(পূর্ব প্রকাশের পর)
শফিকুর রহমান রয়েল
১৯৮৯ সালে বার্লিন ওয়ালের পতন এবং সাবেক সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর পুঁজিবাদে রূপান্তরের পর থেকে বিশ্বের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদদের উল্লেখযোগ্য একটা অংশের এ ধারণা আরো দৃঢ় হয়েছে যে, বাজার ব্যবস্থাই উন্নয়ন দীর্ঘায়িত করার জন্যে সত্যিকারের একমাত্র পথ। সেই থেকেই তারা জোর গলায় প্রচার করছে ‘সমাজতন্ত্রের ইতিহাসের সলিলসমাধি’ ঘটেছে। উন্নয়নের নতুন শ্রেণিবিন্যাসের উত্থান হয় তথাকথিত ‘ধনী দেশগুলোর’ ক্লাব দ্য অর্গানাইজেশান ফর ইকোনমিক কোঅপারেশান অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি) সদস্যপদের মাধ্যমে। ১৯৪৮ সালে মার্শাল প্ল্যান সহযোগিতা গ্রহণ করা দেশগুলোই এ ‘অভিজাত’ ক্লাবের অগ্রদূত ও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। কিন্তু এর গণ্ডি খুবই সীমিত রাখাটা সম্ভব হয়ে ওঠেনি সময়ের দাবি মেটাতে গিয়ে।
অতিসম্প্রতি ওইসিডির সদস্য তালিকায় নাম উঠিয়েছে বেশ কয়েকটি সাবেক উন্নয়নশীল দেশ। যার মধ্যে রয়েছে ইসরাইল, দক্ষিণ কোরিয়া, মেক্সিকো ও তুরস্ক, আর এক সময়কার সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহ চেক প্রজাতন্ত্র, এস্তোনিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া, পোল্যান্ড, স্লোভাকিয়া এবং স্লোভেনিয়া। সব মিলিয়ে সদস্য সংখ্যাটা এখন নেহাত ছোট নয়, ৩৭। নিজেদের ‘বনেদি’ ভাবা এই ওইসিডি সংগঠনে অঙ্গীভূত গড়পড়তা কোনো দেশের বার্ষিক মাথাপিছু আয় ৪০ হাজার ১১৫ মার্কিন ডলার। কিন্তু প্রায় সব সতীর্থেরই কোনো না কোনো সময়ে কিঞ্চিত হলেও অশিল্পায়নের অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের রেকর্ড রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৬০ সালে ফ্রান্সের জিডিপিতে শিল্পের অবদান ছিল যেখানে ২২ শতাংশ, তা ক্রমান্বয়ে কমতে কমতে ২০১৯ সালে মোট জিডিপিতে এ হিস্যা দাঁড়ায় ৯.৮%। পক্ষান্তরে দক্ষিণ কোরিয়ার চিত্রটা একেবারেই ভিন্ন। আগেকার কৃষিপ্রধান এ দেশটিতে একই সময়ে মোট জিডিপির বেলায় শিল্পের ভূমিকা নগণ্য (১১%) থাকলেও রীতিমতো ভেলকি দেখিয়ে ২০১৯ সালে সেটিকে নিয়ে যায় ২৫ শতাংশে। অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়, তবে এটিই সত্য; কিন্তু কিছু কিছু অর্থনীতিবিদ এই বাস্তবতাটাকে না মেনে অহেতুক তর্কও বাধিয়ে দিতে পারে। তাদের সঙ্গে তর্কে না জড়িয়ে তথ্য-উপাও ও রাশিসমূহ চোখের সামনে মেলে ধরলেই দেখবেন সুর নরম করে দিয়ে সুকৌশলে চোখাচুখি এড়িয়ে মানে মানে কেটে পড়ার ফন্দি আঁটছে। তবে, বিচার যাই হোক, তালগাছটা আমার গোছের কিছু অর্থনীতিবিদ সবকিছু জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেলেও গলার জোরে নিজেকে সত্যবাদী প্রমাণ করার সব কসরতই চালিয়ে যাবে। আসলে দুটি দেশের মধ্যে কোনটি অধিকতর উন্নত, সেটি নির্ভর করে উন্নয়নের সংজ্ঞা নির্ধারণ কিংবা ব্যবহূত শ্রেণিবিন্যাসের ওপর।
অনেকগুলো সূক্ষ্ম পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও এখন ফ্রান্স ও দক্ষিণ কোরিয়া উভয়ই কিন্তু ব্যাপক অর্থে ধনী দেশ বলে বিবেচিত এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতোই ওইসিডি নামক অভিজাত সংগঠনের গর্বিত সদস্য। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা, যেমন কোভিড নাইনটিন প্রাদুর্ভাব ও আগের চেয়ে অধিকতর প্রাকৃতিক (যদিও জলবায়ুর পরিবর্তন সংশ্লিষ্ট এবং যে কারণে মানব-প্রভাবিত) দুর্যোগ ওইসিডির কিছু দেশকে সন্দেহের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে যে, সত্যিকার অর্থেই তারা ‘উন্নত’ রাষ্ট্রের সিলমোহর লাভের যোগ্য কিনা? করোনা মহামারির প্রথম ঢেউ মোকাবিলায় বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতাগুলো বেশ প্রকটভাবেই ফুটে উঠেছিল। কুখ্যাত করোনা ভাইরাসের উপস্থিতির আগ পর্যন্ত তাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতা অনেক দরিদ্র দেশের চেয়েও বেশি খারাপ ছিল। মহামারি শুরুর পর তাদের রাজনীতিবিদরা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে শুরু করেছিল বিশৃঙ্খল ও অকার্যকর উপায়ে। ফলশ্রুতিতে মারাত্মক পরিস্থিতি সৃষ্টির পাশাপাশি মৃত্যুর অনুপাতও ছিল সেখানে সবচে বেশি।
সংগত কারণেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশের কাছ থেকে আরো অনেক বেশি প্রস্তুতি আশা করা হয়। ২০০৫ সালে ক্যাটরিনা হারিকেন কেড়ে নিয়েছিল ১ হাজার ২০০ লোকের জীবন। ক্ষতির পরিমাণ ১০০ বিলিয়ন ডলার আর গৃহহীন হয়েছিল অসংখ্য লোক। লাখ লাখ লোক হয়ে পড়েছিল বিদ্যুত্হীন। এমনকি অনেকের বাড়িতে বিদ্যুত্ আসেনি আঘাত হানার এক সপ্তাহ পরেও। অথচ তাদের সম্পদের অভাব নেই। অধিকতর আয় এবং পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি থাকায় মহামারি ও হারিকেনের মতো দুর্যোগ সামাল দেওয়া উচিত আরো কার্যকরভাবে, যেমনটি করে থাকে অনেক উন্নত দেশ। উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাজ্যও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। সাম্প্রতিক দশকগুলোয় তারা জনগণের কল্যাণার্থে দেখভাল সক্ষমতা কেবলই সংকুচিত করছে।
রোনাল্ড রিগান ও মার্গারেট থ্যাচার কর্তৃক সবচে ভালোভাবে প্রণীত নব্য উদারনীতিবাদ মনোযোগ নিবদ্ধ বিশেষত ব্যক্তিগত কল্যাণের ওপর। সেই লক্ষ্যে সরকারি অবকাঠামো, সরকারি চাকরি এবং সরকারি পরিকল্পনা (দুর্যোগ ও প্রাদুর্ভাবকে অন্তর্ভুক্ত করে) খাতে বরাদ্দ থাকে তো ক্রমবর্ধিষ্ণু। থ্যাচার এ ব্যাপারে আরেকটু বেশিই এগিয়ে ছিলেন। তাইতো তার মুখে উচ্চারিত হয়েছিল ‘সমাজের মতো অন্য কোনো বিষয় নেই’। এই ধারণাসমূহ শুধু রাষ্ট্রের কল্যাণের ওপরই বিশেষ নজর দিত না, উপরন্তু রাষ্ট্রের কর্মসূচিগুলো পরিকল্পিতই হতো জনগণকে অন্য হুমকিগুলোসহ হারিকেন ও ভাইরাসসমূহের হাত থেকে সুরক্ষিত রাখতে।
এবার ইউএনডিপির সাম্প্রতিক কোভিড প্রস্তুতি ও ভঙ্গুরতা ড্যাশবোর্ডের দিকে তাকাই। দেখা যাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের নৈপুণ্য ওইসিডিভুক্ত অধিকাংশ দেশের চেয়ে বাজে। প্রতি ১০ হাজার লোকপ্রতি হাসপাতালের বেডের সংখ্যা এই দুই দেশের অনেক কম। সঙ্গে রয়েছে অধিকতর দারিদ্র্য ও অসমতা।
উপরের এতো আলোচনার কিন্তু আমাদের একটা ইঙ্গিতই দিচ্ছে যে, শুধু আয় মাধ্যম ও শিল্প প্রযুক্তির ওপর নজর দিয়ে উন্নত রাষ্ট্র চিহ্নিত করাটা বোকামি ছাড়া কিছুই নয়। এসব থাকা ছাড়াও জনগণের কল্যাণের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা দেশগুলোই হতে পারে কেবল উন্নত রাষ্ট্র। ব্যক্তিগত কল্যাণের নামে শুধু বিত্তশালীদের কল্যাণ করলে চলবে না। অতএব, বোঝাই যাচ্ছে উন্নত রাষ্ট্রের নতুন সংজ্ঞায়ন প্রয়োজন। এটাই এখন সময়ের দাবি।
—ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিকস অনুসরণে।