধারায় বলা হয়েছে যে, কোনো বিদেশি এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করে খবর সংগ্রহ করা যাবে না। আইনের ৫ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো নিষিদ্ধ এলাকা ও সরকারঘোষিত কোনো এলাকা সম্পর্কীয় কোনো গোপনীয় অফিশিয়াল কোড বা পাসওয়ার্ড বা কোনো স্কেচ, প্ল্যান, মডেল, আর্টিকেল, নোট, দলিলপত্র অথবা তথ্য কোনো ব্যক্তি আইনসংগত দখলে বা নিয়ন্ত্রণে রেখেও যদি যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন না করে, যদি অন্য কোনো ব্যক্তির নিকট হস্তান্তর করে, তার নিয়ন্ত্রণাধীন তথ্যাদি অন্য কোনো বিদেশি রাষ্ট্র ব্যবহার করে, তাতে সেই ব্যক্তি অপরাধী হবে। অর্থাত্ নিষিদ্ধ স্থান কী এবং অপরাধের সীমানা আইনেই স্পষ্ট করা আছে। আইনটি মূলত রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত। গুপ্তচর বৃত্তি ঠেকাতেই আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে।
সাংবাদিকরা গোপনে তথ্য সংগ্রহ করেন না। তারা গোপনে সরকারি দপ্তরে প্রবেশ করেন না। বিভিন্ন কৌশলে তারা খবর বা প্রাসঙ্গিক তথ্য সরকারি কর্মকর্তাদের মাধ্যমেই সংগ্রহ করেন। একে গুপ্তচরবৃত্তি বলা যায় না। তাছাড়া বাংলাদেশের সচিবালয় কোনো গোপন বা নিষিদ্ধ এলাকা নয়। এ আইন অনুযায়ী কোনো স্থাপনা বা এলাকাকে নিষিদ্ধ এলাকা ঘোষণা করতে হলে সরকারি প্রজ্ঞাপন লাগবে। এ সংক্রান্ত ঘোষণা নোটিশ আকারে নিষিদ্ধ স্থানের দেওয়ালে এবং প্রবেশপথে টাঙিয়ে দিতে হবে। আইনের এসব বিধান অনুযায়ী বাংলাদেশের সচিবালয় নিষিদ্ধ এলাকা নয় এবং সচিবালয়ে সাধারণত যেসব নথি চালাচালি হয় তা গণমাধ্যম প্রকাশ বেআইনি নয়। কোনো সরকারি কর্মচারী যদি গণমাধ্যমে প্রকাশের জন্য সাংবাদিকদের সরবরাহ করেন, তাহলেও তিনি দোষী সাব্যস্ত হবেন না। কেননা গণমাধ্যম জনগণের অবাধ তথ্য জানার অধিকারকে নিশ্চিত করে। জনগণের তথ্য জানার অধিকার কোনো দয়া বা দাক্ষিণ্য নয়। এটি সাংবিধানিক অধিকার। সবাইকে মনে রাখতে হবে বাংলাদেশ গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র। অর্থাত্ এ রাষ্ট্রের মালিক জনগণ। সংবিধানে তা স্পষ্ট করে লেখা। সংবিধানের ২১ (২) অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে, সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য।
সুতরাং জনগণকে তথ্য জানানো অপরাধ নয়। বরং অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে বলা আছে, যদি কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা এবং স্বার্থের পরিপন্থি কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে গুপ্তচর বৃত্তি করে, তাহলে তার শাস্তি হবে। এই উদ্দেশ্য নিয়ে সে যদি সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ কোনো এলাকায় গমন করে, পরিদর্শন করে বা ভেতরে প্রবেশ করে তাহলেও শাস্তি হবে। ভারতে ২০১৮ সালে মাধুরী গুপ্তা নামে একজন কূটনীতিক অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের আওতায় দণ্ডিত হয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছিল, ইসলামাবাদে পাকিস্তান হাইকমিশনে কর্মরত অবস্থায় পাকিস্তানি গুপ্তচর আইএসআইকে তথ্য পাচার করেছিলেন। এই মামলায় তাকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। গত ২০ বছরে ভারতে অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের আওতায় কয়েক জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হলেও আদালতে সেগুলো খারিজ হয়ে যায়। এর মধ্যে অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে, শান্তনু সাইকিয়া। ভারতের মন্ত্রিসভার একটি নথি ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভিত্তিতে মি. সাইকিয়া একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন। তার বিরুদ্ধে তখন অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে মামলা হয়। সেই মামলা থেকে মি. সাইকিয়াকে অব্যাহতি দিয়ে দিল্লি হাইকোর্ট বলেছিল, কোনো নথি ফাঁস হলে সেটিকে ‘গোপন’ আখ্যা দিয়ে একজন সাংবাদিককে অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের আওতায় দোষী করা যায় না।
ভারতের উচ্চ আদালতের রায়ের রেফারেন্স আমাদের আদালত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে থাকে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বিজ্ঞাপন থেকে জানা যায়, প্রথম আলোর সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের মোবাইল ফোনে দুই বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে করা ভ্যাকসিন ক্রয়সংক্রান্ত চুক্তির ফটোকপি পাওয়া গেছে। রোজিনা ইসলাম যদি এটি সংগ্রহও করে থাকেন, তাহলে তিনি কোনো অপরাধ করেননি। এটি কোনো গোপন এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত চুক্তি নয়। এটি একটি ক্রয়সংক্রান্ত চুক্তি। জনস্বার্থে এটি সংবাদপত্র প্রকাশিত হতে পারে। এতে দেশের স্বার্থ লঙ্ঘিত হয়েছে কি না তা পর্যালোচনার দাবি রাখে। এমনকি এ চুক্তি সংসদে উত্থাপনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
সংবিধানের ১৪৫-ক অনুচ্ছেদ উল্লেখ রয়েছে, ‘বিদেশের সহিত সম্পাদিত সকল চুক্তি রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করা হইবে, এবং রাষ্ট্রপতি তাহা সংসদে পেশ করিবার ব্যবস্থা করিবেন :তবে শর্ত থাকে যে, জাতীয় নিরাপত্তার সহিত সংশ্লিষ্ট অনুরূপ কোনো চুক্তি কেবল সংসদের গোপন বৈঠকে পেশ করা হইবে।’
সুতরাং এটি কোনো গোপন কিংবা নিরাপত্তাসংক্রান্ত চুক্তি নয়। এ ধরনের আন্তর্জাতিক চুক্তির তথ্য দেশ-বিদেশের গণমাধ্যম অহরহ প্রকাশিত হচ্ছে। এতে এক দেশের সঙ্গে অন্য দেশের সম্পর্ক বিনষ্ট হয় না, ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার কথা অবান্তর। বরং ক্রয়সংক্রান্ত চুক্তি প্রকাশ না করাই দুর্নীতি এবং জনগণকে অস্বীকার এবং অবজ্ঞা করার শামিল। ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতির অনেক তথ্যই গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, যা দেশের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করেছে।
n লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক এবং ল রিপোর্টস
ফোরামের সাবেক সভাপতি